০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

বার্ধক্য ও বিষণœতা

-

A sound mind lives in a sound body একটি সুস্থ মন বাস করে একটি সুস্থ দেহের ওপর। এর মানে হচ্ছে দেহ ও
মনের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। দেহের অসুখ হলে আমরা যাই ডাক্তারের কাছে। কিন্তু মনের অসুখ হলে
আমরা সেটা চেপে রাখার চেষ্টা করি যা ঠিক নয়। অত্যধিক বিষণœতা মনের একটি দুর্বল ও কষ্টকর
মুহূর্তের অনুভূতি যার জন্য উচিত মানসিক ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া। লিখেছেন ডা: রুমানা চৌধুরী

পৃথিবীজুড়ে যে ভয়াবহ হুজুগে দৌড়ে চলার নীতি চলছে, তার সাথে তাল মেলাতে না পেরে অনেকেই বিষণœতা নামক আবেগের শিকার হচ্ছে। তাই পৃথিবীব্যাপী চলছে বিষণœ মন, বিষণœœ পরিবেশের অত্যাচার। এই বিষণœœতা সাধারণ কতগুলো আবেগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তবে বিষণœœ আবেগ যদি এতটাই হয় যে, এটি সাধারণ কাজকর্ম বা অন্যান্য ক্রিয়াকর্মের বাধা সৃষ্টি করে বা এর মাধ্যমে ব্যক্তিজীবন ব্যাহত হয়, তখন এই বিষণœ আবেগকে আমরা বিষণœœতা বলে থাকি। বিষণœ আবেগের প্রকাশ ১৫ দিন থাকলে এবং এই ব্যক্তির কাজে ব্যাঘাত ঘটলে এই বিষণœœতা রোগের চিকিৎসা নেয়া দরকার।
সারা বিশ্বে এখন চলছে বিভাজনের রীতি। নিজস্ব সংস্কৃতি, থেকে বিচ্ছিন্নতা, মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা, পরিবারের ভাঙন এগুলো সবই চলছে আধুনিক এই যুগে। তাই জীবনের চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আজ যারা গোধুলি লগ্নে পা দিয়েছেন, জীবন সায়াহ্নে পৌঁছেছেন, তাদের প্রতি মনোযোগ দেয়ার জন্য অন্যদের সময় কোথায়? এই জীবনযুদ্ধে লড়াই করতে করতে কেউ জয়লাভ করে, কেউ হেরে যায়। তাই জীবনের লড়াই থেকে অনেকেই যখন লাভ-লোকসানের অঙ্ক কষে তখন দেখা যায়, জীবনের অনেকটা পথ ফাঁকা ও নিষ্ফল রয়ে গেছে। তখন তারা হাঁপিয়ে ওঠে, বিষণœœতা রোগে ভোগে। বিশাল এই জীবন যাপনে নানা রকম দুঃখের অনুভূতি, অনুভব করা স্বাভাবিক। যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি, তাদের আমরা প্রবীণ ও যাদের বয়স ৭০ বছরের বেশি, তাদের আমরা বার্ধক্য ধরলে দেখা যায়; তাদের জীবনে নানা রকম সুখ-দুঃখের অনুভূতি বিরাজমান।
কারণ জীবনের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে নানা রকম দুঃখজনক ঘটনার সম্মুখীন আমাদের হতে হয়। যার যত বয়স তার ক্ষেত্রে ঘটনার বাহুল্য বেশি থাকে। তাই বার্ধক্য বা প্রৌঢ় জীবনে বিষণœœতা উপসর্গ বা রোগ আকারে তত বেশি আসতে পারে। বিষণœœতার অন্য একটি রূপ রয়েছে তা হলো আক্রান্ত ব্যক্তি তার সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়, তার আর্থিক উপার্জন বহুলাংশে কমে যায়, বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং তার নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু ঘটতে পারে। প্রতি ৩০ জনে একজন বয়স্ক ব্যক্তি এই বিষণœœতা রোগে ভুগতে পারে, যার চিকিৎসা দেয়া একান্ত প্রয়োজন।

বিষণœœতা রোগে কী কী হয়?
দুঃখবোধ অনুভব করা, কিংবা মন খারাপ লাগা বিষণœœতার প্রধান উপসর্গ। এ ছাড়া জীবনের উৎসাহ হারিয়ে ফেলা, আগে যেসব ব্যাপারে আপনি আগ্রহ প্রকাশ করতেন, এখন সেগুলো উপভোগ করতে পারেন না, কোনো কারণ ছাড়াই অতি ক্লান্তি, খাবার রুচি কমে যাওয়া, কোনোভাবে বিশ্রাম করতে না পারা, অস্থিরতা লাগা, অত্যধিক দুশ্চিন্তা করা, চেনা লোকদের এড়িয়ে চলা, অল্পতেই রাগ কিংবা উত্তেজিত হওয়া, ঘুমের সমস্যা, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা, নিজেকে অন্যের বোঝা মনে করা, মনোযোগের অসুবিধা, যৌন অনুভূতি কমে যাওয়া ও আত্মহত্যা করার চিন্তা মাথায় আসা।
অনেক শারীরিক রোগের উপসর্গ রয়েছে যা বিষণœœতার মতোই প্রকাশ পায়। যেমন হার্টের অসুখ, বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার, থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের সমস্যা এগুলোতে জৈবরাসায়নিক পরিবর্তন ঘটা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের মানসিক উপসর্গের সৃষ্টি হয় যা দেখতে একেবারে বিষণœœতা রোগের মতো। বয়স্ক লোকদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি আরো প্রকট হয়ে ওঠে। শরীরে বাসা বাঁধে বিভিন্ন ধরনের জরাব্যাধি। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হয়ে যায় কাহিল, তখনই বিষণœœতা আরো জেঁকে ধরে। অনেক প্রবীণ ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগে থাকে, এর সাথে যদি বিষণœœতা রোগটি থাকে তাহলে সার্বিক অসুস্থতার মাত্রা আরো বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে শরীরের মূল অসুখটির চিকিৎসা করার পাশাপাশি বিষণœœতা রোগের চিকিৎসা করাও প্রয়োজন। বার্ধক্য স্মৃতিশক্তির ওপর একটি ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে, ছিন্নভিন্ন করে দেয় স্মৃতিশক্তির বিভিন্ন চালিকাগুলোকে। এর মাত্রা ক্ষুদ্রতর থেকে বৃহত্তর হতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে নানাবিধ উৎপাদিত পদার্থ বা ‘মেটাবলিক প্রোডাক্ট’ মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তির ভাণ্ডারে চাপ সৃষ্টি করে এবং স্মৃতি নাশ করে দেয়।
বিষণœতা তথা অন্যান্য শারীরিক অসুবিধায় মানুষের স্মরণশক্তিতে যে ঘাটতি ঘটে তাকে আমরা ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশতা বলতে পারি। তবে বিষণœœতা অবস্থায় স্মৃতিভ্রংশতা চিকিৎসা করালে সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। একাকিত্ববোধ করা বিষণœœতা রোগের একটি বিরাট উপসর্গ। অনেক ক্ষেত্রে এটি একমাত্র উপসর্গ আকারে থাকতে পারে। পাশ্চাত্ত্য দেশগুলোতে আমাদের দেশের তুলনায় প্রবল। কারণ পারিবারিক বন্ধন আমাদের মতো দেশগুলোতে অত্যন্ত প্রবল এবং সুদৃঢ় যা পাশ্চাত্ত্য দেশগুলোতে একেবারে দেখাই যায় না। তাই দেখা যায় বিষণœœ ব্যক্তি বয়সকালে একাকিত্বে ভোগে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

আপনি কখন বুঝবেন আপনার সাহায্য দরকার
আপনার অনুভূতিগুলো যখন আপনি যা আশা করেছিলেন তার থেকে খারাপ থাকে, মন খালি খালি লাগে ন্যূনতম ১৫ দিন ধরে, জীবন যাত্রার প্রক্রিয়ায় নানা রকম বাধা সৃষ্টি হয়, লোকজনের সাথে মেলামেশা করতে না চাইলে, জীবনকে অর্থহীন মনে করলে, নিজের ক্ষতি নিজে করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে, এমনকি আত্মহননের ইচ্ছা মাথায় এলে। বার্ধক্যে আক্রান্ত বিষণœœ ব্যক্তি যেহেতু নানারূপ শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত থাকতে পারে, তাই বিষণœœতা রোগের পাশাপাশি শারীরিক অসুস্থতার জন্যও চিকিৎসা করানো প্রয়োজন।

বিষণœœতা কেন হয়?
আমরা যখন বিষণœœ হই তখন নানা রকম পারিপার্শ্বিক কারণের জন্য নিজেকেই দোষারোপ করি। বিষণœœতায় আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তা-চেতনায় নেতিবাচক ভাবনাগুলো বেশি প্রকাশ পায় এবং নেতিবাচক দিক নিয়ে চিন্তিত থাকে। বিষণœœতা কেন হয় এর কারণ এখনো অজানা। তবে কতগুলো কারণ নিয়ে আলোচনা করা যায়Ñ
দুঃখজনক ঘটনা : কারো জীবন সঙ্গিনীর মৃত্যু বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মৃত্যু বা অন্য কোনো আঘাতজনিত কারণ বিষণœœতা রোগের সৃষ্টি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে, নারীরা পুরুষের তুলনায় তিনগুণ বেশি বিষণœœতা রোগে ভুগে থাকে।
পারিবারিক বা বংশগত কারণ : বিষণœœতা রোগ পরিবারের মধ্যে বাবা বা মায়ের থাকলে সন্তানদের হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এটি পরিবারের মধ্যে বংশপরম্পরায় চলে আসছে। আগে যদি কোনো রোগী বিষণœœতা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে তবে পরবর্তীতেও তার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
শারীরিক অসুস্থতা : বার্ধক্যকালের বিভিন্ন শারীরিক অসুবিধার কথা আগেই আলোচিত হয়েছে। এর মধ্যে নানা রকম স্নায়ুরোগের কারণ, পারকিনসনিজম, স্ট্রেস, ক্যান্সার, থাইরয়েড সমস্যা ইত্যাদি থেকে বিষণœœতা রোগ সৃষ্টি হতে পারে।
ওষুধ : বিভিন্ন ধরনের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বিষণœœতা রোগের সৃষ্টি হতে পারে।

নিজেকে কিভাবে সাহায্য করবেন?
আপনি নিজে প্রবীণ বলে বিষণœœ রোগে আক্রান্ত হবেন ও বিষণœœ হয়ে থাকবেন এর কোনো মানে নেই। বার্ধক্য জীবনের এক নিশ্চিত অধ্যায় এবং বার্ধক্যকে নিজের দুর্বলতা না ভেবে জীবনের উপভোগের অন্য এক পন্থা মনে করতে হবে। বাইরে বের হোন, বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার যথাযোগ্য চিকিৎসা নিন, মনের মধ্যে হীনম্মন্যতা পরিত্যাগ করে উৎফুল্লভাব আনার চেষ্টা করুন, বাসায় একাকী বন্দী না থেকে বেরিয়ে পড়–ন, ঘুরে আসুন কোথাও থেকে। প্রয়োজনমাফিক আহার করুন, যতটুকু আহার করছেন তাতে যেন পুষ্টি উপাদান থাকে, ভিটামিন কিংবা মিনারেলস আছে কি না এদিকে লক্ষ রাখুন। শুকনো চকোলেট বা বিস্কুটজাতীয় খাবার পরিত্যাগ করুন, আঁশজাতীয় খাবার বেশি করে খান, শর্করাজাতীয় খাবার কম করে খাওয়ার চেষ্টা করুন। নিজে নিজেকে বলুন, আপনি সুস্থ আছেন, সুস্থ থাকবেন। মনের ভেতরের আবেগ দমিয়ে না রেখে কারো কাছে প্রকাশ করুন বন্ধু কিংবা স্ত্রী যে কারো সাথে। কোনোরকম মদ্যপান করবেন না, কিংবা নিজে থেকে কোনো রকম ওষুধপত্র সেবন করবেন না। প্রয়োজনমাফিক ঘুম দরকার ও কিছুটা শারীরিক ব্যায়ামের প্রয়োজন রয়েছে। শারীরিক ব্যায়ামের মধ্যে ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে পাঁচদিন হাঁটা অত্যন্ত প্রয়োজন।

বিষণœœতার চিকিৎসা
ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কাউন্সেলিং বা সাপোর্টিভ সাইকোথেরাপি, গ্রুপ থেরাপি আপনার জন্য প্রয়োজন ও উপকারী হতে পারে। ওষুধের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পন্ন ওষুধ কেবল বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত সেবন করা দরকার। জীবন ফুলের বিছানা নয়, জীবন কণ্টকময়। তাই ভেঙে পড়বেন না। জীবনে আশা ধরে রাখুন, জীবনের এই নতুন পরিবর্তনকে ইতিবাচক ও আনন্দের চোখে দেখুন, সুস্থ থাকুন।

 


আরো সংবাদ

সকল




Paykwik Paykasa
Paykwik