১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

হজ করার উত্তম সময় যৌবনকাল

-

আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান, মানসিকভাবে সুস্থ এমন প্রত্যেক মুসলমান নরনারীর ওপর অন্তত জীবনে একবার হজ করা ফরজ। যেকোনো মুসলিমের ওপর হজ ফরজ হওয়ার ব্যাপারে আর্থিক যোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্ববহ। শারীরিক যোগ্যতাকেও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। কোনো মুসলমান আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও যদি সে শারীরিকভাবে অক্ষম বা দুর্বল হয় তবে তার ওপরও হজের হুকুম শিথিলযোগ্য। আবার মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ওপরও হজ ফরজ হওয়ার বিষয়ে ছাড় রয়েছে। কাজেই হজ ফরজ হওয়ার শর্তগুলোকে অতি যতেœর সাথে মূল্যায়ন করে তা বিবেচনায় নিয়ে আসা জরুরি। কেননা হজের এমন কিছু আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে, যা আর্থিক, মানসিক ও শারীরিক বা কায়িক শক্তির সাথে সম্পৃক্ত।
হজ ফরজ করার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মানুষের পক্ষ থেকে যারা এই ঘরে (কাবাঘর) পৌঁছার সামর্থ্য রাখে তারা যেন হজ সম্পন্ন করে, তাদের ওপর এটি আল্লাহর হক। আর যে ব্যক্তি এ নির্দেশ মেনে চলতে অস্বীকার করবে তার জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ বিশ্ববাসীর প্রতি মুখাপেক্ষী নন।’ (সূরা আলে ইমরান : ৯৭)। পবিত্র কুরআনের নির্দেশ মতেÑ আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান ব্যক্তি হজ করার ব্যাপারে শৈথিল্য দেখাতে পারে না।
একজন মানুষ কঠোর পরিশ্রমে যৌবনে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে হজের নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে যেতে পারেন; কিন্তু বার্ধক্যে সে তার অর্জিত সম্পদ যে হারিয়ে ফেলবেন না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ হজের নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার যোগ্যতা বা সামর্থ্য সব সময় একই রকম থাকে না। আবার শারীরিকভাবেও একজন মানুষ সব সময় একই রকম সুস্থ থাকতে পারে না। যেকোনো সময় দুর্ঘটনায় পড়ে বা অসুখবিসুখে হজ করার মতো শারীরিক যোগ্যতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। কাজেই যোগ্যতা অর্জন করার সাথে সাথে হজ করা না হলে সে জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুসলিমদের তুলনায় বাংলাদেশের মুসলিমগণ অপেক্ষাকৃত বৃদ্ধ বয়সে হজ সম্পাদন করে থাকেন। সব ধরনের যোগ্যতা অনেক আগেই অর্জন করার পরও যখন দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে, পিঠ কুঁজো হয়ে শরীর নুয়ে পড়ে, হাঁটুতে যখন পর্যাপ্ত বল থাকে না, তখন দায়মুক্তির হজ করার জন্য এ দেশের বেশির ভাগ মুসলিম মনস্থির করেন। অথচ আল্লাহর রাসূল (সা:) ঘোষণা করেছেনÑ ‘যৌবন বয়সের ইবাদত আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বহু মানুষকে দেখা যায় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নামাজ ধরেন, কুরআন পড়া শেখার চেষ্টা করেন, মুখে দাড়ি রাখেন, তারপর হজ করেন। এ রকম করা যেন এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। একটা জিনিস খেয়াল করলে দেখা যায়, সব মানুষই জীবনে যতটুকু অন্যায়, অবিচার, জুলম, নির্যাতন, খুন, জখম, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, যেনা, ব্যভিচার যা করেছেন; তা যুবক বয়সেই করেছেন। সাধারণত বৃদ্ধ বয়সে মানুষ এসব অন্যায় অপকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। মানুষ যাতে অসামাজিক কাজে নিজেকে নিমজ্জিত রাখতে না পারে সে জন্যই আল্লাহ পাক যুবক বয়সে ইবাদত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। অথচ মানুষ সব ধরনের কুকর্ম করা শেষ করে শেষ বয়সে এসে সেসব কৃত অপকর্ম থেকে মুক্তি লাভের প্রত্যাশায় ইবাদতে মনোনিবেশ করে। যেন উল্টোপথে চলছে এ দেশের মুসলিম সমাজ।
হজ এমন একটি ইবাদত যা পূর্ণ করার জন্য আর্থিক সামর্থ্য ও শারীরিক সামর্থ্য দুটোই একসাথে দরকার হয়। আর এ দুটো সামর্থ্যই প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ তার যুবক বয়সেই অর্জন করার যোগ্যতা রাখে। বেশির ভাগ মানুষই তরুণ বয়সে অর্থ উপার্জন করে থাকে। অতএব তরুণ বয়সেই হজ করা উত্তম। প্রথম যে ব্যক্তি তরুণ বয়সে কাবাঘর তাওয়াফ করেছিলেন, তিনি হজরত আদম (আ:)। হজরত ইব্রাহিম (আ:) তিনিও তরুণ বয়সে কাবা প্রদক্ষিণ করেছিলেন। তরুণ বয়সের হাজি ছিলেন হজরত ইসমাইল (আ:)। এক সন্তানের জননী ইসমাইল মাতা হজরত হাজেরা সাফা-মারওয়া দৌড়ে হজ সম্পাদন করেছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার আগেই কাবা তাওয়াফ করেছিলেন।
বাংলাদেশের মুসলিম তরুণেরা আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হলেই কেউ কেউ বউবাচ্চা নিয়ে ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন শহরে ঘুরতে যান। অনেক যুবকই বিয়ের পর বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করে এসব জায়গায় হানিমুনে বের হন আর বৃদ্ধ বয়সে হজ করে পাপমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ তারা তরুণ বয়সে হজ করে নিজের জীবনটাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পারেন অতি সহজেই। বিয়ের পর হানিমুনের ধারণাটা এসেছে পশ্চিমা জগৎ থেকে। হজ করার মতো তাদের (পশ্চিমাদের) কোনো সুযোগ (অপশন) নেই বলেই তারা ওসব হানিমুন-টানিমুন করে। মুসলিমদের মতো হজের বিধান থাকলে হয়তো তারাও বিয়ের পর হানিমুনের বদলে নিশ্চয় হজই করত। বাংলাদেশের মুসলিম তরুণেরা এমন একটি চেতনা লালন করেন যে, মুখে দাড়ি রাখলে বা অল্প বয়সে হজ করলে ছোটখাটো ইসলাম পরিপন্থী কাজগুলো আর করা যাবে না। অর্থাৎ জীবনকে উপভোগ না করেই মুরব্বি বনে যাওয়াÑ এমন সব উদ্ভব টাইপের ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েই তারা তরুণ বয়সে মুখে দাড়ি রাখতে বা হজ করতে নারাজ। এতে বোঝা যায়, তরুণেরা ইসলাম পরিপন্থী কাজ করতেও রাজি; তবু অল্প বয়সে হজ করতে রাজি নন।
মুসলিম সমাজে এমন ব্যক্তিও আছেন, যারা ভাবেন এ বছর নয়; আগামী বছর হজ করবেন। এ রকম করতে করতে অনেক বছর কেটে যায়। একসময় ছেলেমেয়েরা বিয়ের উপযুক্ত হয়ে ওঠে। তখন ভাবেন, ছেলেমেয়ের বিয়ে সমাপ্ত করেই আল্লাহ বাঁচালে হজে যাবেন। এ সময়টা যখন আসে তখন তিনি বৃদ্ধ। আর বৃদ্ধ হাজীরা কী হজ করেন তা তাদের জিজ্ঞেস করলেই বুঝতে পারা যায়।
হজ একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত। হজের আনুষ্ঠানিকতাগুলো মানুষের শারীরিক শক্তির সাথে সম্পৃক্ত। সাফা থেকে মারওয়া আবার মারওয়া থেকে সাফা পাহাড় দৌড়ানো। কাবাঘর সাতবার প্রদক্ষিণ করা। সাতবার করে ২১টি পাথর নিক্ষেপ করা। নিজের কোরবানি নিজে জবাই করা। মিনা মুজদালিফা হয়ে আরাফাতের মাঠে হেঁটে যাওয়া আবার আসা। হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর চুম্বন করা। ওজু-গোসলসহ নিজের কাজ নিজে করা। লাখ লাখ মানুষের ভিড়ের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে প্রচণ্ড রোদে এসব কাজ সম্পাদন করা খুবই কষ্টসাধ্য এবং শ্রমসাধ্য ব্যাপার। যে বয়সে ওজুর পানিটুকু নিজের বাড়িতে নাতি-নাতনির কাছে চেয়ে নিতে হয়, সে বয়সে হজে গিয়ে এসব কাজ করা সত্যিই খুবই কষ্টের কারণ হয়ে যায়। তা ছাড়া হজের মাধ্যমে যে ইসলামের ইতিহাস সরেজমিন প্রত্যক্ষ করা যায়, বৃদ্ধ বয়সে এসে সেটাও সেভাবে জানা-বোঝা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
হজ গমনে বিত্তবান তরুণদের উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে দায়িত্বশীল মুসলিম স্কলারদের জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এ বিষয়ে সরকারকেও দায়িত্ব নিতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ সবাই মিলে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি, যাতে তরুণ বয়সে হজ করা একটা আন্দোলনে রূপ নেয়। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে তরুণদের জন্য হজের বিশেষ প্যাকেজের ব্যবস্থা করা হয়। এ দেশেও তা করা যেতে পারে। দেশে যত তরুণ হাজী তৈরি হবে, সমাজ থেকে তত অপরাধপ্রবণতা হ্রাস পেতে থাকবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : গবেষক


আরো সংবাদ