১৬ অক্টোবর ২০১৯

প্রত্যেক মাদকই হারাম

-


‘হে ঈমানদারগণ নিশ্চয় মদ, জুয়া, পূজার বেদি, লটারি ইত্যাদি ঘৃণিত ও শয়তানের কাজ, তোমরা এ থেকে বিরত থাকো, তবে সফল হবে’ (সূরা মায়িদা-৯০)। আল্লাহ পাক আরো বলেন, ‘তারা আপনাকে মদ, জুয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করে আপনি বলুন, উভয়টিতে রয়েছে মহাপাপ’ (সূরা বাকারা-২১৯)।
মাদক বিষয়ে নবী সা:-এর অসংখ্য বাণী রয়েছে। তন্মধ্যে কিছু উল্লেখ করলাম : তিনি বলেছেন, ‘মাদক গ্রহণকারী জান্নাতে যাবে না’ (ইবনু মাজাহ)। আমার উম্মতের একদল লোক মদ পান করবে, তারা মদকে অন্য পানীয়ের নামে নাম পরিবর্তন করে পান করবে। নেতাদের গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে সম্মান দেখানো হবে। যখন এরূপ হবে তখন ভূমিধস, বানর, শূকরের মতো আকৃতি বিকৃতি হবে’ (বুখারি, ইবনে মাজাহ)। আল্লাহ পাক অঙ্গীকার করেছেন, ‘যে মদ পান করবে, তাকে ‘ত্বিনাতুল খাবাল’ অর্থাৎ, জাহান্নামিদের দেহ থেকে নির্গত ঘাম, রক্ত ও পুঁজ যা জাহান্নামে জমা হবে তা পান করানো হবে’ (মুসলিম)।
নিশ্চয় ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা নবুয়ত ও রহমত দ্বারা শুরু হয়েছে, অতঃপর এটা খেলাফত ও রহমত হিসেবে হবে, অতঃপর অত্যাচারী শাসকের যুগ হবে, অতঃপর কঠোরতা, উচ্ছৃঙ্খলতার যুগ হবে, নারী দেহ, মদকে বৈধ মনে করা হবে। তারপরও তারা রিজিকের প্রাচুর্য ও সাহায্যপ্রাপ্ত হবে, আল্লাহর সাথে (হিসাবের মাঠে) সাক্ষাৎ হওয়া পর্যন্ত’ (বায়হাকি)।
হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত, নবী সা: মদের সাথে সংশ্লিষ্ট ১০ ধরনের লোককে অভিসম্পাত করেছেন। তারা হলোÑ ‘মদ প্রস্তুতকারী, পরামর্শদাতা, পানকারী, বহনকারী, যার জন্য বহন করা হয়, পরিবেশনকারী, বিক্রেতা, মূল্যভোগী, ক্রেতা, যার জন্য ক্রয় করা হয়’ (তিরমিজি)। ‘মদ পানকারী জান্নাতে যাবে না’ (ইবনে মাজাহ)। ‘প্রত্যেক নেশা মাদক, প্রত্যেক মাদক হারাম’ (ইবনে মাজাহ)। তিনি আরো বলেছেন, বেশি পরিমাণ গ্রহণে যাতে নেশা হয়, তার অল্প পরিমাণও হারাম’ (ইবনে মাজাহ)। আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের পথে নিবে না’ (সূরা আরাফ-১৫৯)। ধূমপান, তামাক, গুল ইত্যাদি মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, জীবন বিধ্বংসী এবং আসক্তি সৃষ্টি হয়, অর্থের অপচয় হয়, তাই বর্তমানে বেশির ভাগ ওলামাদের মতে, এগুলোও হারাম।
মদ হারাম হওয়ার সাথে সাথে নবী সা: সাধারণত যেসব পাত্রে মদ প্রস্তুত ও পরিবেশন করা হতো সেগুলো অন্য কাজের জন্য ব্যবহারও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এবার আমরা দীর্ঘ ব্যবধানের দুটি ঘটনার প্রতি দৃষ্টি দেবো। প্রথম ঘটনাটি জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করতে যখন ইসলামের আবির্ভাব হয়, তখন আরব জাতি ছিল মদে আসক্ত। অতিথি আপ্যায়নসহ কোনো অনুষ্ঠান মদ পরিবেশন ছাড়া চিন্তাও করা হতো না। ঘরে