১৪ নভেম্বর ২০১৮

মায়ার সংসার\

-

লোকে বলে, সংসারের মায়া বড় জিনিস। এ মায়া, সংসারের এ টান জীবনকে এমন বাঁধনে জড়িয়ে রাখে মৃত্যু ছাড়া কোনো শক্তিই ছিন্ন করতে পারে না, কোথাও ছেড়ে যাওয়া যায় না। সংসারের মায়া কাটিয়ে কেউ কোথাও যেতে চায় না, ‘তবু যেতে হয়’ বলে কবিরও কত আপে! কিন্তু আমি বলি কি, ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট তো থাকেই। কিন্তু জগত সংসারকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টাও তো থাকতে হয়। কেমন হয়, যদি এমনটা দেখি, ছেড়ে যাওয়ার কষ্টকে বুকে চেপে বাঁচার চেষ্টা না করে অপরকেও বাঁচানোর চেষ্টা করি, অতঃপর মিলেমিশে একসাথে বাঁচি? মানুষের মায়ার শরীর শুধু নিজের জন্য হবে, আপনজনের জন্য নয়, মানুষের জন্য নয়, কেমন করে তা যথার্থ হয়? স্নেহ-মায়া-ভালোবাসা ছড়িয়ে দেয়া চাই সারা সংসারজুড়ে।
ধার্মিকের ধর্ম পালন শুধু নিজের ইহ-পরকালের লাভালাভের জন্যই কি? এতটা সঙ্কীর্ণ গণ্ডিতে মানবধর্মের জয়গান শ্রুতিমধুর হয় না। স্বল্পোন্নত দেশের বেশির ভাগ মানুষ আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মর্মার্থ বোঝে না। তাদেরকে ধর্মের কথা এমন করে বোঝানো চাই, যা তাদের বোধগম্য হয়। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর এমন সাধ্যাতীত ভার চাপিয়ে দেননি, যা তারা বহন করতে পারবে না। এটা কুরআনের কথা। রক্তের বন্ধন অস্বীকার করা যায় না। প্রত্যেক রক্তসম্পর্কীয় স্বজনের হক রয়েছে আমাদের ওপর। হক রয়েছে প্রতিবেশীরও এবং মানুষের ওপর মানুষের। এ সেই হক, যা স্রষ্টা কর্তৃক নির্দেশিত। সুতরাং এ হক অস্বীকার করার অধিকার কারো নেই। সমাজ সংসারের ন্যায়নীতির মানদণ্ড এমন হওয়া চাই, যেন আরিক অর্থেই রক্তচুর ভয়ভীতি হয়ে না দাঁড়ায়, ধমকের সুর হয়ে না বাজে। মানুষের ওপর মানুষের কর্তব্য বুঝিয়ে বলা দরকার। শান্তি এবং ধৈর্যের সাথে। ধিক্কার তিরস্কার তো নয়ই। মানুষকে সাথে নিয়ে মানুষের জন্য কল্যাণকর, মঙ্গলজনক কাজ শুরু করা চাই। ধর্ম প্রচার দরকার নেই এমন তো নয়। কিন্তু মাইকে মুখ লাগিয়ে, জোরেশোরে আওয়াজ তুলে ধর্মপ্রচারকরা যখন ওয়াজ করেন (কথাটা রাজনীতিকের বেলাতেও খাটে), তখন একবারও কি ভাবেন, আশপাশে বাসাবাড়িতে, হাসপাতালে অসুস্থ মানুষের কথা, পরীার্থী পড়ুয়াদের কথা, বৃদ্ধ, শিশুদের কথা? ভাবা উচিত।
একটা ব্যাপার প্রায়ই আমরা ল করি, অসুস্থ বন্ধু, আত্মীয়স্বজনের জন্য সাহায্যের আবেদন করা হয়। মানুষ সাধ্যমতো সাহায্য করেও। ধর্ম পালনের প্রসংশনীয় কাজ এটি। আমরা সবাই প্রায় গরিব আত্মীয়স্বজন দেখলে এড়িয়ে চলি। আবার পথেঘাটে পেশাদার ভিখারির থালায় ঠকাস করে সিকি-আধুলি ফেলে দানের সওয়াব পেলাম বলে আত্মতুষ্টিতে ভোগী। ধর্ম পালন এতই নির্বিকার? গরিব আত্মীয়কে এড়িয়ে না গিয়ে অপারগতা বুঝিয়ে বলা যায়। আর সম্ভব হলে গোপনে সাহায্য করাও যায়। গরিব আত্মীয়কে অর্থ সাহায্য করলে দানও হয়, আত্মীয়তাও রা হয়। এটা হাদিসের কথা। আমরা ধর্মকে জানি, মানুষকে জানাই এমনভাবে, যাতে মানুষ সত্যিকারের ধার্মিক হয়ে ওঠে, সমাজ-সংসারও ঠিকমতো শুধরে যায়।
নারীর মর্যাদা বিষয়ে ধর্মীয় বিধান, আদেশ-নির্দেশ ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে দেখি না। ভয় দেখিয়ে, নীচ দেখিয়ে শিা দেয়ার চেষ্টা অবমাননাকর। আধুনিক উচ্চশিতি নারী-পুরুষের মাঝে কুরআনের শিা উপস্থাপনার যোগ্যতা ওয়াজ নসিহতকারী বেশির ভাগ ইসলামী বক্তার মাঝে দেখা যায় না। অনেক েেত্র কৌশলগত কারণে অর্ধসত্য প্রচার করা হয়, যা সত্যিই দুঃখজনক।
সময় বদলেছে। উপযুক্ত এবং যথাযথ শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার হওয়া প্রয়োজন। অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলতে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়। এ কথা তো সত্যি, শ্রীহীন শিাব্যবস্থা আমাদের,পরীায় নম্বর তোলা আর ভালো একটা চাকরি জোগাড় করাই আজকের প্রজন্মের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। দোষ শুধু ওদেরও নয়, আমরা অভিভাবকরাও তাদেরকে উৎসাহিত করছি বটে। এরা সরাসরি উপদেশ শুনতে চায় না, ধর্মকর্মের কথা তো কিছুতেই না। তাহলে কী করব, এ ভাবেই আলো-আঁধারিতে তাদেরকে একা ছেড়ে দেবো? এ ভাবেই মুসলমানের ঘরে জন্মহেতু মুসলমান হয়ে থাকবে?
শিা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রজ্ঞা-প্রগতির সাথে ইসলামী শিা আসলে তো সাংঘর্ষিক নয়।। ইসলামী জ্ঞান, শিা অনগ্রসরতা পুরনো একটি মতবাদ, যার প্রয়োজন ফুরিয়েছে এ কথা তো সত্য নয়। কিন্তু সমস্যা এই, ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক বেশির ভাগই এই সত্য শুধু নিজেদের মধ্যেই রাখতে চান। মতের মিল নেই যেখানে, সে দিকে ফিরেও তাকাতে চান না। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির যে পত্রিকা, লেখালেখি তা সাধারণ শিায় শিতি ছেলেমেয়েরা পড়ে না। অজোপাড়াগাঁয়ে অসংখ্য অগণিত মানবসন্তান আলোহীন। তাদের পাশে কে আছেন? সবাই ঢাকামুখী, সীমান্তের আলোয় তাদের দৃষ্টি অথচ আলোকবর্তিকা কি তাদের বলা যায়? কী করে চলবে যদি এসব মানুষ পর্যন্ত সত্যের বার্তা পৌঁছাতেই না পারা যায়?
ভুল বার্তা, অশুভ সঙ্কেত পেয়ে ছোট ছেলেমেয়েগুলো দিগভ্রান্ত হচ্ছে। তাদের রা করা দরকার। এমন কিছু করা, যাতে তারা সত্য উপলব্ধি করতে পারে। ধৈর্য, সহিষ্ণুতা এবং যুগোপযোগী শিার আলো ফেলে তাদের পথ দেখানো যায়। তবে কথা তো এই, কে হবে সেই আলোর দিশারি? ভাবতে হবে নিশ্চয়!
লেখক : প্রবন্ধকার


আরো সংবাদ