২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

স্বামীর নামে নামকরণ শক্ত গুনাহ

-

মুসলিম নারীদের অনেকেই বিয়ের পরে নিজের নাম পরিবর্তন করে স্বামীর নামকে নিজের নামের অংশ বানিয়ে ফেলে। হাল জামানায় এটি একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। যেমন : একজন মেয়ের বাবার দেয়া নাম ফাতেমা। রফিক নামে একজনের সাথে বিয়ের পর তার নাম হয়ে যায় মিসেস রফিক বা ফাতেমা রফিক। ইসলামি শরিয়ার দৃষ্টিতে এটি ঠিক নয়। মুসলিম নারীদের উচিত বিয়ের পরও তার পৈতৃক নাম ঠিক রাখা। কারণ এটি তার একেবারেই নিজস্ব এখানে স্বামীর কোনো শেয়ার নেই। নামই তার বংশ পরিচয় বহন করে।
আমরা বিদেশী সংস্কৃতি বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বকে অনুসরণ করতে গিয়ে এমন অনেক বিষয় অনুকরণ করছি যেগুলোর বিষয়ে ইসলামি শরিয়ার কোনো ভিত্তি নেই বরং সেগুলো একান্তই তাদের চর্বিত বিষয়। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভিত্তি হলো পবিত্র কুরআন এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ সা:-এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদন। অনুরূপভাবে সাহাবি রা: ও তাবেয়িনদের কথা, কাজ ও মৌনসম্মতি যাকে শরিয়ার পরিভাষায় ‘সুন্নাহ’ বলা হয়। ইসলামি শরিয়ার এ দু’টি অন্যতম প্রধান উৎসের কোথাও এর অনুমোদন বা সমর্থন পাওয়া যায়নি। মহানবী সা: বা সাহাবিদের রা: জীবনাচারেও এর কোনো নজির নেই। যদি স্বামীর নামে পরিচিত হওয়া বা স্বামীর নাম নিজের নামের সাথে যুক্ত করা আভিজাত্য বা মর্যাদার ব্যাপার হতো তাহলে আমাদের প্রিয় নবী সা:-এর স্ত্রীগণ বা উম্মাহতুল মুমিনিনরাও তাদের নামের সাথে হজরত সা:-এর নাম যুক্ত করতেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাদের কেউই তা করেননি। বরং প্রত্যেকে নিজেদের পিতার নামেই পরিচিত ছিলেন যদিও তাদের কারো কারো পিতা কাফের ছিল। সুতরাং আমরা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এমন কোনো বিষয় অবলম্বন করতে পারি না যার অনুমোদন উত্তম যুগে ছিল না। হজরত আশেয়া সিদ্দিকা রা: বিয়ের পর তাঁর নাম পরিবর্তন করে আয়েশা মুহাম্মদ রাখেননি এবং তিনি তাঁর পিতা আবুবকর সিদ্দিক রা: পরিচয় অুণœ রেখেছেন।
বাবাকর্তৃক প্রদত্ত নাম ঠিক রাখার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ ওই নামটি ব্যক্তির বংশের পরিচায়ক। কুরআন বলছে : ‘তোমরা তাদেরকে তাদের বাবার নামে ডাক’। (আল-কুরআন) এই আয়াতটি যদিও পালকপুত্রদের তাদের প্রকৃত পিতার নামে ডাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যারা বর্তমানে তাদের লালন-পালন করছেন বা ভরণ-পোষণ জোগান দিচ্ছেন তারা তাদের পিতা নন। বরং যারা তাদের জন্ম দিয়েছেন তারাই তাদের পিতা। অনুরূপভাবে মেয়েরাও তাদের পিতার পরিচয়ে পরিচিত হবেন স্বামীর পরিচয়ে নন। তা ছাড়া পালক পুত্রকে প্রকৃত পিতার নামে ডাকার নির্দেশ প্রমাণ করে স্ত্রীদেরও তাদের পিতার নামে ডাকতে হবে।
হজরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের হজরত ইবন আব্বাস রা:-কে বলতে শুনেছেন যে, রাসূল সা: বলেছেন : ‘যে কেহ নিজেকে বাবার নাম ছাড়া অন্য নামে ডাকবে তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানুষের লানত বর্ষিত হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ) ইমাম বুখারিও রা: সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
হজরত সাদ, হজরত আবু বাকরা রা: থেকে বর্ণিত, তারা প্রত্যেকে বলেছেন : ‘আমার দু’কান শুনেছে এবং আমার অন্তর মুহাম্মদ সাা:-এর এ কথা সংরক্ষণ করেছে’, মহানবী সা: বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে নিজেকে নিজের পিতা ছাড়া অন্যের সাথে সংযুক্ত করে তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে’। (ইবনে মাজাহ)
হজরত আবদুল্লাহ ইবন আমর রা: থেকে বর্ণিত, তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি সা: বলেছেন, ‘যে কেউ নিজের বাবা ছাড়া অন্যের পরিচয়ে পরিচয় দেয় সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না, যদিও জান্নাতের সুঘ্রাণ ৭০ বছর হাঁটার রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)
এমন অনেক হাদিস রয়েছে যেখানে মহানবী সা: নারীদের তাদের পিতার নামে ডেকেছেন। যখন পবিত্র কুরআনের আয়াত ‘আপনি আপনার নিকটতম আত্মীয়দের সতর্ক করে দিন’। (আল-কুরআন : ২১৪) নাজিল হয় তখন মহানবী সা: তাঁর আত্মীয়দের প্রত্যেককে ডেকে ডেকে বলেছিলেন : ‘হে অমুকের ছেলে অমুক! আমি পরকালে তোমার কোনো উপকার করতে পারব না। হে অমুকের মেয়ে অমুক! আমি কিয়ামতের দিন তোমাদের কোনো কাজে আসব না।’ (আল-কাশফুল মুবদি) কিয়ামতের মাঠেও প্রত্যেককে তার বাবার নাম ধরে ডাকা হবে। হাদিসের কিতাবগুলোয় এ সংক্রান্ত অনেক হাদিস রয়েছে।
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রা:-এর শাসনামলের একটি বিখ্যাত ঘটনা হাদিসের বর্ণনায় এসেছে। তা হলো তিনি এক রাতে যখন প্রজাদের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য বের হলেন তখন একজন মহিলার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যিনি স্বামীর বিরহে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছিলেন। তিনি পরদিন সকালে মহিলাটির খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য লোক পাঠালেন। তাঁকে বলা হলো এ মহিলা হলেন অমুকের মেয়ে অমুক। তার স্বামী আল্লাহ রাস্তায় জেহাদে রয়েছেন। (সুনানে সাঈদ ইবনে মানসুর) এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো, মহিলাটি বিবাহিত হলেও তার পরিচয়ের ক্ষেত্রে বলা হলো অমুকের মেয়ে অমুক; একথা বলা হলো না যে, অমুতের স্ত্রী অমুক।
আরো যে সব কারণে নারীদের বাবার নামে পরিচিত হওয়া উচিত নয় তা হলো : ০১. স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কোনো রক্ত সম্পর্ক থাকে না। কিন্তু বাবা মেয়ের রক্ত সম্পর্ক চিরদিনের। ০২. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে মনোমালিন্য হলে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। তখন এই নাম থাকে না। ০৩. স্বামী মারা গেল স্ত্রী অন্য পুরুষকে বিয়ে করতে পারে। তখন এই নামের কী দশা হবে তা সহজেই অনুমেয়। ০৪. স্বামী তো বিয়ের পর নিজের নাম পরিবর্তন করে না, তাহলে নারী কেন করবে? এটি কি নারী অধিকারের লঙ্ঘন নয়? আলোচ্য প্রবন্ধে নতুন একটি বিষয়কে অত্যন্ত ুদ্র পরিসরে আলোচনা করা হলো। মুসলিম সমাজের উচিত ইসলামকে পুরোপুরি অনুসরণ করা। আর যারা পরিপূর্ণ মানতে চায় তাদের উচিত এসব বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকা। যাতে করে কোনো অজুহাতেই অভিশপ্ত শয়তান কোনোভাবেই আমাদের সত্য ও সঠিক পথ ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।
লেখক : অধ্যাপক, ঢাবি


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme