২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

-

হজ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ ও মৌলিক ইবাদাত। জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেক সচ্ছল মুসলিম নর-নারীর ওপর হজ পালন করা ফরজ। আত্মিক উন্নতি, সামাজিক সম্প্রীতি ও বিশ্বভাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় হজের গুরুত্ব সর্বাধিক। মুসলিম বিশ্বের ঐক্য-সংহতি গড়তেও হজের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব মুসলিমের করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেনাও লাভ করা যায় হজের বিশ্ব মহাসম্মিলন থেকে। হজ শুধু ইবাদতই নয়, বরং আত্মিক পরিশুদ্ধতার এক অনস্বীকার্য পদ্ধতি। আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হজের বিনিময় নিশ্চিত জান্নাত। এ সম্পর্কে হাদিসে বলা হয়েছে, ‘কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়’।
জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট (৮-১০) তারিখে পবিত্র বায়তুল্লাহ বা কাবাঘর প্রদণি, আরাফাত ময়দানের মহাসম্মিলনে যোগদানসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা পালনের মাধ্যমে হজ আদায় করতে হয়। হজ পালনকারীকে এ সময় অশ্লীল-পাপাচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ, যৌনমিলন ইত্যাদি পার্থিব কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। আল কুরআনের ভাষায়, ‘হজের জন্য নির্ধারিত মাস আছে। যে ব্যক্তি হজ পালন করবে, সে স্ত্রীর সাথে যৌনমিলন, অশ্লীল কাজ ও অযথা ঝগড়া-বিবাদ করতে পারবে না’ (সূরা বাকারা : ১৯৭)। হজ পালনের সময় একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন থাকতে হয়। এ সময় হজ পালনকারীরা তাদের অনেক সম্পদ-প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেন। তারা মুণ্ডিত মস্তকে, স্বল্পবসন আর নগ্ন পায়ে সব সময় মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকেন। দুনিয়ার ভোগ-বিলাস, রূপ-লাবণ্য, ধন-সম্পদের মোহ কোনো কিছুই তাদের আকৃষ্ট করতে পারে না। এভাবে এক দিকে একনিষ্ঠ ইবাদত-বন্দেগি, অন্য দিকে নিরহঙ্কার, অনাড়ম্বর ও নির্মোহ জীবন যাপনের মাধ্যমে হজ পালনকারীদের আত্মা ষড়রিপুর কুপ্রভাব থেকে কলুষমুক্ত ও বিশুদ্ধ হয়। হজের মাধ্যমে যেমন আত্মার উন্নতি সাধিত হয়, তেমনি গুনাহও দূরীভূত হয়। এ বিষয়ে বুখারি শরিফের এক হাদিসে উল্লেখ আছে, ‘পানি যেমন ময়লা-আবর্জনা দূর করে, তেমনি হজও গুনাহ দূর করে।’
হজ মুসলমানদের জন্য ফরজ বা আবশ্যিক ইবাদত। প্রত্যেক জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন ও সামর্থ্যবান মুসলিম নর-নারীর ওপর হজ ফরজ করে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘মানুষের মধ্যে যারা পথের ব্যয় নির্বাহ করতে সম তাদের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ল্েয কাবাঘরে হজ পালন করা ফরজ’ (সূরা বাকারা : ৯৭)। মুসলিম শরিফের বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা: বলেছেন, ‘হে মানব সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন। সুতরাং তোমরা হজ পালন করো।’ সামর্থ্যবান ও সম মুসলিম হজ পালন না করলে তার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা আছে। হাদিসের ভাষায়, ‘আল্লাহ তায়ালা যাকে হজ পালনের সামর্থ্য দিয়েছেন অথচ সে হজ না করে মৃত্যুবরণ করে, তা হলে সে দোজখের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিতে পতিত হবে’ (মিশকাত)। হজ শুধু উম্মাতে মুহাম্মদির ওপর ফরজ করা হয়নি। পূর্ববর্তী অনেক নবী-রাসূল ও তাঁদের অনুসারীদের ওপরও হজ আদায়ের বিধান ছিল। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা প্রথম মানব হজরত আদম আলাইহিস সালামকে কাবাঘর নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইল আলাইহিস সালাম আল্লাহর নির্দেশে কাবাঘর সংস্কার করেছেন এবং তারাও হজ পালন করেছেন। প্রাচীনকাল থেকেই আরবের লোকেরা হজ পালন করত। তাই তো ইতিহাস থেকে জানা যায়, দণি আরবের বাদশাহ আবরাহা রাসূলের জন্ম বছরে কাবাঘর ভেঙে ফেলার জন্য বিশাল হাতিবাহিনী নিয়ে এসেছিলেন। অবশ্য আল্লাহর বিশেষ রহমতে ও কুদরতে কাবাঘর রা পায় এবং বাদশাহ আবরাহার বিশাল হাতিবাহিনী আবাবিল পাখির পাথর নিেেপ ভতি তৃণরূপ হয়ে যায়। হাদিস ও ইতিহাস থেকে জানা যায়, জাহেলিয়া যুগের লোকেরা হজ মওসুমে নগ্ন হয়ে কাবাঘর প্রদণি করত। ইসলামের প্রাথমিকপর্যায়ে মহানবী সা: হজ মওসুমে মক্কায় আগত মানুষদের কাছে ইসলামের সুমহান দাওয়াত পৌঁছে দিতেন। এতে বোঝা যায়, পূর্ববর্তী অনেক নবী-রাসূলের ওপরও হজ পালনের বিধান ছিল। তাদের স্মৃতি স্মারক ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শন করাও হজের অন্যতম উদ্দেশ্য। অধিকন্তু পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর সাথে ইসলামের সমন্বয় সাধনও হজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
হজ শুধুই ইবাদত নয়। বিশ্বভাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য ব্যাপক। হজের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ পবিত্র মক্কা নগরীতে একত্র হয়। ভাষা-বর্ণের ভিন্নতা, সাংস্কৃতিক-জাতীয় পরিচয়ের পার্থক্য ও ভৌগোলিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব মুসলিমের ভাতৃত্ববোধ জাগ্রত ও সুসংহত হয় পবিত্র হজ উদযাপনে। বিশ্ব মুসলিমের পারস্পরিক দুঃখ-অভাব, অভিযোগ-সমস্যা সম্পর্কে অবগত হওয়া ও তার সমাধানের সুযোগ হয় পবিত্র হজের বিশ্ব সম্মিলনে।
হজ গণতান্ত্রিক এক বিশ্ব সম্মিলন। এ সম্মিলনে বিশ্বের সর্বস্তরের মুসলিম অংশগ্রহণ করতে পারেন। জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংগঠন-সংস্থার সম্মিলনে সংশ্লিষ্ট দেশ-জাতির নেতা ও প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত। কিন্তু হজের সম্মিলনে বিশ্বের সর্বস্তরের মুসলিমের অংশগ্রহণের সুযোগ অবারিত। উঁচু-নিচু, ভাষা-বর্ণ, জাতি-গোত্র নির্বিশেষে বিশ্বের সামর্থ্যবান যেকোনো মুসলিমের নিঃশর্তভাবে হজ করার অধিকার ইসলামসম্মত।
হজ এক ধরনের দীর্ঘ সফর বা ভ্রমণ হলেও তা কোনো ভ্রমণবিলাস নয়। বরং এর মধ্যে লুকায়িত আছে মহান আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা-আনুগত্য আর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা। নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যয় এবং দৈহিক কষ্ট করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রচেষ্টা করা হয় পবিত্র হজে। মূলত হজ একটি অনন্য ইবাদত, যাতে সমন্বয় ঘটেছে আর্থিক ত্যাগ ও দৈহিক কসরত।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক সংহতিতেও হজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। হজের মওসুমে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোয় বিশেষত সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়। এ সময় ব্যবসায়ী বিশ্ব মুসলিম নেতারা আলাপ-আলোচনা-চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধশালী করতে পারেন। অনুরূপভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলিম নেতারা পারস্পরিক মতবিনিময়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান করতে পারেন। এতে বিশ্ব মুসলিম নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক সংহতি গড়ে উঠতে পারে। হজের সময় তারা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বমুসলিম সমাজ-সংস্কৃতিকে সুসংহত ও সমৃদ্ধ করতে পারেন।
নির্যাতিত-নিপীড়িত-বঞ্চিত ও সাম্রাজ্যবাদীদের আধিপত্যের শিকার মুসলিম বিশ্বের জন্য হজ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। হজ মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং অধিকার আদায়ের সুযোগ করে দেয়। হজ মওসুমে মুসলিম বিশ্বের নেতারা বিভিন্ন মুসলিম দেশের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-মতভেদ নিরসনে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেন। এ ছাড়া হজের বিশ্ব সম্মিলন থেকে মুসলিম নেতারা নিজেদের অধিকার আদায়ের ল্েয আধিপত্যবাদীদের মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ লাভ করেন। ইসলামের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদসহ প্রচারিত অন্যান্য অপবাদের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের করণীয় সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনাও দিতে পারেন তারা।
আরাফাত ময়দানে অবস্থান হজের অন্যতম ফরজ কাজ। তবে এ অবস্থান নিছক অবস্থানই নয়। এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য সমবেত বিশ্ব মুসলিমের করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে বিশ্বনেতাদের দিকনির্দেশনা দেয়া। মহানবী সা:-এর হজ থেকে এ শিাই পাওয়া যায়। তিনি বিদায় হজের সময় আরাফাত ময়দানে উপস্থিত মুসলিমদের উদ্দেশে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন বিষয়ের দিকনির্দেশনা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন এবং তার বক্তব্য অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছানোরও নির্দেশ দিয়েছেন। ঐতিহাসিকেরা হজরতের এ ভাষণকে বিদায় হজের ভাষণ নামে আখ্যাত করেছেন। মহানবীর এ ভাষণ রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘ম্যাগনাকার্টা’ হিসেবেও পরিগণিত হয়েছে।
পবিত্র কাবাঘর প্রদণি, আরাফাত ময়দানে অবস্থান, সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে দৌড়ানো, জামারায় পাথর নিপে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি ইত্যাদি হজের আনুষ্ঠানিক ইবাদত। হজের এসব ইবাদত পারস্পরিক সম্পর্কিত হলেও এর প্রত্যেকটির মধ্যেই রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও নিজস্ব ঐতিহ্য। কাবাঘর প্রদণি ও পশু কোরবানির মাধ্যমে হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইলের আদর্শ-ত্যাগের প্রতি প্রকাশিত হয় গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন। জামারায় পাথর নিেেপর সাথে জড়িত আছে শয়তানের প্রতি বালক ইসমাইলের অবজ্ঞার নিদর্শন। আর সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়ানোর মধ্যে নিহিত আছে শিশু ছেলে হজরত ইসমাইলের প্রতি বিবি হাজেরার ব্যাকুলতা স্মরণ।
প্রকৃতপে হজ একটি ঐতিহ্যবাহী অনন্য ফরজ ইবাদত ও বিশ্ব মুসলিম সম্মিলন। হজের মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিমের আধ্যাত্মিক-নৈতিক উন্নতি, সামাজিক-রাজনৈতিক সংহতি, অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি এবং আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় ইসলাম-মুসলিমের অবস্থান সুসংহত ও সুদৃঢ় হয়।
লেখক : গবেষক

 


আরো সংবাদ