১৮ এপ্রিল ২০১৯

আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি

-


আল্লাহর পরিচয় তাঁর সবচেয়ে সুন্দর নামগুলো-আসমাউল হুসনার মাধ্যমে মানুষ জানতে পারে। আল্লাহ নিজেই তাঁর এসব নাম মানুষকে জানিয়েছেন। কুরআনে আল্লাহর এসব নাম বর্ণিত হয়েছে। এসব নামের মাধ্যমে মুমিনেরা অবশ্যই আল্লাহ তায়ালার সত্তা, তার গুণাবলি ও সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান লাভের চেষ্টা করবে। আল্লাহর সবচেয়ে সুন্দর নামের অনন্য ও সর্বব্যাপক বৈশিষ্ট্যের কারণে তাঁর ওপর নতুন কোনো নাম ও গুণ আরোপ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ নিষিদ্ধের কারণ হলো আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে মুমিনদের সরাসরি কোনোই জ্ঞান নেই। ততটুকু ছাড়া, যতটুকু তিনি পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে তাঁদেরকে জানিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালার ৯৯টি গুণবাচক নাম রয়েছে। এসব নাম তাঁর গুণের পরিচয় বহন করে। নামগুলোতে আল্লাহর গুণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে; যা মানুষের নিজের মধ্যে বিকশিত করা এবং এক অর্থে নিজের মধ্যে প্রতিবিম্বিত করার চেষ্টা করা প্রয়োজন। এসব গুণের কোনোটিকে অস্বীকার করা তো কোনো ব্যক্তির মৌলিক ঈমান-আকিদাকে ধ্বংস করেই তো দেবেনই, উপরন্তু তা ইসলামের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে পরিত্যাগ করার শামিলও। আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামগুলো কুরআনের কোনো নির্দিষ্ট অংশে বর্ণিত হয়নি, পবিত্র গ্রন্থের সর্বত্র এসব নাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। পবিত্র কুরআন এসব নাম সম্পর্কে মুমিনদের নিম্নোক্ত নির্দেশ দিয়েছে :
‘আল্লাহর বিভিন্ন সুন্দর নাম রয়েছে, তাই তাঁকে ওই নামে ডাকবে, যারা তাঁর নামসমূহের প্রতি অবজ্ঞা দেখায় তাঁদেরকে পরিহার করে চলো।’
‘বলো : তোমরা আল্লাহকে ডাক আল্লাহ বা আল রহমান বলে, আল্লাহরই জন্য রয়েছে সর্বোচ্চ সুন্দর নামসমূহ’ (১৭ : ১১০)।
আল্লাহর গুণগুলো উল্লেখ করে কুরআন আল্লাহর কোনোরূপ কল্পনা অথবা তার সদৃশ কিছু মনে করা, যা তাকে খর্ব বা নির্দিষ্ট আকারের মধ্যে সীমিত করতে পারে এমন যেকোনো চেষ্টাকে নিরুৎসাহিত করেছে’
‘কোন চোখ তাকে দেখতে পায়, অথচ সবকিছুই তাঁর দৃষ্টির আওতায়। তিনি সবকিছুর খবর রাখেন’ (৬ :১০৩)
এ আয়াতের সবশেষ দুটি শব্দে আল্লাহর দুটি গুণবাচক নাম উল্লিখিত হয়েছে : এ আয়াত থেকে দেখা গেছে, কাউকেই, এমনকি রাসূল সা:-কেও আল্লাহ তায়ালাকে চর্মচোখে দেখার অনুমতি দেয়া হয়নি। কুরআন থেকে জানতে পারি যে, আল্লাহ’র নবী মূসা আ: আল্লাহকে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। যখন তিনি সত্যি সত্যিই মহান আল্লাহকে দেখার জন্য অনুরোধ করেন, তখন মূসা আ:-কে বলা হয় :
‘তুমি আমাকে দেখতে পাবে না, তবে পর্বতের দিকে দৃষ্টি ফেরাও, তুমি যদি পর্বতকে তার স্থানে স্থিতিশীল দেখতে পাও, তা হলে আমাকে দেখতে পাবে...।’