ঘরে বিভিন্ন ধরনের মদ তৈরি করা হতো। তার ধারাবাহিকতায় সাহাবায়ে কেরাম রা:ও মদ পান করতেন। এক অনুষ্ঠানে কিছু সাহাবা মদ পান করছিলেন, একেকজন একেক অবস্থায় ছিলেন। কেউ খাচ্ছিলেন, কেউ ঢালছিলেন, কেউ ঠোঁটের সাথে গ্লাস লাগাচ্ছিলেন এমন সময় ঘোষণাকারী ঘোষণা করলÑ মদকে হারাম করে আয়াত নাজিল হয়েছে। অমনি যে যার অবস্থানে থেমে গেলেন। যিনি মুখে নিয়েছেন, তিনি কুলির মতো করে ফেলে দিলেন, এক ঢোকও পান করলেন না। যিনি গ্লাস ঠোঁটে লাগিয়েছেন, তিনি তা নামিয়ে ফেললেন। যার যার ঘরে প্রস্তুতকৃত যত মদ ছিল, শুধু ওই একটি ঘোষণার সাথে সাথে স্বেচ্ছায় সব মদ ছুড়ে ফেলে দেয়া হলো। মদিনার অলিগলি এমনভাবে ভিজে গেল, যেন মদ বৃষ্টি হলো। পক্ষান্তরে আমেরিকায় মদ বৈধ ছিল। মদের ক্ষতি চিন্তা করে ১৯৩৩ সালে ১৮ নম্বর সংশোধনী বাতিল করে মদ নিষিদ্ধ করা হয়। মানুষকে মদের ক্ষতি বোঝানোর জন্য ৯ কোটি পৃষ্ঠার বিভিন্ন প্রচারপত্র বিলি করা হয়। ১৪ বছরে ৬৫ কোটি ডলার প্রচারে ব্যয় হয়। পাঁচ লাখ ৩৪ হাজার ৩৩৫ জনকে জেলে বন্দী করা হয়। এক কোটি ৬০ লাখ ডলার জরিমানা আদায় করা হয়। ৪০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। বৈধ কারখানাগুলো বন্ধ করার ফলে গোপন উৎপাদন শুরু হয়। চার হাজার বৈধ বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করা হয়। কিন্তু তার অনেক গুণ অবৈধ বিক্রয়কেন্দ্র সিলগালা করা হয়। ৭৯ হাজার ৪৩৭ জন বিক্রয়কারীকে গ্রেফতার করা হয়। বৈধ থাকতে সরকারিভাবে পরীক্ষা করে মান নিয়ন্ত্রণ করা হতো। অবৈধ কারখানায় সে ব্যবস্থা না থাকায় মদ হয়ে উঠল জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে মদকে আবার বৈধ ঘোষণা করে বৈধ কারখানা ও বিক্রয়কেন্দ্রের অনুমতি দেয়।
প্রথম ঘটনায় মুসলমানরা পরিপূর্ণ ঈমানদার ছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান ছিল তাদের কাছে সব কিছুর উপরে। তারা নৈতিকতার উচ্চস্বরে ছিলেন বলে এক ঘোষণায় মদ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় ঘটনায় নৈতিকতার ঘাটতি থাকায় মদ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। আমাদের দেশে মাদকের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চলছে, তা পরিপূর্ণ সফল হতে হলে নৈতিক শিক্ষার প্রতি আরো গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষকে ধর্মভীরু করার জন্য ধর্মীয় শিক্ষার আরো প্রসার ঘটাতে হবে। সরকারিভাবে অনুমতিপ্রাপ্ত ফাইভ স্টার হোটেলে, বার, ক্যাবারে মদ বৈধ থাকবে, আর সাধারণ জনগণের জন্য অবৈধ থাকবে, এ বৈষম্য বিরাজমান থাকলে মাদক নির্র্মূলে শতভাগ সফলতা আসবে না। ইসলাম মাদকদ্রব্য হারাম করেছে, তাই মাদককে সব স্তরে নিষিদ্ধ করতে হবে। মাদক উৎপাদন, বিপণন ও সীমান্ত পথে অবৈধভাবে প্রবেশের পথ বন্ধ করতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ

 


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum