১৯ এপ্রিল ২০১৯

ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মূলনীতি

-


‘সহিষ্ণু’ শব্দের অর্থ বাংলা একাডেমির অভিধানে লেখা হয়েছেÑ সহনশীল, ধৈর্যশীল, মাশীল, প্রতীাশীল যার বিশেষণ হলোÑ ‘সহিষ্ণুতা’। এ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Tolerance এবং আরবিতে ‘আত-তাসামুহ’ ও ‘আত-তাফাউত’ ব্যবহার করা হয়। সেসব অর্থ পর্যালোচনা করলে ‘ধর্মীয় সহিষ্ণুতা’ বলতে বুঝায় ধর্মীয়ভাবে, ধর্মীয় কারণে কিংবা ধর্মীয় কোনো বিষয়ে অন্যের প্রতি সহনশীল হওয়া বা সহনশীলতার পরিচয় দেয়া। এটি অন্যকে, অন্যের মতো, আদর্শ ও বিশ্বাসকে সহ্য করার মতাও বটে।
ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ইসলামের অন্যতম একটি মৌলিক শিা ও সৌন্দর্য। (আল কুরআন : ১০৯ : ০৬) গুরুত্বপূর্ণ এ মূলনীতি শুধু ইসলামকে সার্বজনীনতার স্বীকৃতি এনে দেয়নি বরং স্বল্প সময়ের ব্যবধানে হজরত রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবদ্দশায় বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাদুমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। ইসলামের সুমহান বাণী তাই সর্বস্তরের মানুষের কাছে যেমনি গ্রহণযোগ্য হয়েছে, তেমনি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নিশ্চয়তা দিয়ে সামাজিক জীবনে এনে দিয়েছে শান্তি। ইসলামের দেখানো ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উদাহরণ তাই যুগে যুগে অনুকরণীয়-অনুসরণীয়। অথচ বর্তমান বিশ্বের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা সচেতন সবার বিবেককে তাড়া করছে। উপায় খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিবেকবান চিন্তাশীলরা। কিন্তু সেখানে উপেতি হয়েছে ইসলামের শিা।
ইসলামের প্রত্যেকটি বিধানের যেমন শরয়ী উদ্দেশ্য (মাকাসিদ) রয়েছে, তেমনি রয়েছে তার মূলনীতি। এসব উদ্দেশ্য ও মূলনীতি না জানার কারণে অনেক সময় ‘শারে’ বা বিধানদাতার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে না। এ েেত্রও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন : ইসলামি বিধিবিধানের মূল ল্য দুনিয়ার কোনো কিছু অর্জন নয়, বরং তা শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে। এ েেত্রও সহিষ্ণুতার মূল উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কারণ, আল্লাহর বিধানই হলোÑ অন্যের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে দুনিয়ার জীবন পরিচালনা করা যতণ তা তাওহিদের সাংঘর্ষিক কিংবা অন্য কোনো মৌলিক বিধানের বিপরীত না হবে। আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘বলুন, হে আহলে কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আসো যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমানÑ যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করব না, তার সঙ্গে কোনো শরিক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে, ‘সাী থাকো, আমরা তো অনুগত।’ (সূরা ইমরান : ৬৪) রাসূলুল্লাহ সা:-এর হাদিসেও এর প্রত্যয়ন পাওয়া যায়। আনাস রা: থেকে বর্ণিত, নবী করিম সা: বলেছেন, ‘যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে সে ঈমানের মিষ্টতা লাভ করে থাকে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা: তাঁর কাছে অন্য সব কিছু থেকে অধিক প্রিয় হবে; কাউকে ভালোবাসলে কেবল আল্লাহর জন্যই ভালোবাসবে। আর কুফরি থেকে তাকে আল্লাহ বাঁচানোর পর পুনরায় তাতে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করবে, যেমন সে নিজেকে আগুনে নিপ্তি করাকে অপছন্দ করে।’ (বোখারি : ৬০৪১ ও মুসলিম : ১৩)
সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা : শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গিতে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার দুনিয়াবি উদ্দেশ্য হলো সামাজিক জীবনে একে অন্যের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা। এটি মোটেও এমন নয় যে, অন্য ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে মেনে নেয়া বা নিজেকে সে অনুযায়ী পরিচালনা করা। বরং সে ধর্ম বা বিশ্বাসকে এ জন্য সহ্য করা যে, সেটি তাদের জন্য প্রযোজ্য। (সূরা কাফিরুন : ৬) শুধু ধর্মীয় কারণে বা বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণে কারো সাথে এমন আচরণ করা যাবে না যা অসহিষ্ণুতা ও সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যায়। প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ড. জামাল বাদাভি বলেন, ‘মুসলিম-অমুসলিম সুসম্পর্কের মূল ভিত্তি ও উদ্দেশ্য হলোÑ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিতকরণ, ন্যায়পরায়ণতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ...।’
ভ্রাতৃত্ববোধকে (উখুয়াত) প্রতিষ্ঠা করা : ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উদ্দেশ্য হলোÑ ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা। এটি এমন এক চেতনা, যাতে একে অন্যদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এ বোধ অনস্বীকার্য। কারণ, ইসলামি মূল্যবোধের শিা হলোÑ সমগ্র মানবজাতি এক পিতা থেকে এসেছে (সূরা নিসা : ১) এবং সে পিতার সব সন্তানকে আল্লাহ তায়ালা নিজেই সম্মানিত করেছেন অন্য সব সৃষ্টির ওপর।’ (সূরা ইসরা : ৭০) এখানে ভেদাভেদ করা হয়নি ভিন্ন ধর্ম, ধর্মীয় বিশ্বাস, মত, পথ ও আদর্শকে। এত যে ভিন্নতা এগুলো একে অপরের মধ্যে পরিচয়ের মাধ্যম। তবে, সৃষ্টিকর্তার সামনে সম্মানিত সে, যে তাকওয়াবান।’ (সূরা হুজুরাত : ১৩)
ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মূলনীতি : ধর্মীয় সহিষ্ণুতার কিছু মূলনীতি আছে। তা ছাড়া চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। ইসলামের প্রত্যেকটি বিধানে মূলনীতি আছে। সে েেত্র কিছু মূলনীতি আছে যা অবশ্যম্ভাবীভাবে পালনীয়। যেমনÑ
সামাজিক শান্তিই মূল ভিত্তি : সামাজিক শান্তিই হবে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মূল ভিত্তি। সমাজ জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার ল্েয ধর্ম ও বিশ্বাসের ভেদাভেদ ভুলে যেয়ে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষকে উপো করবে জীবনের প্রত্যেক পর্বে। ধর্ম ও বিশ্বাস সেখানে চালিকা হিসেবে কাজ করবে, কিন্তু তার মৌলিকতায় কোনো ছেদ ঘটাবে না। সুতরাং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা হবে শান্তিপূর্ণ এক সমাজব্যবস্থা যেখানে ধর্ম ও বিশ্বাসের কারণে কোনো রকম ঝগড়া-বিবাদ থাকবে না, থাকবে না কোনো অন্যায়-অবিচার। নিরাপত্তা পাবে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু সবাই। ফলে শান্তিই হয়ে উঠবে জীবনের এক বাস্তব অধ্যায় হিসেবে।
উভয়ের পারস্পরিক সদিচ্ছা: সহিষ্ণুতা উভয় প থেকেই হতে হবে। অর্থাৎ সহনশীলতা ও মাশীলতা, ধৈর্যের বহিঃপ্রকাশ একপ থেকে হলে হবে না। এটি এ জন্য যে, উভয়পই চায় সম্প্রীতি বজায় থাকুক এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হোক। একপ সহিষ্ণু হলেও অন্য প্েযর অসহযোগিতা সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যাবে এটাই বাস্তব।
নির্দিষ্ট ল্য : ধর্মীয় সহিষ্ণুতা নির্দিষ্ট ল্েয হতে হবে এবং তা অবশ্যই সামাজিক বিষয়গুলোতে হবে। এটি ধর্মের কোনো মৌলিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিষয়ে হতে পারবে না। সে েেত্র উভয়ের পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যে সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা ও মানবাধিকারের বিষয়গুলোই এ জন্য প্রাধান্য পাবে যে, তারা নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ উদ্দেশ্যের ব্যত্যয় ঘটলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হবে। উল্লেখ্য, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা শুধু ভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসীর সঙ্গে নয়, বরং এটি হতে পারে একই ধর্মের অনুসারীর ভিন্ন মতাবলম্বীর ওপর। কিন্তু এটি ততণ পর্যন্ত পালিত হবে, যতণ একজনের ধর্ম, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা কার্যাবলি অন্য কোনো ধর্ম, তার অনুসারী ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর জন্য তির কারণ না হবে। ফলে সঙ্ঘাত- সংঘর্ষের সম্ভাবনা থাকে। পরিশেষে বলব, শরয়ী বিধিবিধানের উদ্দেশ্য ও মূলনীতি জানা থাকলে সে বিধান পালনে যেমন আগ্রহ তৈরি হবে, তেমনি তা উপভোগ্য ও আনন্দদায়ক হবেÑ এটাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া নির্দিষ্ট ল্েয পৌঁছতে সঠিক মূলনীতি জানা ও সে আলোকে তা পালন করা অত্যাবশ্যক। শরয়ী বিষয়ে তাই মূলনীতি বিচ্যুত হলে লাভের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি। সুতরাং ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির জন্য যারা কাজ করবেন সর্বোপরি সব মুসলিমের জন্য এসব বিষয়ে ধারণা থাকা খুবই জরুরি।
লেখক : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক ও গবেষক

 


আরো সংবাদ




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Bursa evden eve nakliyat
arsa fiyatları tesettür giyim
Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al