১৬ ডিসেম্বর ২০১৯
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস আজ

প্রতি রোগীর পেছনে ব্যয় ৫৩ হাজার টাকার বেশি

প্রতি রোগীর পেছনে ব্যয় ৫৩ হাজার টাকার বেশি - ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর ৬.৪ শতাংশ হয়ে থাকে ডায়াবেটিসের কারণে। অপর দিকে দেশের ৮০ লাখ মানুষ ভুগছে ডায়াবেটিসে। একজন ডায়াবেটিক রোগীর ওষুধ ও ইনসুলিনসহ চিকিৎসার পেছনে বছরে ব্যয় হয়ে থাকে ৫৩ হাজার টাকার বেশি। সচ্ছল পরিবারের পক্ষে এ ব্যয় করা সম্ভব হলেও বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের পক্ষে এটা সম্ভব নয়। টাইপ-ওয়ান ডায়বেটিসের জন্য ইনসুলিন অপরিহার্য হলেও টাইপ-টু ডায়বেটিস প্রতিরোধযোগ্য। নিয়ম মেনে জীবন-যাপন করতে পারলেই টাইপ-টু ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। ডায়াবেটিসের এমনই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আজ ১৪ নভেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এবার এ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘আসুন, প্রতিটি পরিবারকে ডায়াবেটিস মুক্ত রাখি’।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে অবশ্যই ওষুধ, নিয়ন্ত্রিত খাবার এবং শরীরচর্চা প্রয়োজন। নিয়মানুবর্তিতা না হলে ডায়াবেটিক রোগীর যেকোনো সময় হতে পারে হার্ট অ্যাটাক, ব্রেইন স্ট্রোক ও কিডনি বিকল। অন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং যেকোনো সময় স্নায়ুতন্ত্র (নার্ভাল সিস্টেম) ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৬ সালে রাজধানীর একটি বস্তিতে ডায়াবেটিস আছে কি না জরিপ করে। এতে ২০০০ বস্তিবাসী অংশগ্রহণ করেন। জরিপে দেখা গেছে, দুই হাজারের মধ্যে ১৯ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এদের ১৫.৬ শতাংশ পুুরুষ ও ২২.৫ শতাংশ নারী। রাজধানীতে ডায়াবেটিস বৃদ্ধি পাচ্ছে এই জরিপে এটাই প্রমাণিত। কেন ডায়াবেটিস হয়? অগ্নাশয় প্রয়োজনীয় ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। আবার শরীরে উৎপাদিত ইনসুলিন কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে না পারলেও মানুষের ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। এটা হয়ে থাকে অস্বাস্থ্যকর খাবার, স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রম না করা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে জন্মগত ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে।

অধ্যাপক আজাদ খান বলেন, কম ওজনে জন্ম নেয়া শিশু পরে ডায়াবেটিসে ভুগে থাকে। সাধারণত আড়াই কেজি ওজনের কম হলে ওই শিশুকে কম ওজনের শিশু বলা হয়ে থাকে। ‘ন্যাশনাল লো বার্থওয়েট সার্ভে-২০১৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২২.৬ শতাংশ শিশু কম ওজন নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। কম ওজনবিশিষ্ট শিশু জন্মের সাথে বাল্যবিয়ে, মায়ের অপুষ্টির সম্পর্ক রয়েছে বলে জানান অধ্যাপক ডা: এ কে আজাদ খান। গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করা হলে জন্ম নেয়া শিশু পরে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারে। ডায়াবেটিস ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ার আরেকটি বড় কারণ হলোÑ অপরিকল্পিত নগরায়ন। এর ফলে অধিবাসীদের শরীর চর্চার সুযোগ সীমিত থাকে। তা ছাড়া শহরবাসী এখন আর পরিশ্রম করতে চান না। সামান্য দূরত্বে যেতেই মানুষ গাড়ি অথবা রিকশা ব্যবহার করে থাকেন। অথচ হেঁটে ওই রাস্তাটুকু অতিক্রম করা যায়। এমনকি আজকাল গ্রামীণ জনপদেও দেখা যায় সামান্য পথ অতিক্রমেও মানুষ রিকশা ব্যবহার করছেন।
এ ছাড়া মানুষ বিশেষ করে তরুণ সমাজ ফাস্টফুড সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। স্কুলের টিফিনেও ছাত্রছাত্রীরা বার্গার, পিজা, স্যান্ডউইচ খাচ্ছে এবং এসব খাবারের সাথে থাকছে কোমল পানীয়।
অধ্যাপক আজাদ খান বলেন, বেশি করে চর্বি জাতীয় খাবার ও চিনি গ্রহণ এবং বিপরীতে কোনো প্রকার শারীরিক পরিশ্রম না থাকলেও উচ্চ মাত্রার ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। উন্নত দেশের কোথাও স্কুলের পাশে কোনো ফাস্টফুডের দোকান প্রতিষ্ঠার অনুমতি পায় না, কিন্তু বাংলাদেশে এ ব্যাপারে কোনো নীতিমালা নেই।

একবার ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে গেলে তা থেকে মুক্তি নেই। এ ঝুঁকি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং এটা খুবই ব্যয়বহুল।
আইসিডিডিআরবি ২০১৬ সালের এক জরিপ থেকে জানা যায়, একজন সুস্থ মানুষের চেয়ে একজন ডায়াবেটিক রোগীকে দ্বিগুণের চেয়ে বেশি সময় হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়, শুধু ডাক্তার দেখাতে হয় ১.৩ গুণ বেশি এবং সুস্থ মানুষের চেয়ে ৯.৭ গুণ বেশি ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। আইসিডিডিআরবির গবেষণাটিতে দেখানো হয়েছে, একজন ডায়াবেটিসমুক্ত মানুষের চেয়ে একজন ডায়াবেটিক রোগীকে বছরে ৬.১ গুণ বেশি অর্থ চিকিৎসায় ব্যয় করতে হয়। একজন ডায়বেটিক রোগীকে বছরে ৬৩৫ ডলার খরচ করতে হয় আর সুস্থ মানুষকে চিকিৎসার পেছনে খরচ করতে হয় ১০৪ ডলার।
অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, ডায়াবেটিস হলে ওষুধ লাগবেই। স্ট্রোক হলে, স্নায়ুতন্ত্র ও কিডনি নষ্ট হয়ে গেলে তাদের ভোগান্তি বেড়ে যায় অনেক। একই সাথে আর্থিক ব্যয়ও বেড়ে যায় অনেক গুণ। টাইপ-টু ডায়াবেটিস প্রতিরোধযোগ্য। শারীরিক পরিশ্রম করলে এবং খাবার নিয়ন্ত্রণ করে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চললে ইনসুলিন ছাড়াও বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু টাইপ-ওয়ান ডায়াবেটিস জেনেটিক। এটা হলে ইনসুলিন ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। কারণ টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিক রোগীদের শরীরে প্রয়োজনীয় ইনসুলিন তৈরি হয় না। ইনসুলিনের প্রাপ্তি এখন একটি মানবাধিকারের বিষয়। যারা ইনসুলিন কিনতে পারে না তাদের জন্য বিনামূল্যে ইনসুলিন সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের উচিত টাইপ-ওয়ান ডায়াবেটিক রোগীদের বিনামূল্যে ইনসুলিন সরবরাহ করা।
বিএমজে জার্নালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাউনিয়াবাঁধ বস্তিবাসী নারীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ছিল ২২.৫ শতাংশ এবং পুরুষের মধ্যে ১৫.৬ শতাংশ। ডায়াবেটিসের এ হার জাতীয় পর্যায় থেকেও দ্বিগুণ। জাতীয় পর্যায়ে ৮.৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৭.৪ শতাংশ নারী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। একই গবেষণায় বস্তিবাসীদের মধ্যে হাইপারটেনশনে (উচ্চ রক্তচাপ) ভুগছে এমন মানুষের সংখ্যা মোটেও কম নয়। বস্তিবাসী নারীদের মধ্যে হাইপারটেনশন ছিল ২০.৭ শতাংশ এবং পুরুষের মধ্যে ১৮.৬ শতাংশ।

ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে নগরের বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে ডায়াবেটিস মাপা, বারডেম মিলনায়তনে আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর। এ ছাড়া নগরীর ইনসাফ বারাকাহ হাসপাতাল বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পে আগত রোগীদের চিকিৎসা ও পরামর্শ দেবেন ডায়াবেটিস, হরমোন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা। ক্যাম্পে নিবন্ধিত রোগীদের বিনামূল্যে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা হবে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফিতে ৫০ শতাংশ ছাড় দেয়া হবে।


আরো সংবাদ




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik