১৪ নভেম্বর ২০১৮

ঝুঁকিতে ৮০ কোটি মানুষের জীবন

ঝুঁকিতে ৮০ কোটি মানুষের জীবন - সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় অন্তত ৮০ কোটি মানুষ ক্ষতির মুখে পড়বে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কয়েক দশকের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে সবচেয়ে বেশি। নেমে যেতে পারে জীবনযাত্রার মানও। এই ক্ষতি ভারতে সব থেকে বেশি বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত 'সাউথ এশিয়া'স হট-স্পটস' শীর্ষক প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোকে হটস্পট হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েক কোটি মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়বে। যার মধ্যে বাংলাদেশের রয়েছে ১৩ কোটি মানুষ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ভারত।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে আসে।

বিশেষ করে দেশটির মধ্যাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিমে ক্ষতির শঙ্কা সব থেকে বেশি। মহারাষ্ট্র রাজ্য, ছত্তিশগড় এবং উত্তর প্রদেশের অবস্থা দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর দেশ ভারতে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ক্ষতি প্রতিবেশী দেশগুলোকেও সমানভাবে ভোগাবে।

ভারত পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. ফাইয়াজ এ. খুদসার বলেন, 'কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে হবে। পরিবেশ নিয়ে আমরা অনেক তথ্যই পাই, কিন্তু তা কাজে লাগাই না। ফলে ভবিষ্যতে পরণতি ভোগ করতে হবে, এটাই স্বাভাবক। জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে নজর দেয়ার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা নিয়েও ভাবা চাই। এর জন্য প্রথমত গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে।' 

গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সাথে এরইমধ্যে পানির সংকট দেখা দিয়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। এতে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে অভিন্ন নদ-নদীর পানি বণ্টন সমস্যা আগামীতে প্রকট হতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের।

মারাত্মক ঝুঁকিতে ১২০ কোটি শিশু
আল-জাজিরা

দারিদ্রতা, লিঙ্গ বৈষম্য ও সংঘাত-সহিংসতার বলি হয়ে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে বিশ্বের প্রায় ১২০ কোটি শিশু। তারা বেড়ে উঠার জন্য স্বাভাবিক ও অনুকূল পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিশু-অধিকার বিষয়ক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান সেভ দ্য চিলড্রেনের এর গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে।

১ জুন আন্তর্জাতিক শিশু দিবসকে সামনে রেখে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সেভ দ্য চিলড্রেন। এতে বলা হয়েছে, দারিদ্রতা, লিঙ্গ বৈষম্য ও সংঘাত-সহিংসতার যে কোনো একটি দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন বিশ্বের প্রায় ১২০ কোটি শিশু। অন্যদিকে তিনটি মারাত্মক সমস্যা নিয়েই বেড়ে উঠছে ১৫ কোটি ৫৩ লাখ শিশু।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দারিদ্র্য কবলিত দেশগুলোতে ঝুঁকির মুখে বাস করছে প্রায় ১০০ কোটি শিশু, যুদ্ধ ও সংঘাতে ২৪ কোটি শিশু এবং লিঙ্গ-বৈষম্যের মধ্যে বেড়ে উঠছে ৫৭ কোটি ৫০ লাখ কন্যাশিশু। এদিকে শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি ৫৮টি দেশে অবনতি ঘটেছে। ১৭৫টি দেশে জরিপ চালিয়ে এ প্রতিবেদন করা হয়েছে।

শিশুরা কতটুকু মৃত্যু ঝুঁকির মুখে আছে, অপুষ্টি, শিক্ষার অভাব, বাল্যবিবাহ এবং শিশু শ্রমের উপর ভিত্তি করে দেশগুলোর র‍্যাংকিং নির্ধারণ করা হয়েছে। সূচক অনুসারে শিশুদের অবস্থার সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে সিঙ্গাপুর ও স্লোভেনিয়াতে। এই দুটি দেশে র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে যৌথভাবে অবস্থান করছে। পরে রয়েছে নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ড।

সূচকের একেবারে নিচের সারিতে হয়েছে নাইজার, মালি ও সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক। তালিকার একেবারে নিচের দশটি দেশের মধ্যে আটটিই পশ্চিম ও সেন্ট্রাল আফ্রিকার। সেভ দ্য চিলড্রেনের সূচকে উঠে এসেছে, বিশ্বে অর্থনীতি ও সামরিক দিক দিয়ে পরাশক্তি হলেও যুক্তরাষ্ট্র (৩৬), রাশিয়া (৩৭) ও চীন (৪০) পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোর পেছনে রয়েছে।

দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ আর্সেনিক ঝুঁকিতে

ঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত এখনো দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ। রাষ্ট্রের নানা উদ্যোগের পরও এখনো আর্সেনিকের ঝুঁকিতে ৪৪ শতাংশ এলাকা, যেখানে আর্সেনিকের মাত্রা ৬০ শতাংশেরও বেশি বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এলজিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনগণ পানীয় জলের ক্ষেত্রে আর্সেনিক ঝুঁকিতে রয়েছে। 

স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্র বলছে, গত শতাব্দীর শেষ নাগাদ বাংলাদেশ ভূগর্ভস্থ পানির উৎস ব্যবহারের মাধ্যমে নলকূপ প্রযুক্তির দ্বারা পানি সরবরাহের কভারেজ ৯৭ শতাংশ অর্জনে সক্ষম হয়, যা ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে সর্বোচ্চ। কিন্তু নব্বই দশকের শুরুর দিকে ভূগর্ভস্থ পানিতে বিশেষত অগভীর স্তরে আর্সেনিকের উপস্থিতি শনাক্তকরণ এই প্রশংসনীয় সাফল্যকে ম্লান করে দেয় এবং যা নিরাপদ পানি সরবরাহ কার্যক্রমকে ৯৭ শতাংশ থেকে ৭৪ শতাংশে নামিয়ে আনে। তখন দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১টিতেই খাবার পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের এক জরিপে (২০১৫) বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৫৯ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এ জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। উল্লেখ্য, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গত ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১১ সালের মধ্যে শতভাগ মানুষকে বিশুদ্ধ পানি সুবিধার আওতায় আনার অঙ্গীকার করে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে দলটি আবারো ক্ষমতায় আসার সময় ২০২১ সালের মধ্যে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর ঘোষণা দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ১৩ মন্ত্রণালয়ের ৩৫টি সংস্থা নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে কাজ করছে। কিন্তু এদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকট আকার ধারণ করায় অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। ফলে জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশ মানহীন পানি পান করে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। ২০০৯ সালে জাইকা-ডিপিএইচই একটি সমীক্ষা চালায় ৫৫টি জেলার ৩০১টি উপজেলার দুই হাজার ৯৯৮টি ইউনিয়নে।

ওই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এক হাজার ২৯০টি ইউনিয়নে আর্সেনিক দূষণের মাত্রা ৬০ শতাংশের বেশি। একটি প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে আর্সেনিক ঝুঁকি নিরূপণের লক্ষ্যে মোট তিন হাজার ২০০টি ইউনিয়নের বা পুরো বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ এই আর্সেনিক শনাক্তকরণ করা হবে। মোট এক হাজার ৯৯০ কোটি ৯৫ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের কাছে। বলা হচ্ছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে প্রায় দুই কোটি মানুষ আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানি পেতে সক্ষম হবে। প্রকল্প এলাকায় প্রতি ৭৫ জনের জন্য একটি নিরাপদ পানির উৎস নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। 

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ পানি সরবরাহ কার্যক্রমের অগ্রগতির হার বিবেচনায় দেখা গেছে ১৯৯০-২০১৫ সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ নয় শতাংশ মানুষ বিশুদ্ধ পানির আওতায় এসেছে। সেই হিসাবে এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ এ সুবিধার বাইরে আছে। আর দেশের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ১২ শতাংশ পাইপ লাইনের মাধ্যমে শোধনকৃত পানির সুবিধা পাচ্ছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই শহরের বাসিন্দা। দেশের কিছু গ্রামীণ জনপদেও পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে তার হার ১ শতাংশেরও কম। মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে।

 


আরো সংবাদ