১৪ নভেম্বর ২০১৮
জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে উন্মুক্ত ব্রিফিং

রোহিঙ্গাদের ভয়ঙ্কর দুর্দশা বন্ধ করতে বিশ্বের প্রতি জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের আহ্বান

মিয়ানমার পরিস্থিতির উপর মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য রাখছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেজ। - ছবি : ইউএন ফটো/ ইভান চনেইেডার

রোহিঙ্গাদের ভয়ঙ্কর দুর্দশা থেকে মুক্তি দিতে বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেজ।

তিনি বলেন, মিয়ানমারে আমরা নিরাপত্তা চাই, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব চাই। আমরা আমাদের বোন, কন্যা ও মায়েদের দুর্দশার সুষ্ঠু ন্যায়বিচার চাই।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার সাম্প্রতিক এক বছর পূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে এক উন্মুক্ত ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ ও জাতিসঙ্ঘ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লর্ড তারিক মাহমুদ আহমাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত ব্রিফিংয়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে হৃদয়বিদায়ক বক্তব্য উপস্থাপন করেন ইউএনএইচসিআরের শুভেচ্ছা দূত ও বিশিষ্ট অভিনেত্রী মিজ্ কেইট্ ব্লানশেট ও ইউএনডিপি’র অ্যাসোসিয়েট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর তেগেগনিঅর্ক গেট্টু।

নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের বাইরে এই সভায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বক্তব্য দেয়।

ইউএনএইচসিআরের শুভেচ্ছা দূত ও বিশিষ্ট অভিনেত্রী মিজ্ কেইট নিরাপত্তা পরিষদে প্রশ্ন রাখেন- আমি একজন মা আর আমি আমার সন্তানদেরকে দেখেছি প্রত্যেকটি উদ্বাস্তু শিশুদের চোখে। আমি আমাকে দেখেছি প্রত্যেকটি উদ্বাস্তু অভিভাবকের ভূমিকায়। কিভাবে একজন মা তার সন্তানকে আগুনে ফেলে দেবার দৃশ্যটি সহ্য করতে পারে?

এসময় তিনি নিরাপত্তা পরিষদে জোর দাবি জানিয়ে বলেন, মিয়নামারকে আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবধকতার মধ্যে আনতে আন্তর্জাতিক কার্যকর সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন।

তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশা লাঘবে বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত সহযোগিতা বাড়াতে নিরাপত্তা পরিষদেও প্রতি আহ্বান জানান।

জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মানবিক সহযোগিতা প্রদানের ক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘের পদক্ষেপসমূহের টেকসই বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো উদারভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিবে।’

সদ্য প্রয়াত জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে রাষ্ট্রদূত মাসুদ বলেন, আমরা যদি কফি আনান কমিশনের পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে পারি, তবেই তার বিদেহী আত্মার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন।

জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব গত জুলাই মাসে তার কক্সবাজার সফরের সময় বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের যে সকল মর্মস্পর্শী বর্ণনা শুনেছেন তা এই সভায় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সমস্যা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে না। নিরাপত্তা পরিষদ প্রেসিডেন্সিয়াল স্টেটমেন্ট গ্রহণে একতা দেখিয়েছিল, এই একতা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন যদি আমরা যথাযথ কাজের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দাবী পূরণ করতে চাই।’

কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার পূর্ণ বাস্তবায়নের কথা পুনরুল্লেখ করেন গুতেরেজ।

জাতিসঙ্ঘ এবং এর বিভিন্ন সংস্থাসমূহকে রাখাইন প্রদেশে বাধাহীন প্রবেশাধিকার দেওয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব। তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য পরিস্থিতি মোটেই উপযুক্ত নয়। এজন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

মিয়ানমারের উপর গত সোমবার প্রকাশিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির দেয়া সুপারিশের আলোকে মিয়ানমারকে গণহত্যার জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রতিও জোর আরোপ করে মহাসচিব বলেন, ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য জবাবদিহীতা অপরিহার্য।’

একবছর ধরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার ব্যক্তিগত পদক্ষেপসহ জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলোর উল্লেখ করেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব।


আরো সংবাদ