১৭ জুন ২০১৯

রোজা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে

-

মানুষের মনের ভেতরে ভালো-মন্দ লুকিয়ে থাকে। মনের ভেতরে থাকা ভালো-মন্দ একে অপরের সাথে সব সময় যুদ্ধ করতে থাকে। এ ছাড়া দুনিয়ার মোহ মায়ায় আচ্ছন্ন লোভী আত্মাগুলো, ভালোকে দমন করার চেষ্টায় সর্বদা সক্রিয় থাকে। আর মানুষের মন অধিকাংশ সময় মন্দ কাজের দিকেই ঝুঁকে থাকে। যার ফলে এতো ইবাদত বন্দেগি করার পরও মানুষ স্রষ্টার রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। রোজা পালনের মাধ্যমে মানুষ তার নিজের ভেতরের মন্দকে পরাজিত করে। মানুষের তার ভেতরের মন্দকে পরাজিত করার শক্তিশালী কৌশল হিসেবে আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে সব নবী-রাসূলের উম্মতের ওপর রোজা ফরজ করেছেন। কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হে মানুষ, তোমরা যারা ঈমান এনেছো, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছে; যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)।
হজরত আদম (আ:) আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখতেন। যাকে আইয়্যামে বীজের রোজা বলা হয়। হজরত নূহ (আ:) সর্বদাই রোজা রাখতেন। হজরত দাউদ (আ:)-এর উম্মতের ওপর একদিন পর একদিন রোজা ফরজ ছিল। হজরত মূসা (আ:)-এর উম্মতের ওপর আশুরার দিন এবং সপ্তাহের শনিবার রোজা ফরজ ছিল। হজরত ঈসা (আ:)-এর উম্মতের ওপর একদিন রোজা রেখে, দুই দিন বিরতি দিয়ে পুনরায় রোজা রাখার বিধান ছিল। হজরত মোহাম্মদ (সা:)-এর শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদার খাতিরে এক নাগাড়ে ত্রিশ দিন রোজা পালনের বিধান ফরজ করা হয়েছে।
রোজার মাসেই আসমানি কিতাবগুলো নাজিল হয়েছে। হজরত ইব্রাহিম (আ:)-এর ওপর প্রথম রোজায় সহিফা নাজিল হয়েছে। হজরত মূসা (আ:)-এর ওপর ১৩ রোজায় তাওরাত কিতাব নাজিল হয়েছে। হজরত দাউদ (আ:)-এর ওপর ১২ রোজায় যবুর কিতাব নাজিল হয়েছে। হজরত ঈসা (আ:)-এর ওপর ২৭ রোজায় ইঞ্জিল কিতাব নাজিল হয়েছে। হজরত মোহাম্মদ (সা:)-এর ওপর ২৭ রোজায় লাইলাতুল কদরের রাত্রিতে কুরআন শরিফ নাজিল হয়েছে।
তাওরাত কিতাবে রোজাকে হাত্ব বলা হয়েছে। হাত্ব শব্দের অর্থ গোনাহ নষ্ট হয়ে যাওয়া। ইঞ্জিল কিতাবে রোজাকে ত্বাব বলা হয়েছে। ত্বাব শব্দের অর্থ পবিত্র হওয়া। যবুর কিতাবে রোজাকে কোরবাত বলা হয়েছে। কোরবাত শব্দের অর্থ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। কুরআন মাজিদে রোজাকে সিয়াম বলা হয়েছে। যার অর্থ আত্মশুদ্ধি লাভ করা।
রোজা মানব আত্মার সব গোনাহ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। রোজার রহমত, বরকত ও মাগফিরাত মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যে ইহাকে (নফস) বিশুদ্ধ করিয়াছে সেই সফলকাম হইয়াছে এবং যে ইহাকে কলুষিত করিয়াছে সেই অকৃতকার্য হইয়াছে।’ (সূরা শামস : ৯-১০)।
আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার উত্তম কর্মই হলো রোজা পালন করা। যে মানুষ রোজা পালন করে। তার আত্মা বিশুদ্ধ হয়ে যায়। পরিশুদ্ধ আত্মার মানুষগুলো দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতে সফলকাম। সকল প্রকার মন্দ কাজ বিরত বা সংযত থাকার নামই হলো রোজা। কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘তবে যে সংযত ও সংশোধিত হয় পরে তাহাদের জন্য ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিত হবে না।’ (সূরা আরাফ : ৩৫)।
রোজার মাসে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এমন একটি রজনী উপহার দিয়েছেন, এ রজনীর ইবাদতের মর্যাদা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। এ রজনীকে লাইলাতুল কদর বলা হয়। হজরত আবু হোরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূল (সা:) এরশাদ করেছেন, রমজান মাস আগমনের সাথে সাথে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। আর শয়তানকে শিকলাবদ্ধ করা হয়। (মুসলিম শরিফ, খ.২, পৃষ্ঠা ৭৫৮)। হজরত সালমান ফারসী (রা:) হতে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূল (সা:) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো সৎ কাজের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্য কামনা করে, সে যেন অন্য মাসে কোনো ফরজ কাজ আদায় করার মতো কাজ করল আর যে ব্যক্তি কোনো ফরজ কাজ আদায় করে সে যেন অন্য মাসের ৭০টি ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব পেল।’ (বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান, খ. ৫, পৃষ্ঠা২২৩)। রোজা পালন করলে শুধু সওয়াবই হয় না। রোজা মানব আত্মায় ঝর্ণার মতো নূর প্রবাহিত হয়। রোজা পালনে মানুষের জ্ঞানবিজ্ঞান ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায়। রোজা মানব আত্মার তেজ শক্তি বৃদ্ধি করে।
লেখক : প্রবন্ধকার


আরো সংবাদ