এ কাহিনীতে আরো বলা হয় যে, আল্লাহ যখন পর্বতের ওপর এসে দেখা দেন তখন (ওই দিকে তাকিয়ে) মূসা আ: জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। যখন তাঁর জ্ঞান আসে; তখন তিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং তওবা করেন এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর ঈমানের সাক্ষ্য ঘোষণা করেন (৭ : ১৪৩)।
এভাবে কুরআনের সাক্ষ্যপ্রমাণ আল্লাহর অলৌকিক সত্তার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছে; তিনি সম্পূর্ণভাবে মানবচিন্তার অতীত এবং মানুষের পক্ষে তার কোনো সংজ্ঞা দান আসবে। এটি করার যেকোনো চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। তাই শরিয়াহ আল্লাহর অসীম সত্তার ব্যাপারে যেকোনো ত্রুটিপূর্ণ ধারণা রোধের লক্ষ্যে তার সত্তা সম্পর্কে কোনো ধরনের আলোচনা করাকে নিরুৎসাহিত করেছে।
আল্লাহর সুন্দর নামগুলোর অর্থ যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে, ঠিক সেভাবেই তা গ্রহণ করতে হবে। এগুলো আক্ষরিক অর্থে আল্লাহর গুণাবলি প্রকাশ করেছে। অবশ্য কুরআনের কিছু আয়াতে মানবসত্তার কিছু দৃষ্টান্ত দেখা যায় (আল্লাহর চোখ, ১১ : ৩৭, তাঁর মুখ ৪ : ২৭, ইত্যাদি)। যা ধর্ম শাস্ত্র আলোচনার ক্ষেত্রে বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আশারিয়া, মুতাযিলা ও মাতুরদিয়া গ্রুপ, এ বিতর্কের যে মূল বিষয় উত্থাপন করেছে তা হলোÑ এ গুণের বাস্তবতা এবং আল্লাহর সত্তার সাথে তার সম্পর্ক।
এ বিষয়ে আলেমরা যে বিতর্কিত গোষ্ঠীকে তীব্র নিন্দা করেছেন, সেটি হলো : ‘আহমিয়া। এ গোষ্ঠীটি হলো মুতাযিলা সম্প্রদায়ের একটি উপদল। এ দলটির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব জাহম ইবনে সাফওয়ানের নাম অনুসারে এদেরকে জাহমিয়া নামকরণ করা হয়েছে। মূলত তিনি ছিলেন খোরাসানের অধিবাসী, বাস করতেন কুফা নগরীতে। তিনি উমাইয়া গভর্নর আল হারিস ইবনে গুরাইয়ার প্রধান খতিব ছিলেন। পরবর্তীকালে তাদের উভয়কে বিদ্রোহ করার অপরাধে ১২৮ হিজরিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে বিতর্কিত মত প্রকাশক করে জাহম খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি আল্লাহর গুণাবলি আক্ষরিক অর্থের সাহায্যে বোঝা যাবে না, এগুলো প্রতীকী অর্থ (মু’য়াওয়াল) প্রকাশ করেছে। জাহম মনে করেন যে, যদি এর আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করা হয়, তাহলে মানব জীবসত্তা বোঝাবে আর এভাবে আল্লাহর সৃষ্টিতে তার সদৃশ তৈরি হবে; তাই তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে প্রতীকী অর্থ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ চিন্তাধারার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে জাহম আরো অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আল্লাহর অবশিষ্ট সৃষ্টির মতো কুরআনও সৃষ্টি করা হয়েছে। সাধারণ অর্থে যেহেতু আল্লাহ কথা বলেন না; তাই স্বাভাবিক অর্থে কুরআন ও তাঁর বাণী নয়। আমরা প্রতীকী ব্যাখ্যা (তাবিল) দিয়ে বড়জোর একে বাণীর প্রতীক বলতে পারি।
শতাব্দীর পর শতাব্দীর ধরে ‘আলেমরা’ এ মতকে কঠোর ভাষায় নিন্দা ও খণ্ডন করে দিয়েছেন, তারা এ মত ব্যক্ত করেন যে, কুরআনে আল্লাহর যে গুণের বর্ণনা রয়েছে, তা আক্ষরিক অর্থে উপলব্ধি করতে হবে এবং এসবের যেকোনো দূরবর্তী বা প্রতীকী ব্যাখ্যা প্রদান অবশ্যই পরিহার করতে হবে। এ আলোকে আল গাযালি বলেন, অনুসরণযোগ্য সঠিক উপায়ে হচ্ছে আক্ষরিক অর্থের কোনোরূপ পরিবর্তন করা থেকে নিবৃত্ত থাকা এবং সাহাবীরা অনুমোদন করেননি এমন যেকোনো ব্যাখ্যা প্রবর্তনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা। আল গাযালি কুরআনে দ্ব্যর্থবোধক বা রহস্যজনক (মুতাশাবিহাত) যেসব বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে, সে সম্পর্কেও এই একই অভিমত ব্যক্ত করেন। এ ব্যাপারে ঈমানদাররা কী ধরনের মনোভাব গ্রহণ করবে, সে সম্পর্কে রাসূল সা:-এর সুন্নাহতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। হাদিসের শিক্ষা অনুসারে ঈমানদারদের বলা হয়েছে :
‘তোমারা আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করবে, তবে আল্লাহ সম্পর্কে নয়। কারণ তোমরা কখনো তাঁর প্রতি সুবিচার করতে সক্ষম হবে না।’
মানবসত্তাকে তার স্রষ্টার সংজ্ঞা দেয়ার মতে ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি; এ বিষয়টি ধরে নিয়ে তার ভিত্তিতেই এ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অবশ্য মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত গুণাবলির বিষয়ে অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা দিতে পারে কারণ, এ বিষয় সে অবহিত অথবা তার পক্ষে জানা সম্ভব। এভাবে কুরআনে আভাস দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান হচ্ছে সরাসরি তার সৃষ্টি সম্পর্কিত জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত কুরআনের অসংখ্য আয়াতে (২:২১৯, ৭:১১৭ ইত্যাদি) আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শনের প্রতি মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে আল্লাহর অসীম জ্ঞান ও সর্বব্যাপকতার নিদর্শন ও সাক্ষ্য প্রতিফলিত হয়েছে। এভাবে আমাদের চার পাশের বিশ্ব সম্পর্কে অনুসন্ধান এবং সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া, এর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর গুণাবলি ও তার গুণবাচক নামগুলোর ব্যাপারে আমাদের উপলব্ধিকেও বৃদ্ধি করতে পারব।
যেহেতু মহাজগৎ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অসম্পূর্ণ; তাই মহাজগতের স্রষ্টা সম্পর্কে জ্ঞান অবশ্যই একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এ সম্পর্কে পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব নয়। আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে ‘অনুসন্ধান’-এর প্রচেষ্টাকে অলস ও বিপজ্জনক এবং (আবাস ওয়া মুহলিকাহ) অসীম পাথারে তল খোঁজার চেষ্টা বলে উল্লেখ করে আবদুল্লাহ বলেন, এটি করা মানব সাধ্যের অতীত, এটি করা বিপজ্জনক কেননা এতে ঈমানের ক্ষেত্রে ত্রুটির পথ প্রশস্ত হয়। আল্লাহর সত্তাকে সুনির্দিষ্ট করার চেষ্টা হচ্ছেÑ অসীমকে সীমার মাধ্যমে বাধার প্রয়াস, যা মূলত মহান আল্লাহতা’আলার সত্তাকে খর্ব করার শামিল।
অনুবাদ : সাজজাদুল ইসলাম

 


আরো সংবাদ

iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Bursa evden eve nakliyat
arsa fiyatları tesettür giyim
Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al