২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আন্তর্জাতিক আইন

-

এ বিষয়ে কোনো আলোচনা শুরু করার আগে আমাদের মনে রাখতে হবে পশ্চিমা আন্তর্জাতিক আইন, যা বর্তমানে একটি বিশ্বমাত্রিক বৈধতা দাবি করছে, তার আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিষয়াদির ধারণা কিন্তু বেশি দিনের পুরাতন নয়। যে আইনগুলোকে আমরা জাতিসমূহের আইন বলে জানি তা ডেলফটের ঐঁমড় এৎড়ঃরঁং-এর গধৎব খরনবৎঁস (১৬০৯) এবং উব লঁৎব নবষষর ধপ ঢ়ধপরং (১৬২৫)-এর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
আধুনিক পশ্চিমা আন্তর্জাতিক আইনগুলোর জন্মক্ষণটি প্রকৃতপক্ষে প্রাকৃতিক আনি তত্ত্ববাদের পুনরুত্থানের ধারায় ‘আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্মক্ষণ’ (অঁমঁংঃ ঋৎবরযবৎৎ াড়ৎ ফবৎ ঐবুফব, ১৯৫২)-এর জন্য অপেক্ষমাণ ছিল।
এর পূর্বে একমাত্র আইনগত ‘প্রাচীন’ (রোমান ও ইসলামি) ধারণাগুলোর তথাকথিত ঔঁং এবহঃঁঁস বা সাধারণ আচারসিদ্ধ প্রথা ও নৈতিকতাগুলোই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকপর্যায়ে একমাত্র অনুসরণীয় আইন বলে স্বীকৃত ছিল।
এ ক্ষেত্রে কুরআন সন্ধি ও চুক্তির আন্তর্জাতিক আইন, রাজনৈতিক আশ্রয়ের বিধানাবলি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আইনগত অবস্থান ও আন্তর্জাতিক সমর আইনগুলোর জন্য একটি যথার্থ ভিত্তিভূমি রচনা করেছে। কুরআন ঘোষণা করে যে, সন্ধিপত্রের শর্তগুলোকে অবশ্যই মান্য করে চলতে হবে (চধপঃধ ংঁহঃ ংবৎাধহফধ), যদি তা অমুসলিমদের সাথে হয় তবুও।
সূরা আল মাইদাহের শুরুই হয়েছে এ আয়াত দিয়েÑ ‘হে মানুষ! তোমরা যারা ঈমান এনেছ, ওয়াদাগুলো পূরণ করো’ (৫:১)। এ কারণে ক্রুসেড চলাকালীন সময়ে বা মধ্য ইউরোপে তুর্কি সমরাভিযান চলাকালে অথবা ঝধষব এবং আলজিয়ার্স থেকে মুসলিম রণতরীগুলো যখন স্পেনের বিরুদ্ধে তৎপর ছিল তখনো এদের মধ্যে প্রসারমান বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলো ছিন্ন হতে দেখা যায়নি।
যেহেতু প্রতিটি মুসলিম একটিমাত্র ইসলামি সম্প্রদায় (উম্মাহ)-এর সদস্য, সেহেতু ইসলামি আইন অনুসারে একমাত্র অমুসলিমরাই ভিনজাতি হিসেবে আখ্যায়িত হন। রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত হলে অমুসলিমরা ইসলামি সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে পরিপূর্ণ নিরাপত্তার দাবিদার হন (সম্প্রদায়ের কোনো একটি ব্যক্তি দ্বারা নিরাপত্তা প্রদত্ত হলে তা সমগ্র সম্প্রদায়কর্তৃক প্রদত্ত নিরাপত্তা বলে গণ্য হবে)। কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় কেবল এই ধরনের প্রদত্ত নিরাপত্তা (আমান) অথবা সম্পূর্ণ সম্প্রদায়ের কাছে আত্মসমর্পণের ভিত্তিতে আইনগত বৈধতাপ্রাপ্ত হয়। ইসলামি সম্প্রদায়ের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত সম্প্রদায়গুলো (জিম্মি) প্রতিনিধিত্বের অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করেন। তারা বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকেন কিন্তু তার বিনিময়ে একটি মাথাপিছু কর প্রদান করেন। খ্রিষ্টান অথবা ইহুদি হিসেবে তারা তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও পেশাগত বৃত্তির ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকেন। মদ্যপান ও শূকর মাংস ভক্ষণের ওপর প্রদত্ত ইসলামি নিষেধাজ্ঞা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। তারা যথাযথ সম্পত্তির অধিকার ভোগ করেন। তবে লোক প্রশাসন ও সশস্ত্রবাহিনীতে তাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত নয়। অবশ্য শনাক্তকরণের সুবিধার্থে প্রচলিত পদ্ধতিগত ভূষণ বিধিমালা তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইসলাম গ্রহণের জন্য তাদের ওপর কোনো প্রকার চাপ প্রয়োগ করা আইনের বরখেলাফ বলে স্বীকৃত।
কুরআনকর্তৃক প্রদত্ত সংখ্যালঘুদের আইনগত অবস্থানসংক্রান্ত এই বিধানটি সামগ্রিকভাবে উদার প্রকৃতির। সপ্তম শতক থেকে শুরু করে তার এক হাজার বছর পরেও এমন উদার আইনের সন্ধান কোথাও পাওয়া যাবে না। আমরা যদি ইতিহাসের পাতায় একবার হুগুইনো, সেলজবার্গ প্রোটেস্টান্ট, রুশ ইহুদি, আন্দুলুসীয় মুসলমান এমনকি সাম্প্রতিক বিশ্বের বসনীয় মুসলিমদের দিকে তাকাই তাহলে বিষয়টি সম্পর্কে দ্বিতীয় কথার আর কোনো অবকাশ থাকে না। অবশ্যই আজকের দিনে বসে ইসলামি আইনগুলোর প্রচুর কাব্যিক সমালোচনা হাজির করা যায়, প্রকারান্তরে এই সমালোচনাগুলোই প্রমাণ করে যে, ‘অতি ভালো ভালো নয়’ প্রবাদটি প্রকৃতপক্ষে বাস্তবতার স্বীকৃতিই বটে। ইসলামের অভ্যুদয় থেকে বিংশ শতক পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়কাল ধরে ইয়েমেন থেকে সুদূর পশ্চিম আফ্রিকা এবং ইস্তাম্বুল পর্যন্ত এলাকাজুড়ে ইহুদি সম্প্রদায়ের বৈষয়িক সমৃদ্ধিই প্রমাণ করে যে, সংখ্যালঘু-সংক্রান্ত ইসলামি আইনটি কতখানি প্রগতিশীল। ষষ্ঠাদশ শতক থেকে শুরু করে খ্রিষ্টীয় রাজন্যগণকর্তৃক বিতাড়িত স্পেনীয় ইহুদিরা আশ্রয়ের খোঁজে এসব অঞ্চল, তুর্কি সালোনিকিতেই ছুটে গিয়েছিলেন এবং মুসলমানদের এ সংক্রান্ত নিয়মনীতি সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞাত হয়েই তারা গিয়েছিলেন।
এখনো যদি কেউ প্রাচীন মরক্কোর রাজকীয় শহরগুলোয় ভ্রমণ করেন তাহলে তিনি দেখতে পাবেন, তথাকার রাজবংশগুলো ইহুদি আশ্রয়প্রার্থী সম্প্রদায়গুলোকে তাদের রাজপ্রাসাদের সন্নিকটেই আবাসন প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই একই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মরক্কোর বাদশাহ আজো ইহুদিদেরকে তাদের পৈতৃক নিবাসে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
পাশ্চাত্য ভাবধারা অনুসারে আন্তর্জাতিক আইনের যে বিধান দু’টি নিবন্ধের প্রারম্ভে উল্লিখিত হয়েছে, ইসলামি বিশ্ব তার প্রতি মূলত দু’টি কারণে সন্দিহান।
প্রথমত, প্রতিটি ধর্ম ও মতবাদের মতো (ইয়াহুদবাদ ছাড়া) ইসলামও আন্তর্জাতিকতাবাদী ধর্ম। মুসলমানেরা স্বভাবতই গোটা বিশ্বের ইসলামিকরণের স্বপ্ন দেখে, যদিও কুরআন বা সুন্নাহ কোনোখানেই এ ধরনের অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়নি তো বটেই বরং এর বিপরীতটিই বিবৃত হয়েছে।
এই কথিত আন্তর্জাতিকতাবাদের কারণে ইসলামি আইনবিজ্ঞানের মধ্যে একটি বিশ্বরাষ্ট্রের ধারণা স্থান লাভ করেছে, যেখানে বিভিন্ন জাতীয় রাষ্ট্রের মধ্যে বিভক্ত পৃথিবীর বাস্তবতাটি স্থান লাভ করেনি। একাধিক রাষ্ট্রের ধারণার কিছু মাত্র যদি এখানে স্থান পেয়েও থাকে তবে তা নিতান্তই দ্বিমাত্রিক। একটি হচ্ছে বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জাতিসমূহের সংমিশ্রণের গঠিত একটিমাত্র ইসলামি উম্মাহের জগৎ (দারুল ইসলাম) এবং অপরটি নীতিগতভাবে তার বিপরীতে অবস্থিত জাতিসমূহ, যারা তখনো ইসলামি বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত হয়নি (দারুল হরব বা যুদ্ধাবস্থার দেশ)।
এ ধরনের একটি আবেদন শুধু একই উম্মাহের মধ্যে একাধিক নৃতাত্ত্বিক জাতিগত ইসলামি রাষ্ট্রের অবস্থানের বাস্তবতাকেই অস্বীকার না করে বরং একই সাথে সামগ্রিকভাবে ইসলামি উম্মাহ এবং অমুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সমমর্যাদাভিত্তিক স্থিতাবস্থা তথা আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিকেও অস্বীকার করে।
মক্কা বিজয়ের (৬২৮ খ্রি:) দুই বছর পূর্বে রাসূল সা:-কর্তৃক মক্কার গোত্রপ্রধানদের সাথে সম্পাদিত হুদাইবিয়ার সন্ধিকে আদর্শ হিসেবে ধরে পরবর্তীকালের মুসলিম আইনবিশারদেরা দারুল সুলহ বা দারুল আহদ (সন্ধি বা চুক্তিকালীন দেশ-অবস্থা) নামে শত্রুভাবাপন্ন শক্তিগুলোর সাথে একটি আইনসম্মত অন্তর্বর্তীকালীন তৃতীয় স্থিতাবস্থার তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। মদিনার নগর রাষ্ট্রের জন্য রাসূল সা: কর্তৃক প্রদত্ত সংবিধানের মধ্যে প্রাপ্ত তৎকালীন মদিনার মুসলিম ও ইহুদি গোত্রগুলোর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিধানগুলোও এই উদ্দেশ্যে একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও ইসলামি বিশ্বের স্বঘোষিত খলিফা হিসেবে অটোমান সুলতানেরা ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বের আন্তর্জাতিক আইনকে স্বীকৃতি প্রদানে প্রস্তুত ছিলেন না। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের অব্যবহিত পরে সুলতান আবদুল হামিদ কর্তৃক স্বাক্ষরিত ১৮৫৬ সালের প্যারিস চুক্তির পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং তুরস্ক প্রিন্স গবঃঃবৎহরপয কর্তৃক রূপায়িত ‘সমমর্যাদাসম্পন্ন শক্তিগুলোর সহাবস্থান’-এর পৃথিবীতে আনুষ্ঠানিকভাবে পদার্পণ করে।
অবশ্য সাধারণ আন্তর্জাতিক আইন বা তথাকথিত ‘প্রাকিতিক আইন’-এর ভিত্তিতে প্রণীত চুক্তিগুলো মুসলমানদের জন্য কোনো ধর্মীয় দায়বদ্ধতার জন্ম দেয় না। চবঃধ ঝঁহঃ ংবৎাধহফধ-এর ধারণাটি তাদের কাছেও ঐশী বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যদিও বাস্তবক্ষেত্রে তা খুব সামান্যই মূল্য বহন করে। কারণ, একটি পক্ষ যতক্ষণ তার চুক্তির শর্তগুলোকে মান্য করে চলে, ততক্ষণ এটি সে তার অভ্যন্তরীণ আইন [মুসলমানদের ক্ষেত্রে শরিয়াহ] না ‘প্রাকৃতিক আইন’-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাস্তবতার খাতিরে মান্য করে চলেছে সেটি কোনো বিচার্য বিষয় থাকে না- মান্য করে চলাটাই এখানে মূল কথা।
এখানে আমরা যে বিতর্কের সম্মুখীন হচ্ছি তা মানবাধিকারবাদের প্রকৃত ভিত্তিভূমি (মানবাধিকারবাদ অধ্যায়টি দেখুন) সংক্রান্ত বিতর্কের মতো চারিত্রিকভাবে তাত্ত্বিক প্রকৃতির।
তথাপি তত্ত্বগতভাবে আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে বিশেষ ইসলামি ধারণার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা আছে কি না তা বিচার্য রয়ে যায়; যা অধুনালুপ্ত সমাজতান্ত্রিক ব্লকের মতো নিতান্তই বর্তমান বিশ্বের ইসলামি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক আইনের একটি ধারণা (সাময়িকভাবে হলেও জন্ম দিতে পারে। যার বিধানগুলো ততদিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে, যতদিন পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো একত্র হয়ে একটি ‘অখণ্ড রাজনৈতিক অস্তিত্ব’ তথা বিশ্ব ইসলামি উম্মাহের প্রতিষ্ঠা না করছে।

ভাষান্তর : মঈন বিন নাসির


আরো সংবাদ