১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

নদীর উন্নয়নে রাজধানীর চিত্র বদলে যাবে, গতি বাড়বে অর্থনীতির

একান্ত সাক্ষাৎকারে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী
প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী - ছবি : সংগ্রহ

দেশের নদী এবং বন্দরের উন্নয়নের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘৭৫ এর পর কোনো সরকারই নদীকে গুরুত্ব দেয়নি। সে জন্য দখল আর দূষণে নদীমাতৃক দেশের ঐতিহ্য হারাতে বসেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নদী নিয়ে আবার নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়। বিশেষ করে গত ১০ বছরে নদী নিয়ে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে নদীকে। দেশের নদীগুলো দূষণ ও দখলমুক্ত করতে সর্বোচ্চ তাগিদ দিয়ে ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী টাস্কফোর্স গঠন করে দিয়েছেন। নদী নিয়ে মাস্টার প্ল্যানও করা হচ্ছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উচ্ছেদ অভিযান চলছে। ঢাকার আশপাশের নদীগুলো দখলমুক্ত করে ইকোপার্ক তৈরি করা হবে। আর এভাবে নদীর উন্নয়নে রাজধানীর চিত্রই বদলে যাবে।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মরহুম আব্দুর রৌফ চৌধুরীর একমাত্র ছেলে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই উঠে এসেছেন। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্র রাজনীতি শেষ করে তিনি আওয়ামী লীগের মূল রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। এ সময় তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সান্নিধ্য লাভ করেন। ২০০১-০৬ সময়ে তিনি সুধা সদনে বসে শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করতেন। জরুরি অবস্থার সরকারের সময় শেখ হাসিনার মুক্তি আন্দোলনেও বেশ সক্রিয় ছিলেন তিনি। পরপর দুটি কাউন্সিলের মাধ্যমে টানা দ্বিতীয়বারের মতো দলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন জনপ্রিয় এই রাজনীতিক।


দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার স্নেহধন্য খালিদ মাহমুদ ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে দিনাজপুর-২ আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। টানা তিনবার নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য এবারই প্রথম সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। দায়িত্ব পেয়েছেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর। গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ে পূর্ণমন্ত্রী না থাকায় একাই সামলাচ্ছেন তিনি। দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে ইতোমধ্যেই বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন তিনি। সম্প্রতি নয়া দিগন্তের সাথে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সিনিয়র রিপোর্টার জাকির হোসেন লিটনের নেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

নয়া দিগন্ত : নদী দখলমুক্ত করতে চলমান উচ্ছেদ অভিযান সম্পর্কে বলুন।
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে আরো বেগবান করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সে জন্য প্রধানমন্ত্রী নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। নির্বাচনী ইশতেহারেও সরকারের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য স্পষ্ট করা হয়েছে। সেখানে নদী, নদীবন্দর ও নদীপথকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ঢাকা ঘিরে যে চারটি নদী রয়েছে সেগুলো এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই বিশেষ উদ্যোগের কথা বলেছেন। মূলত ঢাকার মধ্যকার চারটি নদী নিয়ে যে বিশেষ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তারই অংশ হিসেবে এই উচ্ছেদ অভিযান চলছে।

নয়া দিগন্ত : নদী দখলে অনেক প্রভাবশালী জড়িত বলে শোনা যায়। এ ক্ষেত্রে কোনো বাধা আসছে কি না? 
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আমি জাতীয় সংসদেও বলেছি, সরকারের থেকে শক্তিশালী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হতে পারে না। আর দখলকারীদের পরিচয় শুধুই অবৈধ দখলকারী। তাদের অন্য কোনো পরিচয় থাকতে পারে না। তাই বাধা দেয়ার নৈতিক শক্তিও নেই তাদের। আর নদী, পরিবেশ, জনগণ ও দেশের স্বার্থে কোনো ধরনের বাধাই আমরা আমলে নিচ্ছি না। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আখ্যা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংককে ভুল প্রমাণিত করে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্বে যেকোনো চ্যালেঞ্জই মোকাবেলা করা সম্ভব। সব শক্তি পায়ে মাড়িয়ে আমরা নদী দখলমুক্ত করবই।


নয়া দিগন্ত : নদী নিয়ে টাস্কফোর্স গঠনের কথা সামনে আসল কেন?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : নদীগুলো আসলে অনেক আগেই দখল হয়ে গেছে। ঢাকার মধ্যকার খাল, নালা, ডোবা ভরাট হয়ে গেছে। নদী, খালের ওপর স্থাপনা তৈরি হয়ে গেছে। নদী, খাল আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্যই এই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। পাঁচটি নদীর ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেবে এই টাস্কফোর্স।

নয়া দিগন্ত : দেশের অন্য নদীগুলোর তো একই চিত্র।
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বাংলাদেশে সাত শতাধিক নদী রয়েছে। একসময় বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হলেও আজ আর সেই চিত্র নেই। আমরা দেশের সব নদী রক্ষা করতে চাই। ইতোমধ্যে নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে। সংসদে এ কমিশন গঠন নিয়ে বিল পাস করা হয়েছে। নদী রক্ষা কমিশন ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। আমরা প্রতিটি জেলা, উপজেলায় নদী রক্ষা কমিটি গঠন করতে যাচ্ছি। জেলা প্রশাসক থাকবেন সে কমিটির সভাপতি। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এই কমিটিতে থাকবেন। নদীগুলোকে পুনরুদ্ধার করে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করার মাধ্যমে আমরা নদীমাতৃক বাংলাদেশের সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চাই।

নয়া দিগন্ত : নদী দখলকারীরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে বলে অভিযোগ আছে।
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আমরা আসলে কাছাকাছি সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে মন্তব্য করতে পছন্দ করি। কিন্তু ২০ বা ৫০ বছর আগে কী হয়েছে, তা ভুলে যাই। নদী রক্ষার জন্যই স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু নৌ-মন্ত্রণালয় গঠন করেছিলেন। নদীমাতৃক বাংলাদেশ বাঁচাতে হলে নদী রক্ষা করতে হবে এবং বঙ্গবন্ধু সেটা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। আজকে ‘ব্লু ইকোনমি’ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সমুদ্র আইন করে বঙ্গবন্ধু সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষার জন্য অনেক আগেই তাগিদ দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর নদী-সমুদ্রে কী হয়েছে? সবই ধ্বংস হয়েছিল। আমরা শুধু নিকট-অতীতের কথা বলি। আমরা গভীরে যেতে চাই না। খাস খতিয়ান দেখিয়ে নদী বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে। শুধু নদী নয়, কবরস্থান, শ্মশানের জমিও খাস খতিয়ান দেখিয়ে বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে। ভূমির মালিক অথচ তাকে ভূমিহীন বানিয়ে জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়ার আমলে হাজার হাজার একর জমি এভাবে দখল করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে কী পরিমাণ সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানায় দখল করা হয়েছে তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা নেই। জিয়াউর রহমানের আমলে রাজনৈতিকভাবেই নদীর পাড়ে স্থাপনা হয়েছে। সড়কের পাশের জায়গা দখল হয়েছে। জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের আমলের জবরদখল এখন আমাদের ওপর এসে পড়ছে। তাদের অপকর্মের দায় আমাদের নিতে হচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : কিন্তু আওয়ামী লীগও টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে। 
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : হ্যাঁ, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলেই তো নদীর জমি দখলমুক্ত করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা সফল নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন বলেই আমরা বিশাল সমুদ্র এলাকা নিজেদের দখলে রাখতে পারছি। আমরা আইনি লড়াই করে সমুদ্র সীমানা রক্ষা করেছি। যদি সমুদ্র সীমানা নিজেদের দখলে রাখতে না পারতাম, তাহলে বাইরের কোনো জাহাজ ভারত বা মিয়ানমারের অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশে আসতে পারত না।
আপনি বুড়িগঙ্গার পানিকে পানি বলতে পারবেন না। কেমিক্যাল বলতে হবে। অথচ এই অবস্থা থেকে উত্তরণে কোনো সরকারই চেষ্টা করেনি। আমরা এখন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে নদীর পরিবেশ ঠিক করছি। অথচ কতিপয় পরিবেশবাদী বলছেন, ‘সরকার নাকি নদীর জমি দখল করছে। নদীর জমি তো সরকারের। সরকার জনগণের। জনগণের স্বার্থে সরকার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে প্রস্তুত। যারা সরকারের উচ্ছেদ অভিযানের সমালোচনা করছে, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ স্বীকার করে না। তাদের রক্তে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ধারা প্রবাহিত। তারা বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি। বাংলাদেশের উন্নয়ন মেনে নিতে পারছে না। এ কারণে তারা সব জায়গায় জটিলতা সৃষ্টি করে চলছে।

নয়া দিগন্ত : উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে কী দেখতে পাচ্ছেন?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : দখল দেখে অবাক হয়েছি। বুড়িগঙ্গার চরে ৪৬টি মসজিদ করা হয়েছে। আমরা মুফতিদের কাছ থেকে বক্তব্য নিয়েছি। তারা এভাবে নদীর জমি দখল করে মসজিদ বানানোকে নাজায়েজ বলছেন। ধর্মকে ব্যবহার করে নদী দখল করার জন্যই এমনটি করা হয়েছে। নদীর মধ্যে হাসপাতাল করা হয়েছে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন করা হয়েছে। আমরা সঠিকভাবে এসব বিষয়ের সমাধান চাইছি। ধর্মকে পুঁজি করে বিশেষ মহল যাতে অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে, তার জন্য আমরা সজাগ। জনপ্রতিনিধিদের বলা হয়েছে। তারা কাউন্সিলিং করবে।

নয়া দিগন্ত : দখলকারীদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আমাদের আপাতত টার্গেট হচ্ছে দখলমুক্ত করা। তবে আইনের আওতায় সবকিছুই আসবে বলে আমি মনে করি। দখলকারীদের পরিচয় শুধুই অবৈধ দখলকারী। তারা কখনোই আইন বা রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হতে পারে না। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গিয়ে সরকারের অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। তাই উচ্ছেদের খরচও দখলকারীর কাছ থেকেই নেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে।

নয়া দিগন্ত : রাজধানীর আশপাশের নদীগুলো নিয়ে সরকারের কী পরিকল্পনা রয়েছে?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই নদীগুলোকে মানুষের জীবনে কাজে লাগাতে চাই। আমাদের অর্থনীতিতে নদীর ভূমিকা বাড়াতে চাই। শুরুতেই ঢাকার আশপাশের নদীগুলো দখল ও দূষণমুক্ত করতে চাই। তার কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ঢাকা শহরের ভেতরে যে ক্যানেলগুলো রয়েছে তা পরিষ্কার করা হবে। সুয়্যারেজ লাইনে যে আবর্জনা রয়েছে এগুলো নদীর মধ্যে না ফেলে কিভাবে রিসাইক্লিং করে অন্য কাজে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এতে করে নদী দূষণটা বন্ধ করতে পারব। নদী দূষণমুক্ত করতে এর কোনো বিকল্প নেই। নদীগুলো দখল ও দূষণমুক্ত করে আমরা নদীর পাড়ে ইকোপার্ক তৈরি করব। নদীর পাড় হবে বিনোদনের অন্যতম জায়গা। তবে এ জন্য অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা দরকার। কারণ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে নদী দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, শিল্প, পরিবেশসহ আরো কয়েকটি মন্ত্রণালয় আছে। সবার সম্মিলিত পদক্ষেপ লাগবে।

নয়া দিগন্ত : ঢাকার চারটি নদীর পাড় ঘেঁষে পায়ে হাঁটার রাস্তা করা হচ্ছে। এটি সর্বশেষ কোন পর্যায়ে আছে?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : হ্যাঁ, রাজধানীর পার্শ্ববর্তী চারটি নদী ঘিরে প্রায় দেড়শ’ কিলোমিটার পায়ে হাঁটার রাস্তা হবে। ইতোমধ্যেই ৫০ কিলোমিটার রাস্তা হয়ে গেছে। নদীর উন্নয়নে রাজধানীর চিত্রই পাল্টে যাবে। আমরা এখন বর্জ্য অপসারণের জায়গা পাচ্ছি না। মেয়র এ ব্যাপারে সহায়তা করছেন। বর্জ্য অপসারণ করামাত্রই আমরা আবারো কাজ শুরু করে দেবো।

নয়া দিগন্ত : নদীবন্দরের উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : পায়রা বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপ বদলে দেবে বলে বিশ্বাস করি। মাতারবাড়ি বন্দরও ঠিক তাই। দেশের প্রতিটি নদীবন্দরই আধুনিকায়ন করার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। আধুনিকমানের নৌযান ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। নৌ বাণিজ্য অধিদফতরের পরিকল্পনাও রয়েছে। নদী-সমুদ্র নিয়ে গবেষণা বাড়ানো হচ্ছে। সমুদ্রের তলদেশের সম্পদ আহরণ নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। আর এসবই নদীবন্দরের সাথে যুক্ত। নদীবন্দরের উন্নয়নই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমাদের ডেল্টা প্ল্যান নদী এবং সমুদ্র ঘিরেই। শত বছর পর বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় থাকবে, তার জন্যই কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নয়া দিগন্ত : নোয়াখালীতে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কথা শোনা যাচ্ছে।
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : ঠিকই শুনেছেন। নোয়াখালীতে সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চায় সরকার। নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাটিতে ও চট্টগ্রামে সন্দ্বীপের উড়িরচরের উজানে বঙ্গোপসাগরের চ্যানেলে এই বন্দর নির্মাণ করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর থেকে চাপ কমাতে এই বন্দর স্থাপন করা হবে। নোয়াখালীর স্থানীয় সংসদ সদস্য (নোয়াখালী-৪) এ বিষয়ে একটি ডিও (আধা সরকারি পত্র) লেটার সরকারকে দিয়েছেন। বর্তমানে বন্দরের সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাইর কাজ চলছে। নোয়াখালীর ওই চ্যানেলে বন্দর করা হলে ঢাকার পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনাল আরো গতিশীল হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমবে। নোয়াখালীতে একটি বিমানবন্দরও হবে। এ জন্য আগেই জায়গা চূড়ান্ত হয়ে আছে। এ ছাড়া সেখানে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলও হবে। আর এখানে সমুদ্রের যেহেতু চ্যানেল রয়েছে, তাই পোর্ট করা গেলে তো আরো বেশি কার্যকরী হবে।

নয়া দিগন্ত : এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে? 
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : স্বাধীনতার পর যেখানে বাংলাদেশের ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথ ছিল, তা কমে চার হাজার কিলোমিটারে নেমে এসেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা ও পদক্ষেপের কারণে গত ১০ বছরে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার নদীপথ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। আমরা ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ তৈরি করতে চাই। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও সেই অঙ্গীকার করা হয়েছে। আমাদের নৌপথ ব্যবহার করে কলকাতার মানুষ আসামে যেতে পারবে। ইতোমধ্যেই ভারত-বাংলাদেশ যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দর হয়ে আমরা ভুটান, চায়না এবং ভারতের সাথে যুক্ত হবো। আর নৌপথের সাথে নদীবন্দরগুলোকেও যুক্ত করা হবে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে। সে জন্য আমরা ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনব।

নয়া দিগন্ত : উজানে নদীর পানি অপসারণ করছে ভারত। শুধু ড্রেজিংয়ে নাব্যতা ফিরবে?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আমরা পদ্মার পানি আদায় করেছি শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই। অন্যরা কিন্তু পারেনি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ীই আমরা পানি বণ্টন চাইছি। তিস্তা নিয়েও আমাদের অনেক অগ্রগতি আছে। ভারতের কিছু আঞ্চলিক সমস্যার কারণে তিস্তা নিয়ে জটিলতা। তবে খুব দ্রুততম সময়ে এই জটিলতা কেটে যাবে। এ ছাড়া আমরা পানির সমস্যা দেখছি না। খুব কাছেই আমাদের সমুদ্র। সমুদ্রই আমাদের পানির আধার। রাজনৈতিক কারণেই সমস্যা দেখানো হয়। পানির দাবিতে মওলানা ভাসানী যতদিন আগে লংমার্চ করেছেন, সেই অনুযায়ী বাংলাদেশ আজ মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার কথা। তা কিন্তু হয়নি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই অনেক সময় পানির সমস্যা বড় করে দেখা হয়।

নয়া দিগন্ত : ব্লু ইকোনমিতে বঙ্গোপসাগরে ভারত নাকি চীন গুরুত্ব পাবে?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আমাদের কারো সাথেই বৈরিতা নেই। সবার সাথেই বন্ধুত্ব রয়েছে। স্বাধীনতার প্রশ্নে ভারত আমাদের প্রথম বন্ধু। চীনও আমাদের উন্নয়ন অংশীদার। ভারতের সাথে চীন অথবা চীনের সাথে পাকিস্তানের কী সম্পর্ক সেটা তাদের বিষয়। আমরা সবার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে চাই। আমাদের অর্থনীতি, আমাদের উন্নয়নের স্বার্থে যারা আসবেন তাদেরকেই সাধুবাদ জানাব।

নয়া দিগন্ত : নিজের মন্ত্রণালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু বলুন।
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আসলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দিকে আগে কখনো দৃষ্টি দেয়া হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুই মেয়াদের সময়কালেই যতটা এগিয়েছে। তবে দীর্ঘ ৩০ থেকে ৩৫ বছরে যে জঞ্জাল তৈরি হয়েছিল তা এত অল্প সময়ে এই পর্যায়ে নিয়ে আসা কঠিন। আর এই মন্ত্রণালয় এতটা বিস্তৃৃত যে এটাকে জাতীয়ভাবে দেখলে চলবে না। এটাকে আন্তর্জাতিক কনটেস্টেও দেখতে হবে। আমাদের পোর্টগুলোর কী অবস্থা, তা তুলনা করতে হবে আন্তর্জাতিক পোর্টগুলোর সাথে। আমাদের পোর্টগুলোর আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা তো দূরের কথা, জাতীয়ভাবে যতটা করার কথা সেটাও হয়নি। এদিকে কোনো নজরই অতীতে দেয়া হয়নি। এখানে মনোযোগ না দেয়ার কারণে ফাঙ্গাস পড়ে গেছে। এটাকে সারাতে হবে। এগুলো সারানোর জন্য মন্ত্রণালয়ের সাচিবিক দায়িত্ব যারা পালন করছেন, তাদের আরো বেশি দক্ষ ও গতিশীল হতে হবে। তাদের সেভাবে দক্ষ ও গতিশীল করতে যতটা সহযোগিতা দরকার তা করা হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর শিশু বয়সে নৌকায় করে ঢাকা এসেছিলেন। চার-পাঁচ দিন লেগেছিল তার ঢাকায় পৌঁছাতে। আমার তো মনে হয় না এই ধরনের অভিজ্ঞতা বর্তমান প্রজন্মের অন্য কারও আছে। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়েই এই বিষয়টির ওপর নজর দিয়েছেন। আমার দায়িত্ব হবে সেটাকে এগিয়ে নেয়া। ভৌগোলিক কারণে আমরা ইস্টওয়েস্টের মাঝখানে আছি। নৌবন্দরগুলোর সক্ষমতা আমরা বাড়াতে পারলে জাতীয় অর্থনীতিতে সেটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

নয়া দিগন্ত : মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ ওঠে। এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেয়া হবে?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : যেকোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) খুবই শক্তিশালী ও স্বাধীন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে কোনো দুর্নীতি অনিয়ম হয়ে থাকলে তা তদন্তে আমরা দুদককে সব সময় স্বাগত জানাই। এ ক্ষেত্রে দুদকের কাজ করতে আমাদের কোনো বাধা থাকবে না। আমরা চাই, তারা সব জায়গার মতো আমাদের মন্ত্রণালয়েও ফাংশনাল হোক।
নয়া দিগন্ত : আপনাকে ধন্যবাদ। 
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আপনাকেও ধন্যবাদ।


আরো সংবাদ

সকল




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik