২০ আগস্ট ২০১৯

হজের মৌলিক দর্শন

-


‘হজ’ শব্দের অর্থ ইচ্ছা বা অভিপ্রায়। হজ আদায়কালে কাবাঘর জিয়ারতের ইচ্ছা থাকে, এ জন্য একে হজ বলা হয়। কিন্তু শরিয়তের পরিভাষায় হজ হচ্ছে বিশেষ কিছু কার্যক্রম সম্পাদন করার নাম, যা নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ পদ্ধতিতে যথাস্থানে পালন করা হয়। আন্তরিকভাবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হজ করতে হলে উপার্জন অবশ্যই হালাল হতে হবে। ঋণ থাকলে তা পরিশোধ এবং কারো হক থাকলে তা আদায় করতে হবে। অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থে হজ করলে তা নিশ্চিতভাবে কবুল হবে না।
হজ আদায়ের সার্বিক পরিবেশ অনুকূলে থাকলে কোনো অজুহাতেই কালক্ষেপণ না করে দ্রুত হজের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। কারণ কখন কোন মুহূর্তে জীবনকাল ফুরিয়ে যাবে এ সত্য কারোরই জানা নেই। সার্বিক পরিবেশ অনুকূল হলো অথচ হজ আদায় করল না, এ অবস্থায় যদি কারো মৃত্যু ঘটে; তাহলে মহান আল্লাহর আদালতে গ্রেফতার হতে হবে। কেননা, সামর্থ্যবান মুসলিমদের জন্য আল্লাহ তায়ালা হজ আদায় ফরজ করেছেন। (সূরা আলে ইমরান-৯৭)
হজ আদায়কারীর মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হজ আদায় করবে, হজ আদায়কালে যৌনকর্ম ও এ সম্পর্কিত সব আচরণ থেকে বিরত থাকবে এবং কোনো প্রকার গুনাহের কাজে সম্পৃক্ত হবে না, সে ব্যক্তি সদ্যজাত শিশুর অনুরূপ নিষ্পাপ অবস্থায় ঘরে ফিরবে। (বুখারি হা/১৫২১) হজে মাবরুর (কবুল হজ) হচ্ছে হজের প্রতিদান, যার বিনিময় কেবল জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়। (বুখারি হা/১৭৭৩)
আল কুরআনে মুসলিম উম্মাহকে ‘উম্মাতে ওয়াসাতা ঈড়সসঁহরঃু ড়ভ ঃযব এড়ষফবহ গবধহ’ অর্থাৎ সর্বোৎকৃষ্ট ও মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী জাতি হিসেবে বিশ্ব নেতৃত্বের আসন দান করা হয়েছে। এদের দায়িত্ব হলো, মানবসৃষ্ট ভেদাভেদের প্রাচীর চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সব মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়া। নামাজের জামাতে যেমন শাসক-শাসিত ও প্রভু-ভৃত্যে কোনো পার্থক্য রাখা হয়নি, হজের ক্ষেত্রে এ সাম্যের পরিধি বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। জামাতে নামাজ আদায়কালে নির্দিষ্ট কোনো পোশাক পরিধান শর্ত নয়; কিন্তু হজ ও উমরাহ আদায়ের ক্ষেত্রে এ সুযোগ রাখা হয়নি। কাবাঘরের সেবক বা যেকোনো পরাশক্তির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হোক, তাকে অবশ্যই রাজমুকুট ছেড়ে সেলাইবিহীন বস্ত্র পরিধান করে হজ-উমরাহর জন্য যেতে হবে।
হজ-উমরাহ আদায়কালে সাজসজ্জা, ভোগ-বিলাস, বৈধ পন্থায় যৌন সম্ভোগ থেকে দূরে অবস্থান করতে হবে। ঝগড়া-ফ্যাসাদ, দাঙ্গা, তর্ক-বিতর্ক, অশ্লীল বাক্য বর্জনপূর্বক দৃষ্টি সংযত রাখতে হবে। সেখানে শাসক-শাসিত, মনিব-ভৃত্য ও গাত্র বর্ণে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। সব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা আর বর্ণবাদ থাকে পায়ের নিচে। শাসক-শাসিত সবাই একই পোশাকে একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় হজ পালনপূর্বক সাম্যের সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
সাম্য শুধু বক্তৃতা-লেখনীতে আর বিশেষ বৈঠকে প্রস্তাব পাসের মধ্যে নয়, হজের ময়দানে বাস্তবে সাম্যের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। বর্ণবাদের বিষবাষ্পে আচ্ছাদিত এক শ্রেণীর মানুষের দৃষ্টি থেকে বর্ণবাদের আবরণ সরিয়ে দেয়ার জন্য ইসলামের হজই যথেষ্ট। হজ আদায়ের দৃশ্য দেখেও যারা ইসলামী আদর্শকে সাম্প্রদায়িক বলে, তাদের প্রতি শুধু করুণাই হয়। একই ধর্মের অনুসারী হওয়ার পরও যারা জাত-পাতের ধুয়া তুলে ধর্মস্থানে প্রবেশে বাধা দেয়, নির্মমভাবে মানুষ হত্যা করে, যোগ্যতা থাকার পরও চাকরিতে প্রবেশে বাধা দেয়, তারা হজ থেকে সাম্যের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
কাবাঘরের মাতাফ, সাঈ করার স্থান সাফা-মারওয়ায়, মিনার ময়দান, আরাফাতের বিস্তীর্ণ পাথুরে কঙ্করময় ভূমি, মুজদালিফার রাতের চিত্র এবং প্রতীকী শয়তানকে পাথরের আঘাতে বিতাড়নের দৃশ্যের প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, কোথাও ধনী-গরিব, উঁচু-নীচু, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শাসক-শাসিত, কালো-সাদার পার্থক্য নেই। শক্তি প্রয়োগে কেউ যদি পার্থক্য সৃষ্টি করে, সেটি তার ঈমান শূন্যতার চিহ্ন, ইসলামে মানুষে মানুষে পার্থক্যের কোনো দেয়াল নেই।
আরাফাতের ময়দানে সুন্দরী তম্বী, তরুণী আর তার অতি নিকটবর্তী বলিষ্ঠ দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী তরুণ-যুবক, কেউ কারো প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করার মানসিকতা নেই। উভয়েই দু’হাত তুলেছে মহান আল্লাহর দরবারে, উভয়ের চোখ থেকে ঝরনাধারার মতো অশ্রু-স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। কোন সে অদৃশ্য শক্তির ভয়ে? কেন কেউ কারো প্রতি দৃষ্টি দিচ্ছে না? রাতে মুজদালিফার ময়দানে উভয়েই উন্মুক্ত আকাশের নিচে পাশাপাশি অবস্থান করছে, কেন কেউ কারো প্রতি সবার অগোচরে আড় চোখেও তাকাচ্ছে না? কাবাঘর তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ায় সাঈ করাকালে প্রচণ্ড ভিড়ে সুন্দরী তরুণীর দেহের সাথে যখনই সুঠাম দেহের অধিকারী যুবকের স্পর্শ ঘটার উপক্রম হচ্ছে, তখন কোন সে শক্তিÑ উভয়ের অনুভূতি শাণিত করে তৎক্ষণাত সতর্কতা অবলম্বনে বাধ্য করছে?
