১৫ নভেম্বর ২০১৮

শয্যা গ্রহণের নীতিমালা

-

যেভাবে ইসলাম ঈমানদারদের দিন অতিবাহিত করার নিয়ম শিক্ষা দিয়েছে, অনুরূপভাবে রাত্রিযাপনেরও আদব-শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছে। রাত আল্লাহর সৃষ্ট নির্দশন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি দিন এবং রাতকে নির্দশনস্বরূপ সৃষ্টি করেছি’। (সূরা বনি ইসরাইল-১২)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তিনি রাতকে মানুষের প্রশান্তির উপায় হিসেবে সৃষ্টি করেছেন’। (সূরা আনআম : ৯৬)
শোয়ার জায়গায় সর্তকতা : একাকী ঘরে রাত যাপনে হাদিসে নিষেধ রয়েছে। ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা:) কোনো ঘরে একাকী রাত যাপন ও একাকী সফর নিষেধ করেছেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৫৬৫০)
অনুরূপভাবে ছাদে ঘুমাবেন না। নবী করিম (সা:) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি বেষ্টনীবিহীন ছাদে রাতে ঘুমাল (কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে) তার সম্পর্কে (আল্লাহর) কোনো জিম্মাদারি নেই। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৪১)
পবিত্রতা অর্জন : রাতে পরিষ্কার-পরিছন্ন ও পবিত্র হয়ে শোয়া সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন, ‘যদি কোনো মুসলমান রাতে আল্লাহকে স্মরণ করে অজু শেষে শয়ন করে এবং রাতে জাগ্রত হয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো কল্যাণ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, আল্লাহ তায়ালা তা দান করেন’। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৪২)
তাই ঘুমানোর আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নেবেন, যাতে খাবারের কোনো কিছু লেগে না থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘শয়তান ঘ্রাণ নিতে খুবই দক্ষ ও লোভী। তোমরা নিজের ব্যাপারে শয়তান থেকে সতর্ক হও। কোনো ব্যক্তি খাদ্যের চর্বি ইত্যাদির ঘ্রাণ হাত থেকে দূর করে রাত যাপন করলে এবং এতে তার কোনো ক্ষতি হলে সে এ জন্য নিজেকেই যেন তিরস্কার করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৮৫৯)
শয্যা গ্রহণের কিছু আদব : শয্যা গ্রহণের আগে বিছানা ঝেড়ে নেয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন, ‘যদি তোমাদের কেউ শয্যায় যায়, তখন সে যেন তার লুঙ্গি দ্বারা বিছানাটা ঝেড়ে নেয়। কারণ সে জানে না যে বিছানার ওপর তার অনুপস্থিতিতে পীড়াদায়ক কোনো কিছু আছে কি না। তারপর এ দোয়া পড়বে ‘হে আমার রব, আপনারই নামে শরীরটা বিছানায় রাখলাম এবং আপনারই নামে আবার উঠব। (বুখারি, হাদিস : ৬৩২০)
শয়নকালে দোয়া পড়া সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন, ‘যে ব্যক্তি শয়নের পর আল্লাহ পাকের নাম নেয় না, তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বঞ্চনা নেমে আসবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৫৬)
আয়েশা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) প্রতি রাতে যখন বিছানায় যেতেন, তখন দুই হাত একত্রিত করে তাতে সূরা এখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁ দিতেন। অতঃপর তা মাথা ও চেহারা থেকে শুরু করে যতদূর সম্ভব দেহে দুই হাত বুলাতেন। (বুখারি, হাদিস : ৫০১৭)
সাহাবায়ে কেরামের কেউ কখনো অনিদ্রার রোগে আক্রান্ত হননি। কারণ তারা রাসূলের সুন্নত মেনে চলতেন। রাসূল (সা:)-এর সুন্নত চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বর্তমানকালে মানুষের অনিদ্রা দূর করার জন্য এই সুন্নত খুবই উপকারী। রাসূল (সা:) ডান কাত ও কেবলামুখী হয়ে শয়ন করতেন। বাম দিকে মানুষের পাকস্থলি ও হৃদপিণ্ড থাকে। বাম দিকে কাত হয়ে শয়ন করলে পাকস্থলি ও হৃদপিণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে রক্ত চলাচল ও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘুম সম্পর্কে বোম্বে হাসপাতালের (বোম্বাই অডিটোরিয়াম) ডাক্তার কৃষ্ণ লালা মার্মা গবেষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, যেসব রোগীকে ডান দিকে কাত করে শয়ন করা হয়েছে, তারা দ্রুত আরোগ্য লাভ করেছে। পক্ষান্তরে যেসব রোগীকে বাম কাত হয়ে শয়ন করানো হয়েছে তারা অস্থিরতার সম্মুখীন হয়েছে। আধুনিক গবেষণায়ও প্রমাণিত হয়েছে, ডান দিকে ফিরে শয়ন করা হলে হৃদরোগের জন্য উপকারী। বাম দিকে যেহেতু হৃদপিণ্ড থাকে এ কারণে বাম দিকে কাত হয়ে ঘুমালে ঘুম অত্যন্ত গভীর হয়। মানুষ সহজে ঘুম থেকে জাগ্রত হতে পারে না। পক্ষান্তরে ডান দিকে কাত হয়ে ঘুমালে ঘুম অতটা গভীর হয় না। ফলে সহজে মানুষ ঘুম থেকে জাগ্রত হতে পারে। তাতে ফজরের নামাজের সময় সহজে ঘুম ভেঙে যায়। রাসূল (সা:) সফরকালীন সময় ডান দিকে কাত হয়ে ডান হাত খাড়া করে বাহুর উপর মাথা রেখে ঘুমাতেন। এতে ঘুম গভীর হতো না, ফলে ফজরের নামাজ কাজা হতো না। এভাবে রাসূলে করিম (সা:) জীবন যাপন করেছেন।
লেখক : নিবন্ধকার


আরো সংবাদ