১৭ জুন ২০১৯

রোজা ও চিকিৎসা প্রসঙ্গ

-

শরিয়তের ব্যবহারিক বিধিবিধান মূলত কুরআন ও সুন্নাহর দলিল-প্রমাণনির্ভর প্রামাণ্য হতে হয়; কেবল যুক্তিনির্ভর হলেই চলে না। আবার এই কুরআন-সুন্নাহরই ভাষ্য থেকে আরো দু’টি বিষয় অর্থাৎ ‘ইজমা’ ও ‘কিয়াস’ বিধিবিধানের উৎস হিসেবে পাওয়া যায়। আবার এই শেষোক্ত ‘কিয়াস’ বিষয়টির ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় ‘ইজতিহাদ’ তথা গবেষণা-অনুসন্ধান কর্মের; যার অনিবার্য অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে পারস্পরিক তুলনা ও যৌক্তিক বিবেচনা। সুতরাং এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, শরিয়তের বিধান খুঁজে বের করার ভিত্তি যে উৎস চতুষ্টয়ের ওপর, তাতে ‘যুক্তি’-এর ক্রম অনুপস্থিত; তবে চতুর্থ নম্বরে যে উৎসটি রয়েছে সেই ‘কিয়াস’ বা ‘ইজতিহাদ’-এর ক্ষেত্রে যুক্তি বিষয়টি কাজে লাগে তথা সহায়ক হয়ে থাকে অবশ্যই। কিন্তু এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই কেবল শরিয়তের বিধান নির্ণিত বা চিহ্নিত বা স্থিরীকৃত হয় না।
সুতরাং রোজা অবস্থায় অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগের প্রকোপ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ‘ইনহেলার ব্যবহারের বৈধতা’র প্রশ্নে এমন যুক্তি যে, ‘এতে খাদ্যের অভাব পূরণ হয় না; পানির অভাব পূরণ হয় না। এটি পাকস্থলীতে যায় না; ফুসফুস পর্যন্ত পৌঁছে। এটি গ্যাস বা বাতাস মাত্র’Ñ যথেষ্ট নয়। তার কারণ, এমন যুক্তিতে বা এটুকু যুক্তিতে যদি এ ক্ষেত্রে রোজা না ভাঙে তাহলে ধূমপানে এবং অনুরূপ আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রেও রোজা ভাঙবে না। কেননা তা দ্বারাও খাদ্যের অভাব পূরণ হয় না; তা বেশি পৌঁছলে, ফুসফুস পর্যন্তই পৌঁছে এবং তা-ও গ্যাস বা বাতাস মাত্র। অথচ মুফতিদের কাছে প্রামাণ্য হিসেবে ধর্তব্য এমন অনেক গ্রন্থেই যুগ যুগ ধরে লিখিত হয়ে আসছে যে, ‘ইনহেলার ব্যবহারে (অক্সিজেন-বাতাসের কারণে নয়, তার মধ্যে ওষুধ বা গ্যাস থাকার কারণে এবং ইচ্ছার সংযোগ থাকার কারণে) রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং তা সুবিধা মতো সময়ে কাজা করতে হবে।’ (জাদীদ ফিকহি মাসাইল, আহসানুল ফাতাওয়া, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ইমদাদুল ফাতাওয়া, ফাতাওয়া ও মাসাইল-ইফা ইত্যাদি দেখা যেতে পারে)।
রোজা ভঙ্গ হওয়া প্রশ্নে সাধারণ ও ব্যাপক হারে আকরগ্রন্থগুলোতে মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীতে স্বাভাবিক পথে ও সরাসরি মুখের মাধ্যমে পৌঁছার কথা যেমন বলা হয়েছে; ঠিক তেমনি অস্বাভাবিক পথে যেমন চোখ, কান, নাকের মাধ্যমেও যদি কোনো ওষুধ, তেল ইত্যাদি মস্তিষ্কে পৌঁছে বা গলা অতিক্রম করে বা পাকস্থলীতে পৌঁছেÑ তাতেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। সুতরাং এমন যুক্তি বা সীমিতকরণ যে, পানাহারের কাজ না দিলে, তাতে