২১ এপ্রিল ২০১৯

অহঙ্কার পতন ডেকে আনে

-


মানবসভ্যতার ইতিহাস বড়ই বৈচিত্র্যময়। প্রকৃতির পালাবদলের মতো মানুষের মনও বদলায়। দূর অতীত থেকে মানবজীবনের কর্মচঞ্চল অঙ্গনে পদে পদে এর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। শরতের প্রকৃতি যেমন সবদিক সবুজ শ্যামল দেখা যায় এবং মন নেচে ওঠে সবুজের সমারোহে কিন্তু সে তখন ভুলে যায় যে, সবুজের এই সমারোহ একদিন তিরোহিত হয়ে পাতা ঝরার মওসুমও আসতে পারে। মানুষের প্রকৃতি অনেকটা এ রকমই। কখনো সে সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের অধিকারী হলে এবং শক্তি-সামর্থ্য লাভ করলে সে তখন অহঙ্কার করে বেড়ায়। তার মনের কোণে এ কথা একবারও উঁকি দেয় না যে, এই শক্তি-সামর্থ্য ও সম্পদের পাহাড় বা প্রভাব-প্রতিপত্তি পাতাঝরা মওসুমের মতো যেকোনো সময় চলে যেতে পারে। আল্লাহর রাসূল একবার নয়, অনেকবার বলেছেন অহঙ্কার করো না।
আবার এই মানুষটিই কোনো বিপদের ফেরে পড়লে আবেগে উত্তেজনায় কেঁদে ফেলে, বেদনা ও হতাশায় ডুবে যায়, তার সারা মন-মস্তিষ্ক এতটা বেসামাল হয়ে পড়ে যে, আল্লাহকে পর্যন্ত গালমন্দ করে বসে এবং তার সার্বভৌম শাসন কর্তৃত্বকে অভিসম্পাত করে নিজের দুঃখবেদনা লাঘব করতে চেষ্টা করে। তারপর যখন দুঃসময় পার হয়ে গিয়ে সুসময় এসে যায় তখন আবার সেই আগের মতোই দম্ভ ও অহঙ্কারে ধরাকে সরাজ্ঞান করে এবং সুখ-ঐশ্বর্যের নেশায় মত্ত হয়। এ হচ্ছে মানুষের নীচতা, স্থুলদৃষ্টি ও অপরিণামদর্শিতার বাস্তব চিত্র।
মানুষের এ নীচ-প্রকৃতি সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে আমাদের ক্ষমতাসীনদের মাঝেও পরিলক্ষিত হয়। পৃথিবীর শাসকেরা যখন পরিপূর্ণরূপে ক্ষমতা পায় তখন তার অতীতের হীন অবস্থার কথা ভুলে যায়, ভুলে যায় ভবিষ্যৎ সম্ভাব্যহীনতর অবস্থার কথা। ফলে তারা সারা রাজ্যে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, জনগণের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালায় এবং তারা আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত হয়। তারা আল্লাহর আজাবের ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করতে ও বলতে থাকে। যারা এগুলো বলে, তাদের তারা ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করে। তাদের আত্মম্ভরিতার মাত্রা এতটুকুই বেড়ে যায় যে, ‘কই তোদের রব? কই তোদের রবের আজাব? তোদের প্রভু তো রক্ষা করতে আসে না? (নাউজুবিল্লাহ) বরং উল্টো আমরাই সুখ-ঐশ্বর্যের সাগরে ভাসছি, চার দিকে আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের ঝাণ্ডা উড়ছে। প্রকৃতপক্ষে এরা নিজেরাই পাগল হয়ে পড়েছে। শয়তান ওদের সামনে রঙিন পৃথিবীর স্বপ্ন বারবার উপস্থাপন করে মোহাবিত করে তোলে। আল্লাহ তায়ালাও তাদের কৃতকর্মকে সুদৃশ্য করে দেন। ফলে তারা আরো দিশেহারা হয়ে পড়ে। তার মধ্যে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশ লাভ করে। তার কাছে সত্যমিথ্যা, শিরক ও তাওহিদ, পাপ ও পুণ্য এবং সচ্চরিত্র ও অসচ্চরিত্র অর্থহীন মনে হয়। তার কাছে এখানকার ভোগ বিলাস, আরাম আয়েশ, বস্তুগত উন্নতি, সমৃদ্ধি এবং শক্তি ও কর্তৃত্বই মনে হবে কল্যাণকর। প্রকৃত তত্ত্ব ও সত্যের ব্যাপারে মাথাব্যথাই থাকবে না।
প্রথমে বলেছিলাম এ ধরনের ব্যক্তিদের কার্যাবলিকে শোভন বা সুদৃশ্য বানিয়ে দেয়া হয়। আল কুরআনে কখনো আল্লাহর কাজ কখনো শয়তানের কাজ বলা হয়েছে। যখন বলা হয়, আল্লাহ তার কাজগুলো আরো শোভন করে দেন তখন এর অর্থ দাঁড়ায়, এ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারীদের কাছে স্বভাবতই জীবনের এ সমতল পথই সুদৃশ্য অনুভূত হতে থাকে। আর যখন বলা হয় শয়তান তার কার্যাবলি শোভন করে দেয়, তখন এর অর্থ দাঁড়ায়, এ চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি অবলম্বনকারীদের সামনে শয়তান সবসময় একটি কাল্পনিক জান্নাত পেশ করে থাকে এবং বলে আশ্বাস দিতে থাকে সাবাস বেটারা এগিয়ে যাও।
এগুলো তাদের নীচ সহজাত প্রবৃত্তির একটি নিকৃষ্টতর প্রদর্শনী ছাড়া আর কিছু নয়। মহান করুণাময় আল্লাহ তায়ালা তাদের দুঃসাহসিক ভ্রষ্টতা ও অসৎকার্যাবলী সত্ত্বেও নিছক তার অনুগ্রহ ও করুণার কারণে তাদের শাস্তি বিলম্বিত করছেন। তাদের সংশোধিত হওয়ার সুযোগ দেয়াই উদ্দেশ্য। কিন্তু তারা এ অবকাশকালে ভাবছে, আমাদের সচ্ছলতা ও প্রাচুর্য কেমন স্থায়ী বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আমাদের এ বাগানে কেমন চিরবসন্তের আমেজ লেগেছে, যেন এখানে শীতের পাতা ঝরার মওসুমের আগমনের কোনো আশঙ্কাই নেই।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এমন একসময় আসা বিচিত্র নয় যখন আজ যারা অস্বীকার করছে, তারা অনুশোচনা করে বলবে, হায়, যদি আমরা আনুগত্যের শির নত করে দিতাম! ছেড়ে দাও এদের, খানাপিনা করুক, আমোদ ফুর্তি করুক এবং মিথ্যা প্রত্যাশা এদের ভুলিয়ে রাখুক। শিগগির এরা জানতে পারবে। এর আগে আমি যে জনবসতিই ধ্বংস করেছি তার জন্য একটি বিশেষ কর্ম-অবকাশ লেখা হয়ে গিয়েছিল। কোনো জাতি তার নিজের নির্ধারিত সময়ের আগে ধ্বংস হতে পারে না, তেমনি সময় এসে যাওয়ার পরে অব্যাহতিও পেতে পারে না’ (সূরা হিজর : ২-৫)।
অপরাধ করার সাথে সাথে আল্লাহ কাউকে গ্রেফতার করেন না। আর এই জন্য নির্বোধরা ধারণা করে নিয়েছে, ইসলাম, ইসলামী হুকুম-আহকাম ও ইসলামী ব্যক্তিত্বের সাথে অসদাচরণ করা হলেও কিছু হয় না। অথচ আল্লাহর নিয়ম হচ্ছে, প্রত্যেক জাতিকে শোনার, বোঝার নিজেকে শুধরে নেয়ার জন্য কী পরিমাণ অবকাশ দেয়া হবে এবং তার যাবতীয় দুষ্কৃতি ও অনাচার সত্ত্বেও পূর্ণ ধৈর্যসহকারে তাকে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার কতটুকু সুযোগ দেয়া হবে তা আল্লাহ আগেই স্থির করে নেন। যতণ এ অবকাশ থাকে এবং আল্লাহর নির্ধারিত শেষসীমা না আসে ততণ পর্যন্ত আল্লাহ ঢিল দিতে থাকেন। এই নির্ধারিত সময়সীমা কিয়ামত পর্যন্ত হতে পারে। আবার এমনটিও হতে পারে যে, তাদের কর্মকাণ্ড যদি বিকৃতির চরম পর্যায় ধারণ করে তাহলে তার কর্মের অবকাশ কমিয়ে দেয়া হয় এবং তাকে ধ্বংস করে ফেলা হয়। যার নজির আমাদের সামনে অনেক রয়েছে।
ঢিল দেয়া বা ধ্বংস করে দেয়ার অর্থ এই নয় যে, এখানেই সব শেষ। বরং আখিরাতে তাদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহ বলেন, যারা নিজেদের রবের দাওয়াত গ্রহণ করেছে তাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে আর যারা তা গ্রহণ করেনি তারা যদি পৃথিবীর সব সম্পদের মালিক হয়ে যায় এবং এ পরিমাণ আরো সংগ্রহ করে নেয় তাহলেও তারা আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচার জন্য এ সবকে মুক্তিপণ হিসেবে দিয়ে তৈরি হয়ে যাবে। এদের হিসাব নেয়া হবে নিকৃষ্টভাবে এবং এদের আবাস হবে জাহান্নাম, বড়ই নিকৃষ্ট আবাস (সূরা রাদ : ১৮)।
এই দুই প্রকারের মাঝে সফলকামী আরো কিছু মানুষ ও দল আছে যারা উভয় অবস্থায় ভারসাম্যনীতি অবলম্বন করে। সুখ এলে আল্লাহর শুকরিয়ার মাত্রা বেড়ে যায় আর দুঃখ যাতনা ও বেদনা এলে ধৈর্যধারণ করে। সবরকারী ব্যক্তি বা দল কালের পরিবর্তনশীল অবস্থায় নিজের মানসিক ভারসাম্য অটুট রাখে। সময়ের প্রত্যেকটি পরিবর্তনের প্রভাব গ্রহণ করে তারা নিজেদের রং বদলাতে থাকে না। বরং সব অবস্থায় একটি যুক্তিসঙ্গত ও সঠিক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে চলে। যদি কখনো অবস্থা অনুকূলে এসে যায় এবং সে ধনাঢ্যতা, কর্তৃত্ব ও খ্যাতির উচ্চাসনে চড়তে থাকে তাহলে শ্রেষ্ঠত্ব ও অহঙ্কারের নেশায় মত্ত হয়ে বিপথে পরিচালিত হয় না। আর কখনো বিপদ-আপদ ও সমস্যা-সঙ্কটের করাল আঘাত তাকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে তাহলে এহেন অবস্থায়ও সে নিজের মানবিক চরিত্র বিনষ্ট করে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে সুখৈশ্বর্য বা বিপদ-মুসিবত যেকোনো আকারেই তাকে পরীক্ষায় ফেলা হোক না কেন উভয় অবস্থায়ই তার ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা অপরিবর্তিত ও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। তার হৃদয়পাত্র কখনো কোনো ছোট বা বড় জিনিসের আধিক্যে উপচে পড়ে না।
লেখক : ব্যাংকার

 


আরো সংবাদ




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Bursa evden eve nakliyat
arsa fiyatları tesettür giyim
Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al
hd film izle gebze evden eve nakliyat