২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

হজ আদায় : কিছু প্রস্তাব

-


হজ ইসলাম ধর্মের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সম প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ ও নারীর ওপর জীবনে একবার হজ আদায় করা ফরজ। মুসলিম উম্মাহর বিশ্ব সম্মিলন এ হজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত লাখ লাখ মুসলমান মক্কা মুকাররমা এবং তদসন্নিহিত মিনা, আরাফাত, মুজদালিফা প্রভৃতি স্থানে একত্র হন প্রতি বছর জিলহজ মাসে। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠে মক্কার মাঠ-ঘাট-প্রান্তর। হজ বিশ্ব মুসলিমের মাঝে কাক্সিত ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে যুগ যুগ ধরে।
হারামাইন-শরিফাইনের বহিরাংশে অবাধে জুতা/সেন্ডেল ব্যবহার : বাইতুল্লাহ এবং মসজিদে নববীর বহিরাংশে জুতা/সেন্ডেল ব্যবহারে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই বেশির ভাগ হাজী কিংবা ওমরা আদায়কারী টয়লেট থেকে ফিরে অথবা রাস্তায় হেঁটে এসে অবাধে জুতা/সেন্ডেল পায়ে চলাফেরা করেন। যা দেখতে যেমন দৃষ্টিকটু, তেমনি পবিত্রতার ব্যাপারেও সংশয় জাগে।
নির্দিষ্ট এলাকা থেকে জুতা/সেন্ডেল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হারামাইন-শরিফাইনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।
হারামাইন চত্বরে ধূমপান : ইসলামের দৃষ্টিতে ধূমপান মাকরুহ তথা চরম অবাঞ্ছিত। কিন্তু অনেকেই প্রকাশ্যে হারামাইন চত্বরে ধূমপান করে থাকেন। যা চরম বেয়াদবির শামিল।
হারামাইন চত্বর ধূমপানমুক্ত করা অত্যাবশ্যক বলে আমরা মনে করি।
জমজমের পানি নেয়ার নির্দিষ্ট স্থানগুলো পিচ্ছিল : পবিত্র কাবা চত্বর ও বাইতুল্লাহর অভ্যন্তরে জমজম কূপের সুপেয় বরকতময় পানি পান করা ও নেয়ার জন্য অসংখ্য জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। আল্লাহর মেহমানগণ প্রাণভরে সেখান থেকে পানি পান করেন এবং বিভিন্ন পাত্র ভরে পানি নিয়ে যান। পানি পান ও নেয়ার সময় অসাবধানতাবশত আশপাশে পানি পড়ে অনেক জায়গা পিচ্ছিল হয়ে যায়। পানি পরিষ্কারের জন্য কর্মী নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় পরিষ্কার করার আগে অনেকেই পা পিছলে পড়ে যান এবং আহত হন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পানি নেয়ার স্থানগুলোতে পিচ্ছিলরোধক পাথর বসিয়ে আল্লাহর মেহমানদের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষায় এগিয়ে আসবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
নামাজ শুরুর আগে দরজা বন্ধ করে দেয়া : বাইতুল্লাহর অভ্যন্তরে নামাজ আদায় করা আল্লাহর প্রত্যেক মেহমানের একান্ত ইচ্ছা। বাইতুল্লাহর শৃঙ্খলা রক্ষায় অসংখ্য সশস্ত্র প্রহরী নিয়োজিত আছেন। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, প্রহরীদের অনেকেই মসজিদের অভ্যন্তরভাগ পূর্ণ হওয়ার আগেই মসজিদের দরজাগুলো বন্ধ করে দেন। ফলে আল্লাহর অসংখ্য মেহমান মসজিদের অভ্যন্তরে নামাজ আদায়ে বঞ্চিত হন।
দায়িত্বে নিয়োজিত প্রহরীদের মসজিদে মুসল্লি পূর্ণ হওয়ার পর প্রয়োজনে দরজাগুলো বন্ধ করার নির্দেশ প্রদানে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
মসজিদে নববীর মতো স্বয়ংক্রিয় ছাতার ব্যবস্থা করা : পবিত্র মক্কা ও মদিনা শরিফে তীব্র গরমে আল্লাহর মেহমানেরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। গরমের প্রচণ্ডতা উপলব্ধি করে মসজিদে নববীতে স্বয়ংক্রিয় ছাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনুরূপ বাইতুল্লাহর উন্মুুক্ত চত্বরের চারদিকে স্বয়ংক্রিয় ছাতার ব্যবস্থা করা হলে আল্লাহর মেহমানেরা শান্তিতে নামাজ আদায় ও অন্যান্য ইবাদত সম্পন্ন করতে পারবেন বলে আমরা আশাবাদী।
মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় পর্যাপ্ত টয়লেটের অভাব : মিনা, আরাফাত এবং মুজদালিফায় মহান আল্লাহর মেহমানদের অবস্থান হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সাধারণ হাজীদের জন্য ব্যবহৃত টয়লেট যেমন খুবই অপ্রতুল, তেমনি যা আছে তার মধ্যে অনেক টয়লেটে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নোংরা হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়।
মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় হাজীসাহেবগণ পবিত্রতা অর্জন এবং অধিক পুণ্য প্রাপ্তির প্রত্যাশায় গোসল করে থাকেন। পরিতাপের বিষয় স্থানত্রয়ে গোসলের তেমন কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় টয়লেটে গিয়েই অনেকে গোসল সারেন। এতে পবিত্র হওয়ার চেয়ে অপবিত্র হওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে। উপরন্তু গোসলে বেশি সময় ব্যয় হওয়ার ফলে টয়লেট সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে।
প্রত্যেক হাজীই মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে পবিত্র হজ করতে যান। সম্মানিত হাজীসাহেবদের সুবিধার্থে পৃথকভাবে পর্যাপ্ত টয়লেট এবং গোসলখানার ব্যবস্থা করার জন্য কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
মুজদালিফায় অবস্থানের সুবন্দোবস্ত নেই : মুজদালিফায় অবস্থান করতে গিয়ে বেশির ভাগ হাজীসাহেব অবর্ণনীয় দুর্দশার মুখোমুখি হন। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা না থাকায় সাধারণ হাজীসাহেবগণ যত্রতত্র অবস্থান করে অবর্ণনীয় কষ্টে রাত কাটান।
মুজদালিফায় শান্তিপূর্ণ অবস্থানের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ করছি।
আরাফাতের ভাষণ শোনার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা : আমিরুল হজ মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা প্রদান করেন। তার কাছাকাছি উপস্থিত হাজীগণ ব্যতীত কেউ তা শুনতে পান না। যদি গোটা ময়দানব্যাপী উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ডিজিটাল সিস্টেম মাইকিং ব্যবস্থা করা হয়, তবে কাছে ও দূরের হাজীগণ একযোগে তার বক্তব্য শুনতে পাবেন। এ ছাড়াও এরূপ ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে গোটা ময়দানের লোক একযোগে এক জামাতে আমিরুল হজের সাথে জোহর ও আসর নামাজ আদায় করার সুযোগ পাবেন।
পরিবহন ব্যবস্থার অপ্রতুলতা : হজের দিনগুলোতে হাজীদের সুবিধার্থে সরকার প্রদেয় বাসগুলো বন্ধ থাকায় হাজীসাহেবদের অবর্ণনীয় কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। একে সুযোগ মনে করে স্থানীয় গাড়ির মালিকগণ ২০ রিয়ালের ভাড়া ১০০ রিয়াল পর্যন্ত আদায় করতে দ্বিধা করেন না।
অনৈতিক এ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অনুগ্রহপূর্বক সম্মানিত হাজীসাহেবদের সুবিধার্থে সার্বক্ষণিক বাসসেবা চালু রাখুন এবং গাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।
হজ পৃথিবীর সব অঞ্চল, বর্ণ ও ভাষার মুসলিমদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার শিা দেয়। হজের মধ্যে ইসলামি উখওয়াতের বাস্তবরূপ ল করা যায়। তাই মুসলিম উম্মাহর শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক জীবন প্রতিষ্ঠায় উপরিউক্ত বিষয়গুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সম্মানিত হাজীসাহেবগণ উপকৃত হবেন বলে আমরা আশাবাদ। ভবিষ্যতের হজ পালন হোক নিরাপদ ও শান্তিময়Ñ এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : গবেষক


আরো সংবাদ