২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আল্লাহর পথে চলতে হবে নির্ভীকভাবে

-

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা: বলেছেন, ‘জুলুম আর অত্যাচার কিয়ামতের দিন অন্ধকারে পরিণত হবে।’ (মুসলিম, বুখারি ও তিরমিজি) তিনি আরো বলেছেন, ‘সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বুখারি শরিফ) বুখারি শরিফের আরো একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যাকে আল্লাহ তায়ালা জাতির নেতৃত্ব দান করেছেন, সে যদি তাদেরকে উপদেশ দিয়ে সঠিকভাবে পরিচালিত না করে, তবে তার জন্য আল্লাহ তায়ালা জান্নাত হারাম করে দেবেন।’
সূরা আলে-ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতে মহান রাব্বুল আল-আমিন সংগঠন এবং সংগঠকদের সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কোনো একদল অবশ্যই থাকতে হবে, যারা মানুষকে কল্যাণ ও মঙ্গলের পথের দিকে ডাকবে, ন্যায় ও সৎ কাজের নির্দেশ দেবে, আর পাপ ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে। আর যারা এ কাজ করবে, তারাই সাফল্য অর্জন করবে।’ অপর এক আয়াতে মহান রাব্বুল আল-আমিন বলেছেন, ‘তোমরা সর্বোত্তম উম্মাহ। তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে মানবজাতির পথ প্রদর্শন ও সংশোধনের উদ্দেশ্যে। তোমরা মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের আদেশ দেবে, আর অন্যায়-অপরাধ থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর প্রতি থাকবে অবিচল ও আস্থাশীল।’ (সূরা আলে-ইমরান : ১১০) শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর অনুসারী আল্লাহর বান্দার একমাত্র কর্ম হলো মহান আল্লাহ পাকের পবিত্র কুরআন এবং তাঁর প্রিয় রাসূলের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা। প্রতিটি মুসলমানের উচিত এবং কর্তব্য হলো, পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ অনুযায়ী পথ চলা...। এ ব্যাপারে মিশকাত শরিফের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘কুরআনকে আঁকড়ে ধরো। তাহলে কখনো বিপথগামী হবে না।’ সদা সত্য কথা বলার জন্য আল্লাহর নবী ইরশাদ করেন, ‘সত্য কথা বলো, যদিও তা তিক্ত।’ (ইবনে হিব্বান) হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণ জমিতেও জুলুম করল (জোর দখল) কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার গলায় সাত তবক জমিন পরিয়ে দেবেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)
প্রতিটি মুসলমান নর-নারী, ধনী-গরিব, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী, আমলা-কর্মচারী বা যেকোনো ব্যক্তিই হোক না কেন, তাকে থাকতে হবে একমাত্র আল্লাহ পাকের প্রতি বিশ্বস্ত। এ নশ্বর দুনিয়ার প্রতি সব লোভ-লালসা সংবরণ করতে হবে এবং প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ মেনে চলতে হবে। যে বান্দা একমাত্র রাব্বুল আল-আমিনের প্রতি বিশ্বাস রেখে চলে, তার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালাই জামিনদার হয়ে যান। সূরা আত তালাকের ২-৩ নম্বর আয়াতে মহান সৃষ্টিকর্তা ইরশাদ করেন, ‘যারা আল্লাহ তায়ালা ও শেষ বিচার দিনের ওপর ঈমান আনে, তাদের সবাইকে এর দ্বারা উপদেশ দেয়া হচ্ছে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করে, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য একটা পথ তৈরি করে দেন এবং তিনি তাকে এমন রিজিক দান করেন, যার উৎস সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালাই যথেষ্ট। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের কাজটি পূর্ণ করেই নেন; আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি জিনিসের জন্যই পরিমাণ ঠিক করে রেখেছেন।’
অসৎ লোকদের বিরুদ্ধে সাহস করে দাঁড়ানো লোকের খুবই অভাব। অথচ রাব্বুল আল-আমিন এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একদল লোক থাকতেই হবে, যারা মানুষকে মঙ্গলের দিকে আহ্বান করবে, ন্যায় ও সৎ কাজের নির্দেশ দেবে। আর পাপ-অন্যায় কাজে বাধা দেবে। যারা এ কাজ করবে, তারাই স্বার্থকতা লাভ করবে।’
মানুষ মাত্র দু’দিনের জন্য আরাম-আয়েশ বা সুখ-শান্তির জন্য মহান রাব্বুল আল-আমিনের আদেশ-নির্দেশ ভুলে গিয়ে বা অমান্য করে দুনিয়াদারির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহপাক সূরা নিসার ১৪ ও ৬৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘আম্বিয়া ও রাসূলগণকে প্রেরণ করার পর মহান আল্লাহ তায়ালা বান্দার ওপর তাদের অনুকরণ ও আনুগত্যবোধ ওয়াজিব করেছেন। যদি কেউ তাদেরকে অমান্য করে অথবা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে, তবে তার জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর শাস্তি।’ বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা: বিশ্ববাসীর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সূরা আহজাবের ৪৬-৪৭ আয়াত প্রযোজ্য। এতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, ‘আমি তো আপনাকে পাঠিয়েছি সাীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে। আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারী রূপে ও উজ্জ্বল প্রদীপ রূপে।’ রাসূল সা: সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সূরা আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।’
যারা রাজনীতি, সমাজনীতি, সামরিকনীতি বা যে পেশারই হোক না কেন, তার উচিত বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:কে অনুসরণ, অনুকরণ এবং আনুগত্য প্রদর্শন করা। তাঁর মধ্যে আছে সর্বগুণ এবং যারা তাঁকে ফলোআপ করবে তারাই তো হতে পারবে পূতপবিত্র একজন খাঁটি মানুষ। আর যিনিই একজন ভালো মানুষ হতে পারবে, তিনিই তো আল্লাহর একজন খাঁটি বান্দা। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ১৪ ও ৬৪ নম্বর আয়াত আরেকবার উল্লেখ করা হলো। এ আয়াতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, ‘আম্বিয়া ও রাসূলগণকে প্রেরণ করার পর আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার ওপর তাদের অনুসরণ, অনুকরণ ও আনুগত্য ওয়াজিব করেছেন। যদি কেউ তাদেরকে অমান্য করে অথবা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে, তবে তার জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর শাস্তি।’
আজ দায়িত্বশীলগণ এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা বেশির ভাগই ভোগবিলাসের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। তাদের আচরণে মনে হয়, তারা যেন মহান আল্লাহকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে শুধু ভোগবিলাসে মত্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। এ দুনিয়াটা যে ণস্থায়ী এবং যেকোনো সময় মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নিতে হবে, তা যেন তারা মনেই করছে না। ভোগবিলাস সম্পর্কে মিশকাত শরিফের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘হজরত মু’আজ ইবনে জাবাল রা: থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলুল্লাহ সা: তাকে ইয়েমেনে গভর্নর নিয়োগ করে পাঠানোর সময় বলেন, ‘হে মু’আজ! ভোগ-বিলাসিতা থেকে অবশ্যই বিরত থাকবে। কেননা আল্লাহর বান্দাগণ বিলাসিতায় নিমজ্জিত হয় না।’
নেতাদের সম্পর্কের বিষয়ে এ হাদিসে অনেক শিণীয় বিষয় রয়েছে। যদি তারা আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মদ সা:কে নবী হিসেবে বিশ্বাস করেন। হজরত সাকিল ইবনে ইয়াসার রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘আমি রাসূল সা:কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল হওয়ার পর তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)
হজরত সাকিল ইবনে ইয়াসার রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, ‘আমি রাসূল সা:কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সে তাদের জন্য কিছু করেনি। সে শুধু নিজের কল্যাণের জন্য যেভাবে চেষ্টা চালায়; অপরের কল্যাণার্থে তা কখনো করেনি, সে ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের উপুড় করে জাহান্নামের ভেতরে নিপে করবেন।’ হজরত ইবনে আব্বাস রা:-এর এক বর্ণনায় রয়েছে, ‘সে তাদের হিফাজতের দায়িত্ব এমনভাবে পালন করেনি, যেমন নিজের ও নিজ পরিজনের জন্য করেছে।’ (তিবরানি ও কিতাবুল খারাজ)
রাষ্ট্রের মধ্যে দায়িত্বরত তাদের উদ্দেশ্যে একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে শাসক তাদের প্রজাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে, সে জাহান্নামে যাবে।’ (তাবরানি) এ সম্পর্কে রাব্বুল আল-আমিন সূরা শু’আরার ২২৭ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘জালিমরা শিগগিরই জানবে ওদের গন্তব্যস্থল কোথায়।’
রাসূলল্লাহ্ সা: বলেছেন, ‘জুলুম বা অত্যাচার কিয়ামতের দিন অন্ধকারে পরিণত হবে।’ (বুখারি, মুসলিম ও তিরমিজি) বুখারি শরিফের আরো একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ নবী করিম সা: আরো বলেন, ‘যাকে আল্লাহ পাক জাতির নেতৃত্ব দান করেছেন, সে যদি তাদেরকে উপদেশ দিয়ে সঠিকভাবে পরিচালিত না করে, তবে তার জন্য আল্লাহ তায়ালা জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (বুখারি শরিফ)
দেশ পরিচালনাসহ সর্বেেত্র আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করতে হবে। তা না হলে কঠিন আজাবের সম্মুখীন হতে হবে। সূরা মায়িদার ৪৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক রাব্বুল আল-আমিন বলেন, ‘যারা আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না, তারা কাফির।’
লেখক : প্রবন্ধকার


আরো সংবাদ