১৪ নভেম্বর ২০১৮

নিদ্রায় মৃত্যু ভাবনা

-

জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হলো ঘুম বা নিদ্রা। একজন সুস্থ মানুষের জন্য দৈনিক কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা ঘুমাতে বলা হয়। সুস্থ থাকার জন্য নিদ্রা বা ঘুম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে, নিস্তেজ হয়ে পড়ে তার দেহ। এ জন্য চিকিৎসকরা প্রয়োজনে ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন। তাই নিদ্রা আল্লাহর এক মহা নেয়ামত। তবে এর মাঝে যে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন রয়েছে তা আমরা ক’জনই বা উপলব্ধি করি। অথচ মৃত্যু অবধারিত। এ ঘুমের মাধ্যমেই আল্লাহ আমাদের মৃত্যুর নিদর্শন রেখেছেন। কুরআন কারিম ও হাদিসে এর বর্ণনা পাওয়া যায়।
ঘুমের অনেকগুলো দোয়ার মধ্যে সর্বাধিক পঠিত দোয়াটির অনুবাদ হলো, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার নামে মৃত্যুবরণ করছি এবং আবার আমি জেগে উঠব’। (বুখারি : ৫৮৪৯) অন্য এক দোয়াতে বলা হয়েছে, ‘আপনার নামে হে পরওয়ারদিগার (বিছানায়) আমার দেহ এলিয়ে দিচ্ছি আবার আপনারই সাহায্যে তাকে তুলে নেবো; এ সময় যদি আপনি আমার প্রাণ ধরে রাখেন (অর্থাৎ মৃত্যু হয়) তবে আপনি তাকে রহম করুন; আর যদি তাকে ফিরিয়ে দেন তবে তাকে (গুনাহ থেকে) হিফাজত করুন যেমন আপনি আপনার সালিহ বান্দাদের হিফাজত করে থাকেন’। (বুখারি : ৫৮৪৫)
অপর দিকে, আমরা ঘুম থেকে উঠে যে দোয়াটি পড়ি তার অনুবাদ, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদেরকে মৃত্যু (নিদ্রা) দেয়ার পর আবার জাগ্রত করেছেন এবং তাঁর দিকেই আমাদের পুনরুত্থিত হতে হবে।’ (বুখারি : ৫৮৪৯)
কুরআন কারিমেও এ প্রসঙ্গে আয়াত দেখা যায়, যেখানে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তিনিই রাতে তোমাদের মৃত্যু ঘটান এবং দিনে তোমরা যা করো তা তিনি জানেন। অতঃপর দিনে তোমাদের পুনর্জাগরিত করেন যাতে নির্ধারিত সময় পূর্ণ হয়। (আনআম : ৬০)
প্রশ্ন হলো, নিদ্রাকে কেন মৃত্যু বলা হয়েছে? এবং কেন জেগে উঠাকে বলা হয়েছে পুনরুত্থান? মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকে নিদ্রা থেকে জেগে উঠার সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ নিদ্রাকে মৃত্যু এবং জেগে উঠাকে পুনরুত্থান বোঝানো হয়েছে।
মানুষ নির্ধারিত সময় জেগে উঠতে অ্যালার্মের সাহায্য গ্রহণ করে। অনুরূপ মৃত্যুর পর মানুষ আবার জেগে উঠবে যা হবে তার পুনরুত্থান। কিন্তু মৃত্যুর পর এ সময় সে নিজ থেকে জেগে উঠবে না। শিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার মাধ্যমে তাকে জাগিয়ে তোলা হবে। যেমন আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে প্রতিপালকের দিকে ছুটে আসবে। তারা বলে ওঠবে, কে আমাদের বিছানা থেকে উঠিয়ে দিলো?’ (ইয়াসিন : ৫১-৫২) অতএব দেখা যায়, শিঙ্গা অ্যালার্মের ভূমিকা পালন করবে।
মানবদেহে প্রাণের সঞ্চার : মানবদেহে কখন প্রাণের সঞ্চার হয়। উত্তরে বলা যায়, মাতৃগর্ভে থাকাকালীন নির্দিষ্ট একটি সময় আল্লাহ মানবদেহে রূহ ফুঁকে দেন। সেখান থেকেই মানবদেহে প্রাণের সঞ্চার হয়। ডাক্তাররা আলট্র্রাসনোগ্রাফিতে সেই প্রাণেরই টিকটিক শব্দ শুনতে পান। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর তিনি তাকে করেছেন পরিমিত সুঠাম এবং তাতে তাঁর রূহ হতে ফুঁকে দিয়েছেন এবং তোমাদের দান করেছেন কান (শ্রবণশক্তি), চোখ (দৃষ্টিশক্তি) ও অন্তর (চিন্তাশক্তি)। তোমরা অতি সামান্যই শুকরিয়া আদায় করো।’ (সাজদাহ : ৯)
মৃত্যু এবং নিদ্রা : দেহ রূহের (প্রাণ) গৃহতুল্য। এখান থেকেই প্রমাণ হয়, মানুষ যখন নিদ্রা যায় তখন তার মধ্যে প্রাণের প্রভাব থাকলেও প্রাণ তার সাথে থাকে না। কোথায় যেন প্রস্থান করে। তার জেগে ওঠার সময় এ প্রাণ ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং প্রাণী জেগে উঠে। কিন্তু মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন সে হয়ে যায় ধ্বংসপ্রাপ্ত এক ঘরের মতো। সে ঘর নবনির্মিত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে আর রূহ ফিরে আসে না। এমনটিই আমরা দেখতে পাই আল্লাহর কালামে। তিনি ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহই প্রাণ হরণ করেন প্রাণীদের যখন তাদের মৃত্যুর সময় হয় এবং যাদের মৃত্যুর সময় হয়নি তাদের প্রাণও (তিনি হরণ করেন) নিদ্রার সময়। অতঃপর তিনি যার জন্য মৃত্যুর সিদ্ধান্ত করেন তার প্রাণ তিনি রেখে দেন এবং অন্যগুলো ফিরিয়ে দেন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত।’ (জুমার : ৪২) ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত, আদম সন্তানের রূহ ও নফস রয়েছে, একটি অপরটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। রূহ দ্বারা শ্বাস-প্রশ্বাস ও নড়াচড়ার কাজ সাধিত হয়। আর নফস অনুভূতি ও বোধশক্তির উৎস। নিদ্রাকালে শুধু নফস হরণ করা হয়। (আল-কুরআনুল কারিম, ইফাবা, ৭৫৭/১৫০১)
আয়াতে দু’টি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। মাওত (মৃত্যু) ও নাওম (নিদ্রা)। তাই বোঝা যায়, মানুষের মধ্যে দু’টি নাফস রয়েছে। একটি উড়ে যায়, অপরটি মৃত্যুবরণ করে। তাই যে নাফস মৃত্যুবরণ করে অর্থাৎ নিদ্রায় মগ্ন থাকে সেটা হলো দেহ। আর যে নাফস উড়ে যায় সেটা হলো রূহ (প্রাণ)।
মৃত্যু অর্থে কুরআনে ব্যবহৃত একটি শব্দ হলো ‘ওফাত’। ওফাত বলা হয় যার দায়িত্ব পূর্ণ হয়েছে। নিদ্রার সময় রূহের কোনো কার্যক্রম না থাকায় এ সময় আল্লাহ রূহকে তুলে নেন।
অপর দিকে মাওত (মৃত্যু) হলো প্রাণের অনুপস্থিতি। আর যে নিদ্রা যায় ও ঘুমায় সেটা হলো দেহ। দেহের মাঝে রূহ মৃত্যুবরণ করে না এবং ঘুমায়ও না। মানুষ হলো রূহ ও দেহের সমষ্টি। আবার উভয়কে এককভাবেও বলা হয় নফস। অর্থাৎ নাফস বলা হলে যেমন দেহকে বুঝায়, তেমনি রূহকেও বোঝানো হয়। মাওত (রূহ) দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর কুরআন কারিমে উপস্থাপিত পরওয়ারদিগারের সাথে তার কথোপকথন শুনুন। ‘যখন ওদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন সে বলে, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে পুনরায় (পৃথিবীতে) ফিরিয়ে দিন যাতে আমি নেক আমল করতে পারি যা আমি পূর্বে করিনি।’ না, এটা কখনো হওয়ার নয়। এটা তো ওদের একটি উক্তি মাত্র। তাদের সামনে বারজাখ থাকবে পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত।’ (মুমিনুন : ৯৯-১০০)
আর যখন পুনরুত্থান হবে তখন দেহের সাথে প্রাণের সংযোগ ঘটবে। তখন মানুষের মনে হবে সে যেন এইমাত্র ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে তখনই তারা কবর থেকে প্রতিপালকের দিকে ছুটে আসবে। তারা বলে উঠবে, কে আমাদের বিছানা থেকে উঠিয়ে দিলো?’ (ইয়াসিন : ৫১-৫২) মানুষের অনুভূতিতেই নিদ্রা মৃত্যুরই দ্বিতীয় নাম।
এ প্রসঙ্গে হজরত আলী বলেন, রূহকে ফিরিয়ে দেয়ার পূর্বে ঘুমন্ত ব্যক্তির প্রাণ আসমানে যা কিছু দেখে তা হয় সত্য স্বপ্ন এবং ফিরিয়ে দেয়ার পর রূহ দেহে সুস্থির হওয়ার আগ পর্যন্ত যা কিছু দেখে তা হয় মিথ্যা, কাল্পনিক এবং শয়তান প্ররোচিত। (মাওয়ারদি : আন নুকাত ওয়াল উয়ুন) আর এ থেকেই সুস্পষ্ট প্রমাণিত, নিদ্রা সাময়িক মৃত্যু যা চূড়ান্ত মৃত্যুর প্রমাণ; যেমন নিদ্রা থেকে জেগে ওঠা মৃত্যু-পরবর্তী চূড়ান্ত পুনরুত্থানের প্রমাণ। মহান সেই সত্তা যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দান করেন। তিনিই সর্ববিষয় মহাজ্ঞানী।
লেখক : অধ্যাপক


আরো সংবাদ