১১ ডিসেম্বর ২০১৯

বিশ্বে নারী আবিষ্কারকদের সংখ্যা কম কেন?

-

প্রতিদিনের জীবনে ব্যবহৃত কিছু পণ্য যা নারীরা আবিষ্কার করেছে এবং তাদের নামেই পেটেন্ট রয়েছে, সেগুলোকে খুব সহজেই তালিকাবদ্ধ করা যায়। যেমন বাসনপত্র পরিষ্কারক বা ডিসওয়াশার, গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন ওয়াইপার, বোর্ড গেম মনোপলির মতো কয়েকটি জিনিস মাত্র। কিন্তু এক প্রতিবেদন বলছে, বিশ্ব নারীদের আবিষ্কারক চিন্তার পুরোপুরি এখনো ব্যবহার করতে পারছে না।

যুক্তরাজ্যের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি বিষয়ক দফতর (আইপিও) এর এক গবেষণা বলছে, সারা বিশ্বে পেটেন্ট আবেদনের মাত্র ১৩% আসে নারীদের কাছ থেকে। কিন্তু এক সময়, প্রতি সাতজন আবিষ্কারকের মধ্যে একজনই ছিলেন নারী। এবং যদিও এখন পেটেন্ট আবেদনে নারীদের হার বাড়ছে তবুও এই বিষয়ে লিঙ্গ সমতা আনা ২০৭০ সালের আগে সম্ভব নয়।

তাহলে আবিষ্কারের দুনিয়ায় নারীদের সংখ্যা এতো কম কেন?
গবেষকরা বলছেন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিতে যা একত্রে সংক্ষেপে স্টেম নামে পরিচিত তাতে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরণের ফাঁক থাকাটাই এর জন্য দায়ী। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বিষয়ক আইনি প্রতিষ্ঠান পাওয়েল অ্যান্ড গিলবার্টের অংশীদার পেনি গিলবার্টের মতে, এটা একটি পাইপলাইন ইস্যু মাত্র।

"আমরা যদি নারীদের পেটেন্ট আবেদন বাড়াতে দেখতে চাই, তাহলে আরো বেশি নারীকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্টেম বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশুনা করতে হবে এবং তাদেরকে গবেষণাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে," তিনি বলেন।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের স্টেম শিল্পের কর্মীদের মধ্যে মাত্র এক তৃতীয়াংশ নারী। এছাড়া মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খুব কম সংখ্যক মেয়ে এবং নারীরা এ ধরণের বিষয়ে পড়াশুনা করে। যদিও এই বৈষম্য দূর করে ভারসাম্যের চেষ্টা করা হচ্ছে।

স্টেমের দুই-তৃতীয়াংশ এখনো পুরুষ
সাধারণত কোনো কিছুর আবিষ্কারককেই সেই পণ্যের পেটেন্ট দেয়া হয়। যা ওই পণ্যের আবিষ্কারক বা মালিকদের তাদের পণ্য অন্যদের ব্যবহার করতে দেয়ার বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ দেয়।

একটি "আবিষ্কার" এর পেটেন্ট পাওয়ার যোগ্য হতে হলে, নতুন একটি ব্যবহারযোগ্য চিন্তা থাকতে হবে- যা ওই ক্ষেত্রে একজন দক্ষ মানুষের জানা থাকবে না।

কোনো একক ব্যক্তি বা আবিষ্কারকের একটি দল এই আবেদন করতে পারবে।

আবিষ্কারকদের মধ্যে লিঙ্গ সমতার পার্থক্য আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন নারীদের আবিষ্কারের বিষয়টি একটি পুরুষ-শাসিত দলে একমাত্র সদস্য হিসেবে কোনো নারী থাকে।

পেটেন্টের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশই পুরুষদের দল কিংবা কোনো একক পুরুষ আবিষ্কারকের দখলে। আর সেখানে মাত্র ৬% একক নারী আবিষ্কারক থাকেন।

আবিষ্কারক কোনো দলের সব সদস্য নারী-এমনটা দেখা যায় না বললেই চলে। আইপিওর মতে, নারীদের দলের আবিষ্কারক হিসেবে পেটেন্টের জন্য আবেদন করার হার মাত্র ০.৩%।

তবে পেটেন্টের জন্য আবেদন করলেই যে নারীরা পেটেন্টের অনুমোদন পায় তা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা পেটেন্ট আবেদন নিয়ে চালানো এক গবেষণা বলেন, কোনো আবেদনে নারীর নাম থাকলে পেটেন্টের অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে তার সম্ভাবনা কম থাকে। এবং অবশ্যই, আবিষ্কারের সাথে জড়িত সবাইকে তো আর পেটেন্ট দেয়া হয় না।

বিশ্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বিষয়ক একটি সংস্থার আগের পরিচালিত একটি গবেষণা বলছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, নিজেদের গবেষণার জন্য পেটেন্টের অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের সম্ভাবনা পুরুষের তুলনায় অর্ধেক কম।

এতে বলা হয়, নারীরা পুরুষের মতো তার পণ্যকে বাণিজ্যিক করার বিষয়ে তেমন আগ্রহী নয়।

বায়োটেক বা জৈবপ্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে বেশি লিঙ্গ সমতা রয়েছে

১৯৯১ সালে, আন সুকামোতো স্টেম সেলগুলো আলাদা করার একটি উপায় তৈরি করেন। তার উদ্ভাবনের মাধ্যমে ক্যান্সারের রোগীদের রক্ত-ব্যবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়ন ঘটেছিল এবং এটি রোগের প্রতিকার খুঁজে বের করাটাকে সম্ভব করতে যাচ্ছিল।

ডাঃ সুকামোতো, যিনি বর্তমানে স্টেম সেল বৃদ্ধির বিষয়ে আরো গবেষণা করছেন, এটি ছাড়াও তিনি আরো সাতটি আবিষ্কারের সহ-পেটেন্টি ছিলেন।

জৈবপ্রযুক্তি, ওষুধ এবং খাবারের মতো দরকারি পণ্য তৈরিতে জীবিত প্রাণীর ব্যবহারের গবেষণার খাতটিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী আবিষ্কারক জড়িত। প্রায় ৫৩% জৈব প্রযুক্তি সম্পর্কিত পেটেন্টগুলোতে কমপক্ষে একজন নারী উদ্ভাবক রয়েছেন।

দ্বিতীয় স্থানে, ফার্মাসিউটিক্যাল সম্পর্কিত পেটেন্টগুলোর ৫২% এর মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী উদ্ভাবক রয়েছে।

এই তালিকার সবচেয়ে নিচে ছিল বৈদ্যুতিক প্রকৌশল বিষয়টি। প্রতি ১০টি পেটেন্ট আবেদনের মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী আবিষ্কারক ছিল।

২০৭০ সাল নাগাদ সমতা
গত ২০ বছরে নারী আবিষ্কারকদের পেটেন্ট গ্রহণের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। আইপিও বলছে, ১৯৯৮ সালে এই হার ৬.৮% থেকে বেড়ে ২০১৭ সালে এই হার দাঁড়ায় ১২.৭% এ।

একই সময়ের মধ্যে, কোনো পেটেন্ট আবেদন যাতে কমপক্ষে একজন নারী আবিষ্কারক রয়েছেন, এমন আবেদনের সংখ্যা ১২% থেকে বেড়ে ২১% হয়।

গিলবার্ট বলেন, নারীদের শিক্ষাগত এবং পেশাগত পছন্দ নিয়ে যে সাধারণীকরণ প্রচলিত আছে তা দূর করতে হলে নারীদের স্টেম বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশুনা করতে উৎসাহিত করতে হবে। এ বিষয়ে নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে এবং নারী রোল মডেল তৈরি হলে তার যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে।

"আমাদের এই বিষয়টির প্রশংসা করতে হবে যে, ইতিহাসে মহান কিছু বিজ্ঞানী এবং আবিষ্কারক নারী ছিলেন-ম্যারি কুরি এবং রোলিন্দ ফ্রাঙ্কলিন থেকে শুরু করে গ্রেস হপার যিনি প্রোগ্রামিং আবিষ্কার করেছিলেন তিনি এবং কেবলারের আবিষ্কারক স্টিফানি কোলেকের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য," তিনি বলেন।

"আমাদের উচিত তাদের গল্পগুলো সামনে নিয়ে আসা।"

তালিকার শীর্ষে রাশিয়া
১৯৯৮ সালে যেখানে ৮% ছিল তা থেকে ২০১৭ সালে ১১% এ এসে ঠেকেছে এবং যদিও যুক্তরাজ্যে নারী আবিষ্কারকের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু অনেক দেশই আসলে এদিক থেকে যুক্তরাজ্যের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।

গত ২০ বছর ধরে জমা পড়া পেটেন্ট আবেদনগুলোর মধ্যে ১৭% আবেদনে কমপক্ষে একজন নারী থাকায় এই তালিকায় সবার থেকে এগিয়ে রয়েছে রাশিয়া। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি নারী আবিষ্কারক রয়েছেন। এই তালিকার ১০টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান রয়েছে ফ্রান্স।

এর ঠিক বিপরীতে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতি ২০টি পেটেন্ট আবেদনের মধ্যে একটিরও কম আবেদনে নারী আবিষ্কারক জড়িত থাকার তথ্য জানা যায়।

কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল?
সাধারণত পেটেন্ট আবেদনে আবিষ্কারকের লিঙ্গের উল্লেখ থাকে না। তাই আইপিও আবেদনে আবিষ্কারকের নামের প্রথম অংশ থেকে লিঙ্গ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। আর এর জন্য ইউরোপীয় পেটেন্ট অফিস যা বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর পেটেন্টের পরিসংখ্যানগত তথ্য রাখে তাদের সহায়তা নেয়।

আবিষ্কারকের নামের সাথে তার লিঙ্গের মিল রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা হয় যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান দফতর এবং মার্কিন সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের কাছ থেকে জন্ম বিষয়ক তথ্য থেকে।

এসব তথ্যে জন্ম নেয়া শিশুর নাম, ছেলে এবং মেয়ে শিশুর সংখ্যার উল্লেখ থাকে। এছাড়া একই সাথে ফেসবুক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে নামের সাথে লিঙ্গের মিল কতটা থাকে তা থেকেও তথ্য ও সহায়তা নেয়া হয় বড় তথ্য তালিকা তৈরির সময়।

এক্ষেত্রে সেসব নামই নেয়া হয়েছে যেগুলো ৯৫% ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে ব্যক্তির লিঙ্গ নিশ্চিত করে। ছেলে বা মেয়ে যে কারো হতে পারে এমন নাম যেমন 'রবিন' তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।

৭৫% ক্ষেত্রে নামের সাথে লিঙ্গের মিল পাওয়া গেছে। যদিও দেশ ভেদে এই সাফল্যের হারে পার্থক্য রয়েছে। ব্যবহৃত নামের তালিকাগুলোতে পশ্চিমা নামের দিকে ঝোঁক বেশি ছিল, যার কারণে যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে সফলতার হার সবচেয়ে বেশি, যেখানে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনে এই হার সবচেয়ে কম।

১০০ নারী কী?
বিবিসি ১০০ নারীর নামের তালিকায় প্রতি বছর বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী এবং অনুপ্রেরণায়ময় নারীর নাম এবং তাদের গল্প প্রকাশ করা হয়।

#100Women এই হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটারে এই তালিকা পাওয়া সম্ভব।


আরো সংবাদ

পরনে পোশাক নেই কিন্তু মাথায় হেলমেট, বাইক নিয়ে ছুটল পুঁচকে! (ভিডিও) (২৬৯০৯)পরকীয়ার জন্যই বানারীপাড়ার ট্রিপল মার্ডার! (২১৩৮৭)প্রবাসীর স্ত্রী মিশুর পরকীয়া রাজমিস্ত্রীর সাথে, লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত (২০৪৩৬)পাশাপাশি বসে একজনকেই বিয়ে করল দুই বোন (১৫০৬৯)লোকসভায় নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের কপি ছিঁড়ে ফেললেন ওয়াইসি (১৩৬৮২)প্রবাসী দুই ছেলে টাকা পাঠায় স্ত্রীর কাছে, তাই স্ত্রীকে হত্যার পর আত্মহত্যা! (১২৭৭১)বেয়াইয়ের লাগাতার ধর্ষণে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা কিশোরী (১২৭২১)তারেক রহমান, মির্জা ফখরুলসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা (১২৪৮৬)‘সু চির জন্য দোয়া করতাম, তিনি আজ খুনিদের পক্ষে’ (১২৪২৪)অমিত শাহের জবাব দিলেন আব্দুল মোমেন (১২৪১০)



hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik