১৪ অক্টোবর ২০১৯

খোশ আমদেদ হিজরি নববর্ষ ১৪৪১

-

হিজরি নববর্ষকে খোশ আমদেদ। হƒদয়ের সব উষ্ণতা দিয়ে তাকে গ্রহণ করি। কালের গর্ভে হারিয়ে গেল ১৪৪০ হিজরি। চলে এলো ১৪৪১ হিজরি, আমরা অনেকেই হিজরি সনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবহিত নই। হিজরি বর্ষ ফিরে এসেছে পরিসমাপ্তির পথ বেয়ে। তাই এটি বিগত সময়ের মুহাসাবা ও সামনের জন্য নতুন সঙ্কল্পে উজ্জীবিত হওয়ার সময়। অতীতের যে সময়টুকু আল্লাহ তায়ালার মর্জি মোতাবেক অতিবাহিত করার তাওফিক হয়েছে তার জন্য শোকরগোজারি আর যা গাফিলতি-উদাসীনতা ও আল্লাহর নাফরমানিতে বরবাদ হয়েছে তার জন্য অনুশোচনা এটিই হলো মুমিনের করণীয়। তবে মুমিন আত্মপর্যালোচনা বর্ষকেন্দ্রিক, ৯ মাস বা সপ্তাহকেন্দ্রিকও নয়। মুমিন প্রতিদিন তার কর্মের হিসাব গ্রহণ করে এবং গতকালের চেয়ে আগামীকালকে অধিক ফলপ্রসূ করার চেষ্টা করে। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সব মানুষ প্রত্যুষে উপনীত হয় এবং নিজের সত্তাকে বিক্রি করে। হয় আল্লাহর কাছে বিক্রি হয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে, নতুবা শয়তানের কাছে বিক্রি হয়ে নিজেকে ধ্বংস করে’ (সহি মুসলিম ৩ : ১০০)।
হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররম। কুরআন ও সুন্নাহে এ মাস ফজিলতপূর্ণ। কিন্তু আশুরা ও শাহাদতে হুসাইন রা:-এর কারণে এ মাসকে মঙ্গলজনক মনে করা হয়, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। হজরত হুসাইন রা:-এর শাহাদত অবশ্যই মুমিনের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং তার শাহাদত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করাও প্রত্যেক মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য। কিন্তু তাই বলে কোনোরূপ ভিত্তিহীন ধারণা পোষণের অবকাশ নেই।
এ চন্দ্রবর্ষের, চান্দ্রবর্ষের ও চান্দ্রমাসের প্রভাব মুসলমানদের জীবনে ব্যাপক। জীবনের সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব ও গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়মিতভাবে নিয়োজিত করে দিয়েছেন, আর রাত্রি ও দিবসকে তোমাদের উপযোগী করে দিয়েছেন। আর যা তোমরা চেয়েছ তার প্রত্যেকটি বস্তু তিনি তোমাদের দিয়েছেন, যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করো তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয়ই মানুষ অত্যন্ত অন্যায়কারী ও অকৃতজ্ঞ’ (সূরা-ইবরাহিম : ৩৩-৩৪)।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘দু’টি নেয়ামতের ব্যাপারে অনেক মানুষ ধোঁকায় নিপতিত, তা হচ্ছে সুস্থতা ও অবসর।’ এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবের অনেক জায়গায় সময়ের বিভিন্ন অংশের কসম বা শপথ করেছেন, যেমন রাত্রি, দিবস, ফজর, আসর ও পূর্বাহ্ন। আজ আমরা আমাদের জীবন থেকে একটি পরিপূর্ণ বছর বিদায় দিচ্ছি যাতে আমরা আমাদের আমলগুলো সংরক্ষণ করেছি, যা হাশরের দিন আমাদের আমলে তুলে ধরা হবে। কতই না দ্রুত দিনগুলো কেটে গেছে, কত বন্ধু এতে আমরা হারিয়েছি, কত বিপদের এতে আমরা মুখোমুখি হয়েছি, কত পাপই না আমরা এতে করেছি। দিবা-রাত্রি আমাদের এসব আমলের সংরক্ষণস্থল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘সব মানুষই সকালে উপনীত হয় নিজেকে বিক্রেতা হয়ে, হয়ত সে স্বীয় আত্মাকে আজাদকারী হয়, অথবা সে স্বীয় আত্মাকে ধ্বংসকারী হয়।’ সময়ের অনেক দুঃখ-কষ্ট রয়েছে যা আনন্দ হিল্লোলে পরিবর্তন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে অনেক আনন্দ রয়েছে যা হতাশায় পরিবর্তন হয়ে যায়। বুদ্ধিমান সে ব্যক্তি যে এ ক্ষেত্রে শিক্ষা গ্রহণ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি দিবা ও রাত্রিকে পরিবর্তন করেন, নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানবানদের জন্য শিক্ষা নিহিত’ (সূরা আন-নূর : ৪৮)।
একটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, এতে যে আমল আল্লাহর বান্দারা করেছে তাই তাদের সামনে অচিরেই তুলে ধরা হবে। ‘সে দিন মানুষকে সে আগে পিছে যা করেছে তা সম্পর্কে সংবাদ দেয়া হবে’ (সূরা আল-কিয়ামাহ : ১৩)। সুতরাং এ দিনগুলোর আমলনামায় তুমি তোমার আখেরাতের জন্য কী সঞ্চয় করেছ? নিজেকে নির্জনে নিয়ে তা হিসাব কষে নাও।
মাইমুন ইবনে মাহরান রা: বলেন, বান্দাহ মুত্তাকি হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে স্বীয় আত্মার সাথে নিজের পার্টনারের চেয়েও বেশি হিসাব না কষে। পথপ্রাপ্ত জ্ঞানবান সে ব্যক্তি যে নিজের আত্মার সাথে বোঝাপড়া করে নিজের আত্মার হিসাব গ্রহণ করে, দিনের কাজগুলো রাতে এবং রাতের কাজগুলো দিনে খতিয়ে দেখে এর মধ্যে যা প্রশংসনীয় উত্তম বা বাস্তবায়ন করে যা ঘৃণিত ও তিরস্কৃত তা পরিত্যাগ করে এবং ভবিষ্যতে তা না করার কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়।
আবু হাতেম ইবনে হিব্বান রা: বলেন, বিবেকবানদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট সে, যে সর্বদা স্বীয় আত্মাকে সমালোচনা করে। মূলত আত্মসমালোচনার অনুপস্থিতি ব্যক্তিকে প্রবৃত্তির তাড়নায় ডুবে থাকার দিকে হাতছানি দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তারা হিসাবের আশা করত না’ (সূরা আন-নাবা : ২৭)।
মালেক ইবনে দিনার রা: বলেন, আল্লাহ সে ব্যক্তির প্রতি দয়া করেন, যে স্বীয় আত্মাকে বলে তুমি কি এমন করনি? তুমি কি এমন করনি? অর্থাৎ, তাকে ভর্ৎসনা করে, অতঃপর তাকে তিরস্কার করে তার রবের কিতাব তার পরিচালনার জন্য বাধ্য করে দেয়, ফলে আল্লাহর কিতাবই তার পরিচালক হয়ে যায়। বান্দার জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর হচ্ছে স্বীয় আত্মার ব্যাপারে অবহেলা করা, আত্মসমালোচনা ত্যাগ করে প্রবৃত্তি তাড়িত কর্মের পেছনে আত্মাকে ছেড়ে দেয়া। আর ওই সব লোকের অবস্থা যারা পাপ হতে নিজেদের চক্ষু বন্ধ করে রাখে আর ক্ষমা ও দয়া অনুকম্পার কথা বলে বেড়ায়, তারা যখন এসব করে তখন পাপকর্মের প্রতি তাদের অনুরাগ আরো প্রবল হয়ে যায়। অথচ আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহিয়ান রবের ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলেছে?’ (সূরা আল-ইনফিতর-৬)। হাসান বসরি (রহ:) বলেন, মুমিনের একমাত্র উচিত হচ্ছে স্বীয় আত্মাকে তিরস্কার করা, এভাবে বলা যে, এ কথা দিয়ে আমি কি ইচ্ছা করেছি? এ খানা দিয়ে আমি কী চাই? আর পাপাচারী হচ্ছে সে, যে অনুতাপে সময় কাটায় অথচ স্বীয় আত্মাকে তিরস্কার, করে না। মূলত মুমিন তার আত্মার ওপর ক্ষমতাবান, সে তাকে সদা সর্বদা হিসাব করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহকে ভয় করে, যখন শয়তানের কোনো দল তাদের স্পর্শ করে তখন তারা স্মরণ করে, আর তারা তো সুদৃষ্টিসম্পন্ন’ (সূরা আল-আ’রাফ-২০১)।
