২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
একান্ত সাক্ষাৎকারে সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক

সরকারের অপকৌশলগুলো আমরা মোকাবেলা করতে পারিনি

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক - ছবি : নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, ২০ দল নেতা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেছেন, সরকারের অপকৌশলগুলো আমরা সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করতে পারিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুঁজিবাদের একটি মন্দ উদাহরণ হয়ে উঠছে। অর্থনীতির আকৃতি বাড়ছে, গরিবের দুঃখও বাড়ছে। মাঝখানে কিছু কলাগাছ ফুলে ফেঁপে বটগাছ হয়ে যাচ্ছে। 
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছেন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। খেতাব পেয়েছেন বীরপ্রতীকের। ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে জন্ম নেয়া এই সেনাকর্মকর্তা অবসর নেন ১৯৯৬ সালের জুন মাসে। এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের জনক সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম জনপ্রিয় টকশো ব্যক্তিত্ব। এ ছাড়া রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে লিখেন বিভিন্ন দৈনিকে। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। শুরু থেকেই এ দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক এই দলটি। সমসাময়িক রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে নয়া দিগন্তের সাথে খোলামেলা কথা বলেছেন। 

গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, আমাদের স্বীকার করতেই হবে সরকারের রাজনৈতিক অপকৌশলগুলো আমরা সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করতে পারিনি। ভুলের খেসারত দিতে দিতে আমরা সরকারের অপকৌশলের কাছে নতি স্বীকার করতে হচ্ছে। এখন ভীষণ দুর্বল অবস্থায় চলে আসছি। 
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রসঙ্গে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম এই শীর্ষনেতা বলেন, ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পেছনে কারণটা কী এই ছিল যে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনকে সফল করা এবং ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টকে পার্লামেন্টে নেয়া? নাকি লক্ষ্য এই ছিল, বিএনপিকে নির্বাচনে আনা, নির্বাচন পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা যাতে প্রত্যাহার করতে না পারে? বিএনপি জোটের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে আন্দোলন এবং কূটনৈতিকভাবেও সরকারকে পুনর্নির্বাচন দিতে চাপ প্রয়োগের কথা বলেন তিনি। বলেন, এখন লক্ষ্য একটাই ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা। 

সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত দেয়া হলো-
প্রশ্ন : আপনার বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বাজেট পেশ হয়েছে। বাজেট নিয়ে মূল্যায়ন?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : ১৩ জুন বাজেট পেশ হয়েছে। অর্থমন্ত্রী অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে সংসদে গিয়ে বজেট পেশ করেছেন। বাজেটের আকার বা আকৃতি বেশ বড়। বছরের পর বছর ধীরে ধীরে এটি বড় হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু কিছু অভিনবত্ব আছে; যেটা ক্রমান্বয়ে প্রকাশ পাবে। আমি মনে করছি সেগুলো ভালো হবে। তবে সার্বিক মন্তব্য হলো, বাজেটের রূপ বা আকৃতি দেখে মানুষ কিন্তু অর্থনীতির সঠিক বা নিখুঁত অবস্থাটা জানতে পারবে না। কেন বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে তারল্য সঙ্কট, কেন বিনিয়োগের জন্য টাকা নেই, অথচ জিডিপির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই যে দ্বৈধতা, এটির উত্তর কিন্তু বাজেট দিচ্ছে না। কেন শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি হয়েছে, এত টাকা ব্যাংক থেকে উধাও হলো, সেগুলো গেল কই? এসবের উত্তর বাজেট দিচ্ছে না। বাজেট দিচ্ছে ইনকাম ট্যাক্স সিলিংয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে, বিদেশী বিনিয়োগ সিলিংয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। রেমিট্যান্স পাঠাতে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে আরো সুন্দর বা সহজভাবে টাকা পাঠাতে পারে। ইনভেস্টমেন্ট যাতে বাড়ে সেজন্য প্রণোদনা রাখা হয়েছে এবং বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে, এটা সত্য। এসব সত্য মেনে নিয়ে বলছি, আসলে আমি স্বাস্থ্যবান? অর্থাৎ একটি গরু দেখতে নাদুস-নুদুস। কোরবানির আগে বাজার থেকে ক্রেতা খুব সুন্দর মনে করে আনল। আসলে যে এটা কেমিক্যাল মিশ্রিত খাদ্য খাইয়ে দ্রুত মোটাতাজাকরণ করা হয়েছিল, তা কি ক্রেতার জানা ছিল? নতুন অর্থমন্ত্রীর সুস্থতা ও সফলতা কামনা করি। 

প্রশ্ন : বর্তমান সরকার ছয় মাস অতিক্রম করছে। ২০ দলের একজন শীর্ষনেতা হিসেবে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? 
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : একটা দেশ যখন চলমান, তখন একটা সরকার থাকতেই হয়। সে সরকার বৈধ হোক আর অবৈধ। বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা ক্ষমতায় এসেছেন অবৈধ পন্থায়। অবৈধ পন্থা বলতে মানুষ আগে মনে করত সামরিক বাহিনীর ক্যু বা সশ্রস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসাকে। এটা ছাড়াও যে অবৈধ পন্থা আছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ বাংলাদেশের রাজনীতি। অর্থাৎ গত ৩০ ডিসেম্বর, যে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, তা সেদিন হয়নি। সেটি হয়েছে ২৯ ডিসেম্বর রাত্রিবেলায়। জনগণ ৩০ ডিসেম্বর ভোট দিতে পারেনি। আগের দিন রাতে তাদের ভোট দিয়ে দেয়া হয়েছে। এ কাজ করার জন্য সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে লাগিয়েছে। এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি শঙ্কিত। কারণ আপনি আইনের রক্ষককে আইনভঙ্গ করাচ্ছেন। এটি খারাপ নজির, সরকারকে ফেস করতে হবে। অবৈধ এই সরকারের আয়ু নিয়ে আমি শঙ্কিত। আমরা আবেদন জানাচ্ছি, জানাতে থাকব যারা ক্ষমতা দখল করে আছে, পার্লামেন্ট গঠন করেছে তাদের কাছে। আপনারা নতুন করে নির্বাচন দিন। জনগণকে ভোট দেয়ার সুযোগ দিন। যারাই সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসবে তারাই দেশ পরিচালনা করুক। যারা গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় আসবে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সবসময় থাকতে চাই। 

প্রশ্ন : নির্বাচনের আগে আপনারা ২০ দলীয় জোট থেকে বলে আসছিলেন শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবেন না, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা নেই। তাহলে শেষ পর্যন্ত আপনার নির্বাচনে গেলেন কেন? 
সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম : আমাদের স্বীকার করতেই হবে সরকারের রাজনৈতিক অপকৌশলগুলো আমরা সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করতে পারিনি, এটা আমার স্বীকৃতি অন্তত। এর কারণ, আমাদের নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা। কোনো সাংগঠনিক দুর্বলতা? বিএনপির নিজের এবং ২০ দলীয় জোটের। ২০ দলীয় জোটের শীর্ষনেতাদের যে রুলস- কাঠামো, সব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারিনি। যে কারণে জোটের শরিক বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ, তার দলকে নিয়ে ২০ দলীয় জোট ছেড়ে চলে গেছেন। আমি ২০ দল ছাড়ছি না। আছি থাকব। আমরা ভেতর থেকে সংস্কার করতে চাই। কিন্তু পার্থ সাহেব কেন চলে গেলেন? তিনি বলেছিলেন, ২০ দলীয় শীর্ষনেতাদের সহমত পোষণ করা, একমত পোষণ করা এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন ছাড়া আর বিশেষ কোনো কাজে লাগানো হতো না। আমি সামরিক বাহিনীর একজন ব্যক্তি। আমার দ্বারা কী করা সম্ভব, আমার কী অভিজ্ঞতা আছে, আমি কী বুদ্ধি দিতে পারি, এই সুযোগ ছিল না। আমরা প্রধান শরিকের কথামতো চলতে বাধ্য হয়েছি। প্রধান শরিক একসময় বলত, দেশনেত্রীকে জেলখানায় রেখে ২০ দলীয় জোটের আসন বণ্টনের আলোচনা কেমনে হবে? এটা কত বড় বেয়াদবি। অথচ সেই ম্যাডামকে ভেতরে রেখে আমরা নির্বাচনে গেলাম এবং পার্লামেন্টে পর্যন্ত চলে গেলাম। এই দ্বৈধতা, আমাদের আস্থায় নেয়া হয়নি যে আপনারা কী কৌশল অবলম্বন করতে চান। কিন্তু আমরা ২০ দলীয় জোটের সাফল্যের স্বার্থে, বিএনপির স্বার্থে, কোটি কোটি নির্যাতিত-বঞ্চিত নেতাকর্মীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে প্রতিবাদ করিনি। বলেছি আচ্ছা ঠিক আছে, যেহেতু প্রধান শরিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নিচ্ছে নিক। এখন আকাশে বাতাসে প্রশ্ন উঠেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে, কেন নিয়েছে এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে এবং কেন নিয়েছে। ২০১৪ সালে বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটের অবস্থান অনেক শক্তিশালী ছিল। সরকারের অবস্থা অনেক দুর্বল ছিল। অথচ আঠারো সালে ঠিক উল্টো। আমাদের ভুলের খেসারত দিতে দিতে আমাদের সরকারের অপকৌশলের কাছে নতি স্বীকার করতে হচ্ছে। এখন ভীষণ দুর্বল অবস্থায় চলে আসছি। এখন যেটা দাঁড়িয়েছে তা হলো- ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতেই সব চেষ্টা ছিল, যেটা পারিনি। মুক্ত করার জন্যই নাকি আবার পাঁচ-ছয়জন পার্লামেন্টে গিয়েছেন। এটা আমার কাছে বোধগম্য নয়। আমরা ২০ দলীয় জোটে কথাটাকে আবারো তুলতে চাই। আবারো আলোচনা করতে চাই। মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক ২০ দলীয় জোট এবং জোটের নেতারা। কিন্তু আমাদের প্রধান শরিক বিএনপিতে এখন নেতৃত্বের মধ্যে আস্থার সঙ্কট। আমরা সেই সঙ্কট মোচনের জন্য কী করা যায়, এ নিয়ে চিন্তায় আছি। আমরা চাচ্ছি বিএনপি-২০ দলীয় জোট গতিশীল হোক। লক্ষ্য একটা ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করা। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার মানে ম্যাডামকে মুক্ত করা, আর ম্যাডামকে মুক্ত করা অর্থ পুনর্নির্বাচন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। কারণ, নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার কেমনে করবেন।

প্রশ্ন : নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা ছিল না, সরকারের প্রতিও না। তাহলে কিসের ভিত্তিতে আপনারা নির্বাচনে গেলেন, আবার ভোট ডাকাতির কথাও বলছেন? 
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : আমরা নির্বাচনে গেছি এই ভিত্তিতে যে জনগণ সরকারের ওপর প্রচণ্ডভাবে বিক্ষুব্ধ। জনগণ দেশনেত্রীর মুক্তি চায়। আমাদের আস্থা ছিল নির্বাচনটা সুন্দরভাবে হবে। কিন্তু সরকার যে রাত্রিবেলায়ই কাজটি করবে, এটি বিএনপির সিনিয়র কিছু নেতা হয়তো নির্বাচনের পাঁচ-সাত দিন আগে জেনেছেন। আমি অন্তত দু-তিন দিন আগে টের পেয়েছি যে এ রকম একটা হতে পারে। সেনাবাহিনীতে ছিলাম, সেনাবাহিনী কী করতে পারে, বিজিবি কী করতে পারে, পুলিশ বা প্রশাসনের কথাবার্তায় বুঝেছি, কল্পনা করেছি যে কী হতে পারে। আমাদের উচিত ছিল নির্বাচনের এক দিন-দু’দিন বা তিন দিন আগে সমন্বিত প্রতিবাদ করা। উচিত ছিল জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানববন্ধন বা আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনের সামনে এসে প্রতিবাদ করা যে আমরা এই অবস্থায় নির্বাচন করতে চাই না। প্রত্যাহার করব, ধমক দেয়া বা হুমকি দেয়া। কিন্তু আমরা সেটা করতে পারিনি। আর সরকার যে এই আস্থা ভঙ্গ করবে- এটা আশঙ্কায় ছিল; কিন্তু এটা বাস্তবায়ন হবে, এটা আমরা ২০ দলীয় জোট যথাসময়ে মূল্যায়ন করতে পারিনি। 

প্রশ্ন : ২০ দলীয় জোট বিএনপির নেতৃত্বাধীন দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। এটির বাইরে বিগত নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করল বিএনপি। এ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন।
সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম : ২০ দলীয় জোটের শরিকরা ঐক্যফ্রন্ট গঠনে সক্রিয় ছিল না। আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল না। যেহেতু প্রধান শরিক বৃহত্তর ঐক্যগঠনে উদ্যোগ নিয়েছে সেজন্য বাধা দেইনি। কম-বেশি বলেছি ঠিক আছে এগিয়ে যান। শরিক হিসেবে আমি নিজেই বলেছি, ২০ দলের সবাইকে ঐক্যফ্রন্টে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, সবাই যেতে পারবেও না; বিএনপি আমাদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করুক। নির্বাচনের তিন মাস পর থেকে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পেছনে কারণটা কী ছিল? কারণটা কি এই ছিল যে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনকে সফল করা এবং ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টকে পার্লামেন্টে নেয়া, নাকি লক্ষ্য এই ছিল, বিএনপিকে নির্বাচনে আনা, নির্বাচন পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা যাতে প্রত্যাহার করতে না পারে- যাতে ক্ষমতাসীনরা বলতে পারে এটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছিল, সব দল এসেছিল নির্বাচনে। এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর আমরা বলতে পারব না, অনুমান করে বলতে পারব; যেটা পত্রপত্রিকায় সমালোচকরা লিখেছেন। আর ২০ দলীয় জোটের প্রধান দল বিএনপি, আমাদের মুখপাত্রও বিএনপি এবং সমন্বয়কারীও বিএনপি। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টে পরিস্থিতি উল্টা। আমরা সে জন্য ২০ দলীয় জোটকে সক্রিয় করার প্রস্তাব দিয়েছি। আমাদের এখন স্টিয়ারিং কমিটি করা ভালো। ২০ দলীয় জোটকে সক্রিয় করা প্রয়োজন। 

প্রশ্ন : তাহলে কি ২০ দলীয় জোট সঠিক পথে হাঁটছে না? 
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : একটি আসন দিয়েই উদাহরণ দেই। আমার নির্বাচনী এলাকা হাটহাজারীর তিন ভাগের দুই ভাগ নেতাকর্মী জান দিয়ে দিয়েছে। প্রত্যেকটি ওয়ার্ড, প্রত্যেকটি মহল্লায় মানুষ জান দিয়ে দিয়েছে। আগের দিন রাতের বেলা ১০-১২টি কেন্দ্রে তারা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালায়; কিন্তু গুলির মুখে তা পারেনি। বিএনপি যদি সেই সাংগঠনিক নেতৃত্বটা পেত, সারা দেশেই এই প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হতো। ২০ দলের শরিকরা এতে শামিল হতো। কিন্তু আমরা সেই সাংগঠনিক নেতৃত্বটা পাইনি। আমরা এখন নতুন করে নির্বাচন চাই। অন্তর্বর্তী বলুন আর মধ্যবর্তী, যে নামেই বলুন। নতুন নির্বাচন ছাড়া বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে না।

প্রশ্ন : কিন্তু নতুন নির্বাচন কেন দেবে সরকার? সরকার তো কোনো চাপে নেই যে আপনাদের দাবি তাদের মানতেই হবে?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : অত্যন্ত সুন্দর প্রশ্ন, কেন নির্বাচন দেবে, বাস্তব। তাহলে সরকারকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে, কূটনৈতিকভাবে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে; দেশের ক্ষতি না করে বাধ্য করতে হবে। রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ক্ষতি না করে সরকারকে নতুন নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে হবে। 

প্রশ্ন : তাহলে কি আপনারা আন্দোলনের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতার কথাও ভাবছেন? 
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : ১০-১৫ বছর আগে আওয়ামী লীগের মতো হরতাল, জ্বালাও পোড়াওয়ের রাজনীতি ২০ দল করবে না। ২০ দল আওয়ামী লীগের মতো মারাত্মক ধ্বংসাত্মক কর্মসূচিতে বিশ্বাসী না। আমি ব্যক্তিগতভাবে আবেদন করব (বিএনপির কাছে) বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ১১ বছরের ছোট একটি দল। আমাদের আকৃতি ছোট; কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই। বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তিকে ময়দানে আহ্বান জানাই, শান্তিপূর্ণভাবে সরকারকে বাধ্য করতে হবে নতুন নির্বাচন দিতে। 

প্রশ্ন : বিএনপি ২০ দলের মূল। তাদের সাথে কি কোনো কথা হয়েছে এ নিয়ে?
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া বাকিরা পার্লামেন্টে (৬ জন, এর মধ্যে সংরক্ষিত ১) গেছেন। এ নিয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত কে দিয়েছেন? এ ধোঁয়াশা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত বিএনপি সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তবে নেতৃত্ব লেভেলে এটা স্বীকৃত বাস্তবতা, আন্দোলন লাগবে।

প্রশ্ন : বিএনপি ২০ দলীয় জোটের চেয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে বেশি গুরুত্ব দেয়- এটা অনেকেরই অভিযোগ। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য? 
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতি মনোযোগ বেশি দিয়েছে, এটা বাস্তব। নির্বাচনের আগে থেকে শুরু, নির্বাচনকালেও এবং পরবর্তী সময়েও। তবে এটা ঝগড়ার বিষয় না। যেহেতু আমরা রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা বৃহত্তর ঐক্য চাই, এখানে বিবেচনার বিষয় কাকে দিয়ে কাজ হবে। আমি এটা বলতে চাই রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ২০ দলীয় জোটে আছে, ঐক্যফ্রন্টেও আছে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম, কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম, সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম, শাহজাহান ওমর বীরোত্তম এ রকম অনেক আছে। রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের যে সাহস সেটাকে রাজনৈতিক ময়দানে আনতে হবে, রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের সততাকে রাজনৈতিক ময়দানে আনতে হবে এখন। দ্বিতীয়ত এই টানাপড়েন বিএনপিকেই সমাধান করতে হবে। আমাদের যা দরকার ঘরে ইঁদুর ঢুকেছে, কোন বিড়ালটি ওকে মারবে। সাদা বিড়াল নাকি কালো বিড়াল? 

প্রশ্ন : বিএনপি এক যুগের বেশি হলো ক্ষমতার বাইরে। বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? 
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : বিএনপি নিশ্চিতভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি, তার আদর্শ লালন করে পুনরুজ্জীবিত করে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। বিএনপির ওপর যে স্টিমরোলার চলছে, এটাকে প্রতিহত, সহ্য করেই ঘুরে দাঁড়াতে হবে। বিএনপিতে হাজার হাজার, লাখ লাখ নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মী আছে। তাদের সংগঠিত করাই আমাদের দায়িত্ব। গত কয়েক বছরে সাংগঠনিকভাবে দল বা জোটকে শক্তিশালী করার কথা থাকলেও সেদিকে আমাদের নজর দেয়া হয় নাই। 

প্রশ্ন : ছিলেন সেনাকর্মকর্তা। কেন রাজনীতিতে আসা? 
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : আমার রাজনৈতিক মত ছিল, কিন্তু কোনপথ অবলম্বন করব তা জানতাম না। দ্বিতীয়ত, আমি মত ধারণ করে পথের সন্ধান করেছি। চূড়ান্ত পর্যায়ে একটা পথ অবলম্বন করেছি, তা হলো বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। মহান আল্লাহর দয়ায় আমি মেধাবী ছিলাম। আমি সাহসী ছিলাম। আমি ভালো বলতে পারি, লিখতে পারি, কাজও করতে পারি। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপ্রক্রিয়া-তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম এবং তৎকালীন খাগড়াছড়ির ব্রিগেড কমান্ডার সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের যৌথ প্রচেষ্টায়। মাঠে ছিলেন সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। আমার রাজনৈতিক হাতেখড়ি সেখানেই হয়েছে। রাজনৈতিক ত্রুটিগুলো সেখানেই আমি আবিষ্কার করেছি। ১৯৯৬ সালে যখন আমার অবসর হয়, তখন শান্তিপ্রক্রিয়ার সাথে সরকার জড়িত হয়ে পড়ে, আমাদের ডাকেনি। আমাদের মাইনাস করে রেখেছে। ৯৭ সাল থেকে যখন লেখতে শুরু করলাম, বলতে শুরু করলাম। ৮-৯ বছর চলার পর মানুষ বলতেই শুরু করল, কত আর বলবেন- কত আর লিখবেন। পারলে করে দেখান। কারণ নীতিবাক্য টিভিতে বলা, পত্রিকায় লেখা এক জিনিস আর সরেজমিন করতে চেষ্টা করা আরেক জিনিসি। আপনারা বিশ্বাস করুন একমাত্র কারণেই আমি রাজনীতিতে এসেছি। যা বলি, যা লিখি সেটাকে বাস্তবে করে দেখিয়ে উদাহরণ সৃষ্টির জন্য। 

প্রশ্ন : আপনার দল কল্যাণ পার্টির ভবিষ্যৎ কী? 
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : আরপিও অনুযায়ী জেলা উপজেলায় কমিটি করে এগোচ্ছে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। ২২টি জেলা এবং ১০০টির উপরে উপজেলায় কমিটি করা, ছোটদলগুলোর জন্য এটা খুব কঠিন কাজ। অনেক কষ্ট করে এগোচ্ছি। আর বাংলাদেশের মানুষের একটা অভ্যাস তেলের মাথায় তেল দেয়া। নতুন মাথায় তেল দিতে চায় না। বিএনপি-আওয়ামী লীগের বাইরে স্বতন্ত্রভাবে দল খাড়া করা খুব কষ্টকর। আমি সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা, আল্লাহ প্রদত্ত মেধাকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করছি। জনগণের খেদমত করার জন্য।
ধন্যবাদ সময় দেয়ার জন্য।

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম : নয়া দিগন্তকেও ধন্যবাদ।


আরো সংবাদ