হজে গমনকারী মানুষের কণ্ঠ উচ্চারিত বাক্যগুচ্ছের অর্থ অনুধাবন করুন। মানুষটি যেন জীবনের শেষ গোসল করে পরিধান করল কবর জগতে শয়নের পোশাক। এর অর্থ হজে গমনেচ্ছুক মানুষদের অনুধাবন করতে হবে, না করলে হজপূর্ব আর পরের জীবনে কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে না। মানুষটি যদি সমগ্র পৃথিবীর ধন-সম্পদের অধিকারীও হয়, মৃত্যুর পর সামান্যতম সম্পদও সাথে নিতে পারে না। হজে গমনেচ্ছুক মানুষটি কবর জগতের পোশাক পরিধান করে এ কথাই প্রমাণ করছে, পার্থিব কোনো বস্তুর প্রতি তার সামান্যতম আকর্ষণও নেই। সেলাইবিহীন মাত্র দুই খণ্ড সাদা কাপড় পরিধান করে দুই রাকাত নামাজ আদায় শেষ করা মাত্রই সে মুখে উচ্চারণ করতে থাকল, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান্ নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক্, লা শারিকা লাকা।
ইহ্রাম বাঁধার পর মানুষটি যা বলছে এবং যারা শুনছে, উভয়ে যদি তা বুঝে বাস্তব জীবনে অনুসরণ করত, তাহলে এ পৃথিবীতে শান্তি-সমীরণ প্রবাহিত হতো এবং ‘ফ্যাসাদ’ নামক শব্দটি গহ্বরে প্রবেশ করে আত্মরক্ষায় চেষ্টিত হতো। ইহরাম বাঁধার পর মানুষটি নির্ভীক চিত্তে বলিষ্ঠ কণ্ঠে সব স্বৈরাচার জালিমগোষ্ঠী, অশান্তি-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসী শক্তিকে হুমকি প্রদর্শন করে ঘোষণা করছে, ‘আমি সব শক্তিকে উপেক্ষা করে আমার আল্লাহর আদেশে তাঁরই মনোনীত কেন্দ্রীয় দফতরে উপস্থিত হয়েছি। আমি আমার আল্লাহর ডাকে এখানে উপস্থিত হয়েছি, যাঁর কোনো অংশীদার নেই। সৃষ্টি জগতের সৃষ্টি কাজে, এর আইন-কানুন রচনা ও প্রয়োগে কারো সামান্যতম অংশও নেই। অবশ্যই সব প্রশংসা মহান আল্লাহর। দৃশ্য-অদৃশ্যমান সব সম্পদরাজির মালিক তিনি, সৃষ্টিজগতের তিনিই সার্বভৌম ক্ষমতার একচ্ছত্র মালিক, তাঁর সার্বভৌমত্বে কারো সামান্যতম অংশও নেই’। তালবিয়ার এটিই ব্যাখ্যামূলক অর্থ।
উল্লিখিত কথাগুলো যে মানুষটি হজ আদায়কালে অবিরাম উচ্চারণ করল, সেই মানুষটিই হজ থেকে প্রত্যাবর্তন করে যদি জালিম স্বৈরাচারের গুণ-গানে মত্ত হয়ে তার আনুগত্য করে, তাহলে এর থেকে স্ববিরোধিতা আর কী হতে পারে? ইহরাম পরিধানকারী মানুষটি মুখে যা উচ্চারণ করল, অথচ হজ থেকে প্রত্যাবর্তন করেই কুরআনের বিধানের বিপরীত বিধানের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে শিরকের মধ্যে নিমজ্জিত হলো, ক্ষমতাধর মানুষকে বানালো ভাগ্যবিধাতা। এটি বড় ধরনের গুনাহ, অথচ মানুষের জীবন থেকে গুনাহ মুছে দেয়ার জন্যই হজ ফরজ করা হয়েছে। হজের শিক্ষা বাস্তবায়ন না করে হজের আনুষ্ঠানিকতা পালন করে কোনো অর্জন সম্ভব নয়।
হজ মানুষের মধ্যে সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি, মায়া-মমতা, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, অন্যকে অগ্রাধিকার প্রদান, মধুর বন্ধন, দূরে অবস্থানকারীকে কাছে আনয়ন এবং একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতার শিক্ষা দেয়। যে জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন শিশা নির্মিত প্রাচীরের অনুরূপ, সেই সমাজ-দেয়ালে কেউ ছিদ্র করে ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে না। বহুসংখ্যক লোকজন হজের আনুষ্ঠানিকতা নিষ্ঠার সাথে পালন করে বটে, এর শিক্ষা সমাজ জীবনে বাস্তবায়ন করে না বিধায় মুসলিম সমাজে ঐক্য নেই। যদি থাকত, তাহলে কুরআনের বিপরীত চেতনা মুসলিম সমাজকে গ্রাস করত না এবং অসৎ নেতৃত্ব সর্বত্র বিপর্যয় সৃষ্টি করে মুসলিম উম্মাহকে পতন গহ্বরে নিক্ষেপ করতে পারত না।
হজে গমনেচ্ছুক একজন মানুষ ইহরাম বাঁধার সাথে সাথে তার মন থেকে অপরাধ বা অশুভ চিন্তা দূর করতে বাধ্য হয়। পার্থিব এমন কতকগুলো বিষয় থেকে দূরে থাকা তার জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়, যে বিষয়গুলো সমাজে বিশৃঙ্খলা, অনৈক্য ও অশান্তির মূল কারণ। সে তার দেহের কোনো একটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা কারো কোনোরূপ ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকে। এমনকি চোখ দ্বারাও কোনোরূপ অশুভ ইশারা করা থেকেও বিরত থাকে। মুখ থেকে এমন কথাও সে উচ্চারণ করতে পারে না, যে কথা দ্বারা কারো ক্ষতি হয় বা মনে আঘাত পায়। মনের এ অবস্থা তার সমগ্র অবয়বে এক পবিত্র ভাবধারা প্রস্ফুটিত করে তোলে।
হিংসা-বিদ্বেষ উদ্রেককারী কোনো কথা সে বলে না, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ বা কারো অধিকার হরণমূলক চিন্তাও তার মানস জগতে স্থান পায় না। প্রাণীকূল তার কাছে নিরাপত্তা লাভ করে, সে হয়ে ওঠে নিরাপত্তার প্রতীক। তার নিজ দেহও তার কাছ থেকে নিরাপত্তা পায়, সে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজ দেহের একটি পশমেরও ক্ষতি করে না। দেহের কোথাও অস্বস্তি অনুভূত হলে এমনভাবে সে হাত দিয়ে স্পর্শ করে, যাতে দেহের পশম ঝরে না পড়ে এবং চিরুনি দ্বারা কেশ বিন্যাসও করে না। বৈধ পথে সে জৈবিক চাহিদা পূরণ থেকেও নিজকে বিরত রাখে। ইহরাম বাঁধার পরে তার দৃষ্টি যদি আকস্মিকভাবে ভিন্ন নারী-পুরুষের প্রতি পতিত হয়, দ্রুত সে দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করে। কেননা, দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণই হচ্ছে নৈতিক চরিত্র পবিত্র-পরিচ্ছন্ন রাখার সব থেকে শক্তিশালী উপায়। এ দৃষ্টিই মানুষের মনে অবৈধ কামনা-বাসনার উদ্রেক করে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে দেয়। সব প্রকার অপরাধমূলক কর্ম থেকে সে তার দেহের প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেই শুধু বিরত রাখে না, তার দেহের স্পর্শ অনুভূতিকেও সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত রাখে।
হজের শিক্ষা যদি হজ পরবর্তী জীবনে বাস্তবায়ন করা না হয়, তাহলে সেটা আর যা-ই হোক হজ নয়। হজের আনুষ্ঠানিকতা পালনকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নানা রুচি, বর্ণ, ভাষা, আকৃতি ও স্বভাব-চরিত্রবিশিষ্ট মানুষের সান্নিধ্যে অবস্থান করতে হয়। ফলে সব শ্রেণীর মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থা ও রীতিনীতির সাথে পরিচিত হওয়ার এক দুর্লভ সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন দেশের মানুষের সমাজ-সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য কয়েক বছর সময় ও প্রচুর অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়; কিন্তু হজ মানুষের এ সময় ও অর্থ হেফাজত করে।
হজ আদায়কারীকে নির্ধারিত সময় ও নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুসরণ করতে হয়। এসব কিছু মানুষকে সময় ও নিয়মানুবর্তিতা শিক্ষা দিয়ে হজ-পরবর্তী জীবনে তা অনুসরণ করার তাগিদ দেয়। এ সময় বর্ণ, ভাষা বা দেশের সীমানার কোনো পার্থক্য থাকে না, কেউ কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না। কেউ যেন কারো দ্বারা সামান্যতম আঘাত না পায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখে এবং একে অপরকে অগ্রাধিকার দেয়ার চেষ্টা করে। হজ থেকে ফিরে এসে লোকজন সমাজ জীবনে সেই আচরণ বহাল রেখে একটি সুন্দর সমাজ গড়বে। মুসলিম উম্মাহ যে ভাষা, বর্ণ, দেশ ও গোত্রেরই হোক না কেন, হজ আদায়কালে সে একই আল্লাহ-রাসূল ও কুরআনের নির্দেশ অনুসরণ করে এবং একই নিয়মে হজের আনুষ্ঠানিকতা পালন করে। হজ যা শিক্ষা দেয় তা বাস্তবায়ন করলেই হজের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব। নতুবা হজের জন্য অর্থ, সময় ব্যয় ও শ্রম দিয়েও সেই লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না, কুরআন যে উদ্দেশ্যে হজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে।
প্রত্যেক বছরই হজ মুসলিম উম্মাহর এ চেতনাকে নতুনভাবে শাণিত করে, তোমরা যে বর্ণ, গোত্র, আকৃতির ও দেশেরই হও না কেন বা যে ভাষাতেই কথা বলো, তোমাদের রব-ইলাহ, শাসক ও বিধানদাতা কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালা। তোমাদের জীবন বিধান আল কুরআন। তোমাদের একমাত্র অনুসরণীয় নেতা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:। এভাবে হজ সমগ্র পৃথিবীর মুসলিম উম্মাহকে একই রশিতে বেঁধে সবার মধ্যে এক অপার্থিব মায়া-মমতা সৃষ্টি করে। পৃথিবীর এক প্রান্তের মুসলিম বেদনা অনুভব করলে অপর প্রান্তের মুসলিম সেই বেদনা অনুভব করে তার সাহায্যে এগিয়ে যাবে। কিন্তু আফসোস, হজের এ শিক্ষা থেকে মুসলিম উম্মাহ শত যোজন দূরে অবস্থান করছে।
হজ আদায়কারী একই ইমামের পেছনে আরাফাতের ময়দানে সালাত আদায় করে এ শিক্ষাই অর্জন করছে যে, মুসলিমরা ঐকবদ্ধভাবে আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্বের অধীনে তাদের জীবনের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। ইহরাম বাঁধার পর থেকে আরাফাতের ময়দান এবং অন্যত্র সে ঘোষণা করছে, আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন একমাত্র সার্বভৌম শক্তি, জীবনের সব ক্ষেত্রে সে একমাত্র তাঁকেই নিরঙ্কুশ সার্বভৌম শক্তি হিসেবে মেনে চলবে, এটাই হচ্ছে হজের মূল শিক্ষা।
হজ আদায়কালে মুসলিমরা কে কোন দেশের, ভাষার ও বর্ণের তা ভুলে গিয়ে উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে নিজকে একমাত্র আল্লাহর গোলাম বলে ঘোষণা করে। অনুরূপভাবে দেশে প্রত্যাবর্তন করে আল্লাহর গোলাম হিসেবেই সে জীবন-যাপন করবে। জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই সে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের বিপরীত শক্তির আনুগত্য করবে না। হজে মুখে যে কথাগুলো সে উচ্চারণ করেছে, বাস্তব জীবনে তাকে প্রমাণ দিতে হবে যে, অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নিজের প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। আল্লাহর সৈনিক হিসেবে তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ‘তুমি পশু কোরবান করে প্রমাণ দাও। এরপর যার যার অবস্থানে প্রত্যাবর্তন করে জীবনের সব অঙ্গনে মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে নিজের জীবনকে এভাবেই (ঝধপৎরভরপব) কোরবানি দাও, যেভাবে পশু কোরবানি করেছ।’
লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ

 


আরো সংবাদ




bedava internet