এ কারণে একদল লোকের ওপর হিসাব হালকা হবে; যারা দুনিয়াতে নিজেদের আত্মার হিসাব করেছে। একদল লোকের ওপর এ হিসাব অত্যন্ত কঠিন হবে, যারা এ ব্যাপারে কোনো তোয়াক্কা করেনি। সুতরাং পাপে লিপ্ত হওয়ার থেকে সতর্ক থাক। জেনে রাখো, পাপকর্ম ত্যাগ করা তওবা বা ক্ষমা কামনার চেয়ে অনেক সহজতর। দিন তোমার জন্য চিরস্থায়ী হবে না, তুমি জান না কখন তুমি দুনিয়া থেকে প্রস্থান করবে? সুতরাং স্বীয় আত্মাকে জিজ্ঞেস করো, গত বছরের জন্য তুমি কী পেশ করেছ? আগামী বছরের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করেছ। উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘তোমরা তোমাদের আত্মার হিসাব নাও নিজেদের হিসাব দেয়ার আগে, তাকে ওজন করো নিজেদের ওজন দেয়ার আগে।’ সুতরাং এ বছরের শুরুতেই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হও। দ্বীনের জ্ঞান লাভ, তার প্রসার ও শিক্ষা দান এবং মিথ্যা, গিবত, পরচর্চা, অশ্লীল কথা থেকে জিহ্বাকে হেফাজত করার মাধ্যমে নৈতিক পথের সংগ্রহ করো। খাওয়া দাওয়া, হারাম পরিহার ইত্যাদি ক্ষেত্রে সতর্কতা ও পরহেজগারি অবলম্বন করো, মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার প্রতি অনুরাগী হও। নিকট ও দূরবর্তী সবার জন্য ন্যায় ও কল্যাণকর কাজ করতে সচেষ্ট হও, হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা থেকে আন্তরকে পবিত্র রাখ।
মানুষের সম্মান হননের ক্ষেত্রে সতর্ক হও। ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ’Ñ এ নিদর্শন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রচেষ্টা করো। সন্তান, স্ত্রীসহ সবার অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে ব্রত হও। রাস্তাঘাটে ও স্যাটেলাইট মিডিয়ার হারাম বা নিষিদ্ধ দৃষ্টি থেকে নিজের চক্ষুকে অবনত রাখ। মনে রেখো, রাত-দিন দুনিয়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং আখেরাতের নিকটবর্তী হচ্ছে। সুতরাং সে বান্দার জন্য সুসংবাদ, যে নিজের জীবন থেকে উপকৃত হয়েছে এবং গত বছরের আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নতুন বছরকে গ্রহণ করেছে। প্রতিদিনের সূর্য অস্তমিত হয়ে তোমাকে তোমার জীবন কমে যাচ্ছেÑ এ সতর্ক সঙ্কেত দিচ্ছে। বিবেকবান সে, যে গত দিন থেকে উপদেশ নেয় এবং আজকের জন্য সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে, আগামীকালের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নেয়।
সুতরাং নিকটবর্তী সফরের জন্য রসদ প্রস্তুত করো। সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে যাতে আল্লাহভীতি রয়েছে তা, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে মর্যাদাবান সে ব্যক্তি যে তাঁকে (আল্লাহকে) সবচেয়ে বেশি ভয় করে। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো, আগামী দিনের জন্য মানুষ কী পেশ করেছে, সে যেন তা দেখে নেয়। আর আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমরা যা করছ তা সম্পর্কে সম্যক খবরদার।’ (সূরা আল-হাশর-১৮)।
লেখক : প্রবন্ধকার


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum