১৯ নভেম্বর ২০১৮

হজ আধ্যাত্মিক সম্মেলন

-

আল্লাহ সামর্থ্যবান মুসলমানদের হজ করার আদেশ দিয়েছেন। হজে যাওয়া মানে বাড়িঘর, বিষয়-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন সব ত্যাগ করে আল্লাহর ডাকে, আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে যাওয়া। সব কিছুর মায়া ত্যাগ করে আল্লাহর ভয় ভালোবাসায় নিজের দিল ও দেমাগকে সজ্জিত করা। ইসলামের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ আরাকানের মধ্যে হজ একটি। এ হজের আছে তিনটি ফরজ। ০১. ইহরাম বাঁধা; ০২. ওকুফে আরাফাহ; ০৩. তাওয়াফে কাবা। হজ সামর্থ্যবান সক্ষম নারী-পুরুষের জন্য সমানভাবে ফরজ। এই হজ মুসলিম বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের এবং আল্লাহর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ ও কোরবানির নিদর্শন, সামর্থ্যবান, দায়িত্বশীল মুসলমানদের মিলনমেলা ও প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠান। ইসলাম যেকোনো বৈষম্য বরদাশত করে না এ হজ তার প্রমাণ। হজের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘যার পথের সম্বল থাকে সে যেন আল্লাহর ঘরে হজ করে। যে হজ করবে না কুফরি করবে তার জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন’। (সূরা আল ইমরান ৯৬-৯৭) এই হজে নারী-পুরুষ সবাইকেই এক আল্লাহর ডাকে ঐক্যবদ্ধভাবে সাড়া দিতে হবে।
হজ একটি মৌলিক ইবাদত
আল্লাহ বলেন, ‘আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে আমার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (আল কুরআন) এই হজ মালেরও ইবাদত, জানেরও ইবাদত। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা জানমাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করো।’ (আল কুরআন) আমাদের হানাফি মাজহাব অনুযায়ী হজের ফরজ তিনটি, ওয়াজিব সাতটি। ফরজ তিনটি হলোÑ ০১. ইহরাম বাঁধা; ০২. আরাফাতে অবস্থান; ০৩. তাওয়াফে জিয়ারত। সাতটি ওয়াজিব হলোÑ ০১. তাওয়াফে কুদুম; ০২. মুজাদালিফায় অবস্থান; ০৩. শয়তানকে পাথর মারা; ০৪. ইহরাম খুলে চুল কাটা; ০৫. সাফা-মারওয়া সায়ি করা; ০৬. বিদায়ী তাওয়াফ; হজের সময় ইহরাম বাঁধা অবস্থায় কোনো প্রাণী হত্যা করা যায় না। তা যদি মশা-মাছিও হয়। এমনকি শরীরের উকুন মারাও যাবে না। ছেঁড়া-কাটা যাবে না শরীরের কোনো লোমও। এভাবে সদা সতর্ক থেকেই হজের প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। রাসূল সা: বলেন, ‘সম্পদ থাকা সত্ত্বেও যে হজ করল না, সে ইহুদি নাছারা হয়ে মরুক; আল্লাহর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।’ অপর হাদিসে তিনি বলেন, ‘মাবরুর হজের প্রতিদান হলো জান্নাত।’
হজের আধ্যাত্মিক পয়গাম
হাজীগণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা:-এর প্রেম-প্রীতিসহ মক্কা-মদিনার উদ্দেশে যাত্রা করে ইহরাম বাঁধার যে বিধান তা মুসলমানদের আল্লাহর একজন নির্ভেজাল গোলাম এবং পাগলপ্রায় বান্দার রূপ দান করে। কাফনের সাদা পোশাক পরে খোলা মাথায় লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক বলতে বলতে মিনায় ও আরাফাতে যাওয়া, আরাফাতে গিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকা, মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন, কাবা ঘরের চার দিকে পাগলের মতো ঘুরে তাওয়াফ করা, এর চাইতে বড় আধ্যাত্মিকতা আর কী হতে পারে? তাওয়াফের ভাষায় যেটাকে ফানা ফিল্লাহ বলা হয়।
মদিনা শরিফ গিয়ে রাসূল সা:-এর রওজায় হাজীদের হাজিরা দিতে হয়। সেখানে থাকতে হয় প্রায় আট দিন। ৪০ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হয় সেখানে। এর মাধ্যমে হাজীগণ প্রমাণ করেন, আমরা আল্লাহর বান্দা ও সৈনিক হিসেবে আল্লাহর জন্য নিবেদিত প্রাণ হওয়া বিষয়ে রাসূলই সা:-ই আমাদের আদর্শ, আমাদের অগ্রজ। তিনিই সংবাদ দিয়েছেন আমাদেরকে আল্লাহর। তিনিই আমার প্রেম। তিনিই আমার ভালোবাসা।
হজের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পয়গাম
মুসলমানদের কাবাকেন্দ্রিক তাওয়াফ এবং আরাফাত আন্তর্জাতিক বার্ষিক ভ্রাতৃ সম্মেলনকে ইসলামিক পরিভাষায় হজ বলা হয়। যেহেতু ইসলাম পরিপূর্ণ জীবনাদর্শ, যেহেতু ইসলাম ইহলৌকিক-পারলৌকিক বিষয়ে পরিপূর্ণ বার্তা নিয়ে এসেছে, যেহেতু জাবালে রহমতের পাদদেশে আরাফাতের ময়দানে অনুষ্ঠিত মহাসম্মেলনে বিশ্ব মুসলমানদের আধ্যাত্মিক, মানবিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেয়া হয়, যেহেতু সে ভাষণে ইসলামের সব বিষয়ে আলোচনা হয়, সেহেতু এ হজই মুসলমানদের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ইসলামী সম্মেলন।
প্রিয় নবী সা:-এর বিদায়ী ভাষণ
প্রিয় নবী সা: তাঁর বিদায়ী ভাষণে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য, কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ, ইসলামী নেতৃত্বের আনুগত্য, মুসলিম ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব, অমুসলিমদের অধিকার, নারী অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, পারস্পরিক সঙ্ঘাত, ধর্মীয় কোন্দল, জুলুম-অত্যাচার, নরহত্যা, সম্পদ আত্মসাৎ, পারস্পরিক মানসম্মান রক্ষা, সম্পদের ব্যবহার ও উত্তরাধিকার, আমানতদারী, সব শ্রেণী, বর্ণ ও আঞ্চলিক বৈষম্যের অবসান বিষয়ে কথা বলেছেন এবং বলেছেন তোমাদের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ এবং উত্তম, যারা খোদাভীরু তাকওয়াবাদ। তিনি আরো বলেছেন, আরববাসীর ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরববাসীর বিশেষ কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তাকওয়াই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। অধীনস্থদের অধিকার, চাকর বাকরদের অধিকার বিষয়েও তিনি হেদায়েত দিয়েছেন। সার্বিক বিষয়ে তিনি পথনির্দেশনামূলক যে ভাষণ দিলেন, তার চেয়ে বড় আধ্যাত্মিকতা, বড় রাজনীতি আর কী হতে পারে? আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল সা:-এর আনুগত্য করো, নিজেদের আমল বরবাদ করিও না।’ (আল কুরআন) যারা প্রিয় নবী সা:-এর ধর্মীয় বিধান মানে, রাজনৈতিক বিধান মানে না, তারা কি রাসূলের আনুগত্যকারী?
হাজীগণ ইহরামের আধ্যাত্মিক পোশাক পরার পর যে তালবিয়া পড়া শুরু করেন, তা-ই তো বিশ্ব প্রভু মহান রাজাধিরাজ আল্লাহ, প্রভুত্বে, রাজত্বে শ্রেষ্ঠ, কর্তৃত্বে এবং সার্বভৌমত্বে নিরঙ্কুুশ হওয়ার বলিষ্ঠ ঘোষণা। সেখানে লাখ লাখ মুসলমান এক সাথে হয়ে একই ঘোষণা পাঠ করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের আনুগত্য এবং দাসত্বের যে শপথ নিয়ে আসেন, তাওয়াফে কাবা হচ্ছে সেই শপথে অবিচল থেকে আল্লাহর সাথে আধ্যাত্মিক রুহানি সম্পর্কের বিকাশ ও ঈমানি শক্তি সংগ্রহ করার প্রক্রিয়া।
দুঃখের বিষয়, সাহাবা আজমাইন যেভাবে প্রিয় রাসূল সা:-এর বিদায়ী ভাষণের পয়গাম নিয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন, হাজীগণও সেভাবে আল্লাহর আনুগত্য, রাসূলের অনুসরণ ও কুরআন-সুন্নাহকে ধারণ, ইসলামী ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের পয়গাম, শিক্ষা ও ইসলামী দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নিয়ে গোটা পৃথিবীতে যদি ছড়িয়ে যান, তা হলেই বিশ্ব হজ সম্মেলন ও হজ পালন সফল হবে। এর ওপরই নির্ভর করে আল্লাহর সন্তুষ্টি, ইহকালীন শান্তি এবং পরকালীন মুক্তি।
লেখক : খতিব॥


আরো সংবাদ