২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মা-বোনদের হজ

-

হজ সর্বসম্মতভাবে ইসলামের একটি রুকন এবং ইসলামের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ। কুরআনের বহু আয়াতে এবং অসংখ্য হাদিসে এর তাগিদ ও গুরুত্ব ব্যক্ত করা হয়েছে।
ওলামায়ে কেরামের মতে হিজরি নবম বছরে সূরা আল ইমরানের একটি আয়াতের মাধ্যমে হজ ফরজ করা হয়েছে। (ইবনে কাসির)।
মুসলমান বোনেরা আমার, হজে যাওয়ার নিয়ত করলে অবশ্যই হজের মাসআলা-মাসায়েল, নিয়ম-কানুন, ইবাদতের পদ্ধতি, মক্কা-মদিনায় করণীয় এবং হজে নিষিদ্ধ কার্যাবলি সম্পর্কে জেনে নেয়া আবশ্যক। মানুষমাত্রই ভুল করে। তাই আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা ও আন্তরিক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ত্রুটিহীন হজ সম্পন্ন করা হয়তো সম্ভব হবে না। আল্লাহ রহমানুর রাহিমের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে হজের ক্রিয়াকর্ম পালন করতে সচেষ্ট থাকব, আশা করি। কেননা হজ ও ওমরার আহকামের গাফেলতি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কাদের জন্য হজ ফরজ? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়, প্রত্যেক সামর্থ্যবান নর-নারীর জন্য হজ ফরজ। পবিত্র কুরআন মাজিদে আল্লাহ পাক বলেন, আল্লাহর উদ্দেশে আল্লাহর ঘর কাবা শরিফে হজব্রত পালন করা সে সব মানুষের ওপর ফরজ যাদের তথায় পৌঁছবার মতো সঙ্গতি আছে। মহিলাদের হজ ফরজ হতে তার মালিকানায় সম্পদ অথবা নগদ অর্থ থাকতে হবে; যা কর্মজীবী মহিলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে প্রত্যেক নারীর বাবা বা স্বামীর সম্পদে অধিকার থাকলেও তাদের জীবদ্দশায় মালিকানার দাবিদার হয় না।
তবে বাবা মারা গেলে, পৈতৃক সম্পদ ভাইদের কাছে থাকলেও সম্পদের মূল্য অনুপাতে হজ ফরজ হতে পারে। মুসলিম মহিলাদের হজে যেতে যেহেতু সাথে একজন পুরুষ মাহরাম অবশ্যই থাকতে হয়; ওই মাহরামের স্বেচ্ছায় খরচ বহনের সঙ্গতি বা ইচ্ছা না থাকলে মহিলা দু’জনের খরচ বহন করে হজ সম্পাদন করবেন। স্বামী বা ছেলে বা মাহরাম স্বেচ্ছায় খরচ বহন করলে ভাগ্যের কথা।
হজের প্রস্তুতি : হজের ধর্মীয় প্রস্তুতিতে পুরুষ-মহিলার পার্থক্য খুব সামান্যই। পবিত্র কাবার তাওয়াফে, মিনা-মুজদালিফা-আরাফাতে দোয়া দরুদ, এহরাম অবস্থায় করণীয় ও বর্জনীয় ইত্যাদিতে হজের আহকাম সবার জন্য এক। তবে পোশাকের বেলায় এবং সা’ঈতে রমল করার ক্ষেত্রে পুরুষ মহিলায় কিছু পার্থক্য আছে। সাফা-মারওয়ার সা’ঈতে নির্ধারিত স্থানে পুরুষদের দ্রুতলয়ে হাঁটা কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। আবার এহরামের ক্ষেত্রে মহিলাদের পোশাক স্বাভাবিক কিন্তু পুরুষেরা মাত্র দুখণ্ড সেলাইবিহীন বস্ত্র পরিধান করেন। মহিলাদের পোশাকে বাধ্যবাধ্যকতা না থাকলেও সাদা পোশাক ও বোরখা থাকা বাঞ্চনীয়। তাদের মুখমণ্ডল কাপড়ে আবৃত করা যাবে না। (তবে মুখমণ্ডল পর্দা করতে চাইলে কাপড় যাতে মুখে না লাগে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।)
মানসিক প্রস্তুতি : বোনেরা, হজে যাওয়ার নিয়ত করে থাকলে প্রথম থেকেই হজবিষয়ক বই পুস্তক, হাদিস শরিফ, বিভিন্ন পুস্তিকা পড়ে জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করা ভালো। ঘরের বাইরে মাসাধিকাল থাকতে হবে চিন্তা করে ওই সময়ের জন্য পরিবারের খাওয়া-দাওয়া, সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ইত্যাদির প্রয়াজনে একজন বিশ্বস্ত নিকটাত্মীয়কে রেখে যাওয়ার ব্যবস্থা করা উত্তম। বাকিটা আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকবেন।
নামাজের প্রস্তুতি : মক্কা-মদিনার মসজিদে, আরাফাত-মিনায়, অন্য গুরুত্বপূর্ণ মসজিদগুলোতে নামাজ আদায় করার প্রয়োজনে হজের আগেই এ বিষয়ে জ্ঞান নিতে হবে; যেহেতু আমাদের বেশির ভাগ মহিলারই মসজিদে নামাজ পড়ার অভিজ্ঞতা নেই তাই প্রত্যেক হাজী সাহেবানদের মসজিদে সশরীরে গিয়ে পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করার দৃঢ় ইচ্ছা থাকা কাম্য।
দুঃখজনক হলেও সত্যি মহিলাদের মসজিদে না গিয়ে হোটেলে বা আবাসস্থলে বসে গল্প গুজবে সময় কাটাতে দেখা যায়। মা-বোনদের প্রতি অনুরোধ, আল্লাহর ঘরে, নবীজীর মসজিদে নামাজ আদায়কে গুরুত্ব দিবেন, গাফেলতি করবেন না।
পবিত্র মক্কার হেরেমে পুরুষ ও মহিলার নামাজে আলাদা ব্যবস্থা নেই। কেননা পবিত্র কাবার তাওয়াফে যেহেতু পুরুষ-মহিলা একসাথে শামিল হন নামাজের ক্ষেত্রেও প্রতিটি দরজা দিয়ে ঢুকে সামনে পুরুষ, পেছনে মহিলা অথবা স্বজনদের সাথে পুরুষ মহিলা পাশাপাশি নামাজ আদায় করে থাকেন। তবে মহিলারা চাইলে পার্টিশানের আড়ালে অন্য মহিলার সাথে পর্দা করে নামাজ আদায় করতে পারেন। নামাজ শেষে নিজ নিজ মাহরামের সাথে পূর্বনির্ধারিত স্থানে মিলিত হবেন। বর্তমানে মোবাইলের যুগে এক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
রাসূলুল্লাহ সা: বলেন ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ করল, তাতে অশ্লীল ও গুনাহের কার্যাদি থেকে বেঁচে থাকল, সে হজ থেকে এমতাবস্থায় ফিরে আসে যেন আজই মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে। অর্থাৎ, জন্মের সময় শিশু যেরূপ নিষ্পাপ থাকে; সে-ও তদ্রুপ হয়ে যায়। (বুখারি, মুসলিম মাজহারি।)
পর্দা পালন মহিলাদের জন্য নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মতোই ফরজ। কাজেই মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আশায়, বিগত জীবনের গুনাহ মাফের চেষ্টায় হজে গিয়ে আল্লাহর খাস এলাকা মক্কা-মদিনায় যাতে পর্দা ভঙ্গ না হয় সেদিকে অবশ্যই লক্ষ রাখা উচিত।
ওমরা, তাওয়াফ, সা’ঈ : পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে আবশ্যকীয় ওমরা তাওয়াফ পালন ছাড়াও প্রত্যেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় বেশি বেশি তাওয়াফ ও ওমরা করার চেষ্টা করে থাকেন। এগুলো অবশ্যই নিজ নিজ মাহরামের সাথে পালন করা উচিত। ১০ জিলহজ হতে ১২ জিলহজ পর্যন্ত তিন দিন জামারায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করার জন্য কম ভিড়ে সুবিধাজনক সময়ে মাহরামের সাথে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। এ ছাড়া অন্য সময়ে মক্কা মদিনায় মসজিদে যাতায়াত, নামাজান্তে কাবাঘরের তাওয়াফ ইত্যাদি ইচ্ছা করলে কাফেলার সমমনা বোনদের সাথে দলবদ্ধভাবে করলে যেমন বেশি ইবাদতে মশগুল থাকা যায় তেমনি মাহরাম ভাইয়েরা ও নিজ নিজ মহিলারা চিন্তামুক্ত থাকতে পারেন।
হজে নিষিদ্ধ বিষয় : হজে পালনীয় বিষয়ের পাশাপাশি নিষিদ্ধ বিষয় সম্পর্কে প্রত্যেকের অবগত থাকা উচিত। কেননা পবিত্র কুরআনে সূরা বাকারায় হজে করণীয় বিষয়াদি বর্ণনার পাশাপাশি এহরাম অবস্থায় বর্জনীয় বা নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এ সূরায় ১৯৭ নম্বর আয়াতে হেদায়েত করা হয়েছে যে, হজের পবিত্র সময়ে ও পবিত্র স্থানগুলোকে প্রত্যেক হাজী সাহেব-সাহেবানদের নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করা উচিত। অধিকন্তু পবিত্র স্থানগুলোতে যেতে পারার সুবর্ণ সুযোগে আল্লাহর জিকর, এবাদত এবং সৎকাজে আত্মনিয়োগ করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ পাক আমাদের নেক আমল করার; বেশি বেশি দোয়া, ইস্তেগফার, ওমরা, তাওয়াফ ও অন্যের সেবা করার তাওফিক ও সুযোগ করে দিয়ে মাবরুর হজের সওয়ার অর্জনের সৌভাগ্য দান করুন।
লেখক : প্রবন্ধকার


আরো সংবাদ