১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯
মক্কায় মুসলিম স্কলারদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন

বৈচিত্রকে ধারণ ও সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসন করতে হবে ইসলামী দেশগুলোকে

বৈচিত্রকে ধারণ ও সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসন করতে হবে ইসলামী দেশগুলোকে - সংগৃহীত

মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগের উদ্যোগে পবিত্র নগরী মক্কায় দু’দিনব্যাপি অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের শেষ দিনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে ধারণ করে ঐক্যের সুত্রসমূহকে নিয়ে উম্মাহকে এগিয়ে যেতে হবে। এই ঐক্য হবে ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহকে নিয়ে একটি মডারেট ও সহনশীল সমাজ গঠনের জন্য, যেখানে উগ্রবাদ প্রচার ও প্রসারের কোন অবকাশ পাবে না।

পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারাম সংলগ্ন হোটেল জেবেল ওমর হিলটনের কনভেনশন সেন্টারে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। মক্কা ভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেসরকারী ইসলামী সংগঠন মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। গতকাল বৃহস্পতিবার সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে তিনটি কর্ম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ‘মুসলিম ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র’ শীর্ষক প্রথম অধিবেশনে মডারেটর ছিলেন আল ইমাম মোহাম্মদ ইবনে সউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর ড. সুলায়মান আব্দুল্লাহ আবা আল-খাই। এতে আলোচনা রাখেন পাকিস্তানের ওয়াফাক উল মাদারিজ আল আরাবিয়ার সেক্রেটারী জেনারেল শেখ মোহাম্মদ হানিফ জলন্দরী, আলজেরিয়ার ইউনিভার্সিটি অব আলজিয়ার্সের অধ্যাপক ড. সালাহ হাকিমি, ন্যাশনাল কমিটি ফর মুসলিম-খৃস্টান ডায়লগ এর সেক্রেটারি জেনারেল ড. মুহাম্মদ সামাক, মৌরিতানিয়ার গ্রান্ট মুফতি শায়খ আহমদ আউদ লেমরাবোট বিন শেইখ আহমদ।

দ্বিতীয় কর্ম অধিবেশনের বিষয় ছিল, ‘ইসলামী ঐক্যের পথে বাধা সমূহ’। এতে মডারেটর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ইন্দোনেশিয়ার পিপলস কনসালটেটিভ এসেম্বলির ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ হেদায়েত নূর ওয়াহিদ। বিষয়ের বিভিন্ন দিকের উপর আলোচনা রাখেন, লেবাননের সিনিয়র রিলিজিয়াস স্কলার ড. মোহাম্মদ হাসান আল আমিনে, কুয়েতের শরিয়া আইন বাস্তবায়ন বিষয়ক পর্যবেক্ষণ কমিটির সুপ্রিম এডভায়জরী বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও কুয়েত ইউনিভার্সিটির ইসলামিক জুরিসপ্রুডেন্সের অধ্যাপক ড. সাইয়েদ মোহাম্মদ আল তাবাতাবাই, সুদানের আনসার উল সুন্নাহ আল মোহাম্মদিয়ার জেনারেল প্রেসিডেন্ট ড. ইসমাইল ওসমান মোহাম্মদ আরমাহি ও মিসরের আল আজহার ইসলামিক রিচার্স একাডেমির সেক্রেটারি জেনারেল ড. মহিউদ্দিন আফেফে আহমদ আবদেল মাজেদ।

তৃতীয় অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন, জর্দানের সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. মোহাম্মদ হিলায়েল, সুদানের ইউনিভার্নিটি অব হলি কোরআন এন্ড ইসলামিক সায়েন্সের পরিচালক ড. আহমদ সাইয়েদ সালমান, আলজেরিয়ায় সুপ্রিম ইসলামিক কাউন্সিলের সদস্য ড. মেবরাউক জিদেলখির, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওয়ার্ল্ড মুসলিম কমিউনিটি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ড. আলি রশিদ আল সুয়াইমি, কিং আবদুল আজিজ ইউনিভাসিটির সেন্টার ফর ইন্টার রিলিজিয়াাস এন্ড ইন্টার কালচারাল ডায়ালগের সেক্রেটারি জেনারেল ফয়সল বিন আবদুর রহমান বিন মুয়াম্মার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগের সুপ্রিম কাউন্সিল সদস্য শেখ ইউসুফ এসটেজ, লেবাননের দ্রুজ কমিউনিটি প্রতিনিধি শেখ গাস্সান হালাবি, বুরকিনা ফাঁসোর প্রেসিডেন্টের ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা ড. বাউবাকার ডাউকাউরে, প্যারিস মসজিদের গ্রান্ড ইমাম শায়খ জিলাউল বাউজিদি, ইউএই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালকের উপদেষ্টা ড. সাউদ হারেব আল মেহাইরি, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও শ্রম মন্ত্রী ওকানহা ওসমান হাসান, পাকিস্তান ওলামা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান শেখ মোহাম্মদ তাহির আশরাফি, কসোভার গ্রান্ড মুফতি শায়খ নাইম তারভানা, লাহোর আশরাফিয়া ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট শেখ ফজলুর রহীম, ড. শেখ আবদুল্লাহ মোহম্মদ ফারুক, মৌরিতানিয়ার ইসলামিক কালচার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট শেখ আহমদ মোহাম্মদ আলহাফেজ।

কর্ম অধিবেশনে বক্তারা বলেন, ইসলামী সমাজে মত পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু তা কোনভাবেই যাতে সংঘাতে রূপ না নেয় তার জন্য সব পক্ষের মধ্যে সংলাপ হতে হবে।

তারা বলেন, ইসলামি ঐক্যের ভিত্তি হবে কোরআন ও সুন্নাহ। এই দুটির উপর ভিত্তি করে তৈরি শরিয়ার নীতিমালা অনুসৃত হলে কোন সংঘাত সৃষ্টি হবে না। আমাদেরকে অন্যের ভিন্ন মতকে মেনে নিয়ে ঐক্যের সুত্র ধরে এগুতে হবে। অন্যের মত গ্রহণ করাকে কোনভাবেই পরাজয় মনে করা যাবে না।

সম্মেনে বক্তরা আরো বলেন, মুসলিম অধ্যুষিত জনপদগুলো বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সমাজ সংস্কৃতির মধ্যে বিভক্ত। বিভাজনের বহুমাত্রিকতা গ্রহণ করে নিয়ে অন্য সবার সাথে সমঝোতা ও সহমর্মিতার সাথে বসবাস করতে হবে। ঐক্যের সূত্র নিয়ে এগুতে হবে, বিভেদকে তিক্তভাবে ছড়িয়ে দিয়ে বিভক্তি সৃষ্টি কোনভাবেই কাম্য নয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয় মহানবী স. মদিনায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেখানে অন্য ধর্মের অনুসারিদের স্বাধীনভাবে ধর্মপালন ও নিরাপদে বসবাসের অধিকার ছিল। ইসলামী সমাজের অমুসলিমদের নিরাপত্তা ও অধিকারের ব্যাপাওে সে দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে হবে।
সভায় চরমপন্থার ধারণা মোকাবেলার জন্য সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, সুশিক্ষার প্রচার ও প্রসারের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়। বলা হয়, উগ্রবাদিতার বিস্তার ঘটে সঠিক শিক্ষা ও ধারণা না থাকার কারণে। আর উগ্রবাদিতা নিজ নিজ রাষ্ট্র ও সমাজকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীরা সাম্প্রদায়কেন্দ্রীকতা ও চরমপন্থা মোকাবেলার জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা আহ্বান জানানো হয়। বলা হয়, বিভ্রান্তি দূর করতে এবং সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন চিন্তার ইসলামী স্কুলের অনুগামীদের মধ্যে যোগাযোগের কার্যকর চ্যানেল তৈরি করতে হবে।

বিশ্বের ১২৭টি দেশ থেকে ১২৯৯ জন ধর্মীয় একাডেমিক ব্যক্তিত্ব ও নীতি নির্ধারক এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন, ইসলামি ব্যাংকসমূহের শরিয়াহ কাউন্সিল ও বাংলাদেশে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান মওলানা কামাল উদ্দিন জাফরি, শোলাকিয়ার ইমাম, মওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ, কলামিস্ট, টিভি আলোচক ও সাবেক জজ ইকতেদার আহমদ, আহলে হাদিসের সেক্রেটারি জেনারেল শহীদুল্লাহ খান মাদানি, খুলনার জামেয়া মাদানিয়ার অধ্যক্ষ এমদাদ উল্লাহ কাশেমি প্রমুখ।

 


আরো সংবাদ