২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে যা বললো জাতিসঙ্ঘ

রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে যা বললো জাতিসঙ্ঘ -

রোহিঙ্গাদের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখার জন্য জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি দল বাংলাদেশে দুই দিনের সফর শেষে এখন মিয়ানমারে পৌঁছেছেন। বাংলাদেশ ছেড়ে যাবার আগে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের দলটি আবারো বলেছে, রোহিঙ্গা সঙ্কট দ্রুত সমাধান হবে না।

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংক্ষিপ্ত এক সংবাদ সম্মেলনে নিরাপত্তা পরিষদে কুয়েতের প্রতিনিধি মানসুর আয়াত আল-ওতাইবি বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট এভাবে চলতে পারে না। তবে একই সাথে তিনি বলেছেন যে এ সঙ্কট খুব সহজে ও দ্রুত সমাধান হবে না।

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেবার বিষয়ে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার যে চুক্তি করেছে সেটি বাস্তবায়নের উপর জোর দিয়েছেন কুয়েতের প্রতিনিধি।

তিনি বলেন, আমরা মিয়ানমার সরকার এবং শরণার্থীদের এ বার্তা দিতে চাই যে এ সঙ্কটের সমাধান খুঁজে বের করার জন্য আমরা ওয়াদাবদ্ধ। আমরা মনে করছি না যে এ সঙ্কট খুব সহজে এবং দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। যত দ্রুত সম্ভব সঙ্কট সমাধানের জন্য এখানে সকল পক্ষকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। এ বিষয়ে আমরা চুপ থাকতে পারি না।

সংবাদ সম্মেলনে কুয়েতের প্রতিনিধি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি পেরুর প্রতিনিধি গুস্তাবো আদোলফো মেজা কাদরা এবং জাতিসংঘে ব্রিটেনের স্থায়ী প্রতিনিধি ক্যারেন পিয়ার্স। নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা নিয়ে অতিমাত্রায় আশাবাদী না হতে বলেছেন কুয়েতে রাষ্ট্রদূত।

কুয়েতের প্রতিনিধি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদ কী করতে পারে সে বিষয়ে আমরা প্রত্যাশা বাড়াতে চাই না। বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে সেটি যাতে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায় সেজন্য আমরা সব পক্ষকে সহায়তা করতে চাই। আমরা এ সঙ্কটের একটা সমাধান দেখতে চাই। কিন্তু সমাধান দ্রুত আসবে না। এর জন্য সময় লাগবে। এটি আমাদের এজেন্ডায় থাকবে এবং আমরা এটিকে প্রাধান্য দিচ্ছি।

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিল আগেই বলেছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর যেভাবে সহিংসতা চালানো হয়েছে সেটি জাতিগত নিধন এবং গণহত্যার শামিল। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা এখনই সে ধরনের উপসংহারে পৌঁছাতে রাজী নন।

জাতিসঙ্ঘে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত ক্যারেন পিয়ার্স বলেন, সেটি নির্ধারণ করার জন্য একটি যথাযথ বিচারিক এবং আধা-বিচারিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সেটার জন্য আইনের আলোকে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ লাগবে। আইনের দৃষ্টিতে সেটি গ্রহণযোগ্য হতে হবে। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন সে কাজ করে না। তারা তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করে এবং সেটি পর্যালোচনা করে। কিন্তু সেটি আইনের দৃষ্টিতে নির্ধারিত হয় না।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব তদন্ত করছে। আমরা মনে করতে পারি যে অনেক দেরিতে হলেও কিছু একটা করছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সাথে আমরা কথা বলতে চাই। এক্ষেত্রে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য তারা কী করছে সেটা আমরা দেখতে চাই, বলেন তিনি।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের চীন এবং রাশিয়া মিয়ানমারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। এ কথা সবার জানা।

বাংলাদেশ ছাড়ার আগে নিরাপত্তা পরিষদের দলটি যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করেছেন সেখানেও তিনি রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে চীন, রাশিয়া এবং ভারতের জোরালো ভূমিকা রাখার জন্য আহবান জানিয়েছেন।

চীন এবং রাশিয়া যদি তাদের অবস্থান পরিবর্তন না করে তাহলে নিরাপত্তা পরিষদ আদৌ কিছু করতে পারবে?

এমন প্রশ্নে জাতিসঙ্ঘে কুয়েতের রাষ্ট্রদূত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চীন এবং রাশিয়ার দিক থেকে আমি কোন প্রতিবন্ধকতা দেখি না। তারা নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য। তারাও আমাদের সাথে আছে। তারাও এ সঙ্কটের সমাধান দেখতে চায়।

এ সফর থেকে বাংলাদেশ কী আশা করতে পারে?
নিরাপত্তা পরিষদের দলটির সদস্যরা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন সেগুলো বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের খুব একটা আশাবাদী হবার কারণ দেখা যাচ্ছে না- এমনটাই মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস।

নিরাপত্তা পরিষদের দলটি বেশ পরিষ্কার করেই বলেছে যে দ্রুত সমাধানের চাবিকাঠি নেই।

রোহিঙ্গা সঙ্কট শুরুর পর প্রায় আট মাস কেটে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আর কতদিন সময় লাগবে? সে বিষয়ে কিছু বলেনি প্রতিনিধি দলটি। তাছাড়া তাদের তরফ থেকে দ্বিপক্ষীয় সমাধানের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু নাসিম ফেরদৌস মনে করেন, দ্বিপক্ষীয় সমাধানের সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে।

মিস ফেরদৌস বলেন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় যদি কাজ হতো তাহলে তো তারা কিছু-কিছু হলেও ফেরত নিতো। সেটা না করে তারা নাটকীয়ভাবে একটা পরিবারকে ফিরিয়ে নিয়েছে। এটা তো হাস্যকর ব্যাপার। দ্বিপাক্ষিক-ভাবে কোন সমস্যার সমাধান হবে বলে আমার মনে হয় না।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো; জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিল এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বলেছে, রাখাইনে যা ঘটেছে সেটি জাতিগত নিধন এবং গণহত্যার শামিল। এমনকি, জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবও সে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধি দলটি বিষয়টিকে সেভাবে দেখছে না।

যদি তারা বিষয়টিকে সে দৃষ্টিতে না দেখে তাহলে নিরাপত্তা পরিষদ কতটা ভূমিকা রাখবে সেটি নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামান মনে করেন, নিরাপত্তা পরিষদের দলটির বাংলাদেশ সফর সঙ্কট সমাধানে আশা জাগাতে পারে।

শাহিদুজ্জামান মনে করেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের পর চীন এবং রাশিয়ার মনোভাব বদলে যেতে পারে। তিনি বলেন, তারা যখন নিউইয়র্কে ফিরে যাবে তখন হোস্ট গভর্মেন্টকে (নিজ-নিজ দেশের সরকার) তারা বিষয়টি জানাবেন। এরপর তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নতুন করে চিন্তা করতে বাধ্য হবে।

এই মুহূর্তে খুব বেশি আশাবাদী না হওয়াকে ভালো বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক। তিনি মনে করেন, নিরাপত্তা পরিষদ বাস্তব-ধর্মী অবস্থান নিয়েছে। তারা আমাদের খুব বেশি আশাবাদী হতে মানা করেছে, এ অবস্থানটা অত্যন্ত বাস্তবভিত্তিক, বলছিলেন অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান।

তবে নাসিম ফেরদৌসের সাথে একটি বিষয়ে তিনিও একমত। সেটি হচ্ছে- মিয়ানমারের সাথে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের আর কোন আশা নেই।


আরো সংবাদ