রোজা ভাঙবে না কিংবা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করলে কিংবা পানাহারের স্বাভাবিক পথে (মুখে) না হলে রোজা ভাঙবে নাÑ এমন কোনো ‘শেষকথা’ বা ‘যুক্তি’ বাস্তবে বা সর্বত্র সঠিক নয়। বরং সঠিক হলো, সেসব নীতি, মূলনীতি ও সুনির্দিষ্ট সমাধান যা সার্বিক বিবেচনান্তে গৃহীত হয়ে হাজার বছর ধরে বর্ণিত হয়ে আসছে এবং তাতে ‘ইজমা’-ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। যেমনÑ
(১) ‘অ্যাজমা ও হাঁপানি রোগীদের অক্সিজেন বা ইনহেলার ব্যবহারের ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সমস্যা ...তার সঙ্গে যদি ওষুধের সংমিশ্রণ থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে আবার তাতে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে’ (জাদীদ ফিকহি মাসাইল : ১/১৮৮)।
(২) ‘ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক বিভিন্ন ওষুধ মুখ দিয়েও খেতে হয় না; কেবল জাল দেয়া বা গরমকৃত ভাপ বা বাষ্প নাক দ্বারা নিতে হয়; যা তাৎক্ষণিক নাক দিয়ে গলা অতিক্রম করে বক্ষদেশ (ফুসফুস) পর্যন্ত পৌঁছে থাকে; তাতেও রোজা ভেঙে যাবে।’ (জাদীদ ফিকহি মাসাইল : ১/১৮৮)।
(৩) ‘নারীর লজ্জাস্থানে কোনো কিছু (ওষুধ ইত্যাদি) রাখলে বা ব্যবহার করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।’ (প্রাগুক্ত : পৃ-১৮১)।
(৪) ‘নাক, কান ও মলদ্বারের পথে পাকস্থলীতে বা মস্তিষ্কে পৌঁছতে পারেÑ এমন ওষুধ এসব স্থানে ব্যবহারেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়।’ (প্রাগুক্ত)।
(৫) ‘পায়খানা বন্ধ হওয়া অবস্থায় ‘অনিমা’ (বা ‘সাপোজিটর’) নেয়া হয় সে ক্ষেত্রে ওষুধস্বরূপ তা অভ্যন্তর ভাগে লাগানো হয়। এতে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং তার ওপর কাজা করা ওয়াজিব হবে।’ (মাসায়েলে রোজা : রফয়ত কাসেমী, পৃ-১৩২, দেওবন্দ)।
(৬) ‘হোমিওপ্যাথিক ওষুধ যা কেবল ঘ্রাণ নিলেই মুখ দ্বারা সেবনের অনুরূপ ফলদায়ক, উপকারী হয়।’
‘ইনজেকশন দ্বারা রোজা ভঙ্গ হয় না; কিন্তু তার মাধ্যমে যদি পাকস্থলীতে ওষুধ পৌঁছানো হয় তাহলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।’ (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া : খ-১৭, পৃ-১৬৬-১৬৭)।
(৭) ‘ডুশ ব্যবহার বা হাঁপানির প্রকোপ নিরসনে গ্যাসজাতীয় ওষুধ ব্যবহারের দ্বারা রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।’ (ফাতাওয়া ও মাসাইল : খ-৪, পৃ-৪১,ইফা)।
(৮) ‘নাকে ওষুধ দিলে রোজা ভেঙে যাবে। কেননা নাকের দিক থেকে গলার দিকে স্বাভাবিক পথ বিদ্যমান।’ (খানিয়া + হিন্দিয়া : ১/২১০)।
মোটকথা, সহিহ বিধানটি হলো, ‘ইনহেলার ব্যবহারে রোজা ভেঙে যাবে। তবে রোজা অবস্থায় অসহনীয় মাত্রায় হাঁপানির প্রকোপ দেখা দিলে ইনহেলার অবশ্যই ব্যবহার করতে পারবেন; কিন্তু ওই রোজাটি পরবর্তীতে সুবিধা মতে কাজা করে নিতে হবে।’
লেখক : গবেষণা বিভাগ, ইফা


আরো সংবাদ