১৮ অক্টোবর ২০১৯

ডেঙ্গু জ্বরের ব্যাপারে সচেতন হোন

-

ডেঙ্গু জ্বর একটি মশাবাহিত ও ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। ডেঙ্গু ভাইরাস দিয়ে এ জ্বর হয়। সাধারণত ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পাঁচ-ছয় দিন পরই ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।
লিখেছেন অধ্যাপক ডা: মো: শহীদুল্লাহ্
ডেঙ্গু জ্বর হলে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি জ্বর হতে পারে। জ্বর সাধারণত সাত দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তবে মাঝখানে চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে জ্বর একটু কমতে পারে। শরীরে কাঁপুনি ও ঘাম দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া পিঠে ব্যথা, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা এবং ত্বকে হামের দানার মতো দানা বা র্যাশ বের হতে পারে। পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা হয় বলে ডেঙ্গু জ্বরের অন্য নাম ‘হাড় ভাঙা জ্বর’ বা ‘ব্রেক বোন ফিভার’। কোনো কোনো ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে রক্তের অণুচক্রিকার সংখ্যা খুব কমে যায়।
ফলে শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়। শরীর থেকে বাইরেও রক্তক্ষরণ হতে পারে।
এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু জ্বর ছড়ায়। ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর রক্তে ডেঙ্গু ভাইরাস থাকে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানোর সময় ডেঙ্গু ভাইরাসগুলো মশার শরীরে প্রবেশ করে। এর এক থেকে দুই সপ্তাহ পরে ওই জীবাণুগুলো সংক্রমণ উপযোগী হয়। তাই ডেঙ্গু জ্বরের রোগীকে কামড়ানোর এক থেকে দুই সপ্তাহ পরে ওই মশা অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ালে এই জীবাণুগুলো ওই সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং ডেঙ্গু জ্বর হয়। এডিস মশার শরীরে একবার ডেঙ্গু ভাইরাস প্রবেশ করলে মশাটি মারা না যাওয়া পর্যন্ত এই ভাইরাস বহন করতে থাকে। ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তি ‘জ্বর’ হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকে শুরু করে ‘জ্বর’ হওয়ার পাঁচ দিন পর পর্যন্ত মশার কামড়ের মাধমে অন্য মানুষের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়াতে পারে। যেকোনো ব্যক্তিরই ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ভিন্ন প্রকার রয়েছে। যেকোনো এক প্রকারের ডেঙ্গু ভাইরাস দিয়ে কারো একবার ডেঙ্গু জ্বর হলে সেই প্রকারের ভাইরাস দিয়ে তার আর ডেঙ্গু জ্বর হয় না। কিন্তু অন্য আর তিনটি প্রকারের ডেঙ্গু ভাইরাসের যেকোনো প্রকারের ভাইরাস দিয়ে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার সংক্রমণ হতে পারে।
কোথায় বেশি হয়
শহরাঞ্চলেই ডেঙ্গু জ্বর বেশি হয়। কারণ, শহরাঞ্চলে এডিস মশার বংশ বিস্তার করার সুযোগ বেশি। সেখানে গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার, ছাদের ওপরে ফুলের টব, পরিত্যক্ত নারকেলের মালা বা ডাবের খোসা ইত্যাদিতে জমে থাকা পরিষ্কার এবং অল্প পরিমাণ পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। সাধারণত বর্ষাকাল এবং বর্ষার পরপরই ডেঙ্গু জ্বর বেশি হয়।
জটিলতা
ডেঙ্গু জ্বরের কারণে নানান জটিলতা দেখা দিতে পারে। সাধারণত দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার সংক্রমণের সময়েই এরূপ হয়। রক্তের অণুচক্রিকার সংখ্যা খুব বেশি কমে গিয়ে রোগীর শরীর থেকে অনেক রক্তক্ষরণ হতে পারে। এ অবস্থাকে বলে ‘ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার’। অনেক সময় রোগীর রক্তের পরিমাণ ও রক্তচাপ অত্যধিক কমে যেতে পারে। এ অবস্থাকে বলে ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’। রক্তক্ষরণ ও শকের কারণে রোগী মারাও যেতে পারে।
চিকিৎসা
ডেঙ্গু জ্বরের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। সাবধানতা অবলম্বন করলে এক সপ্তাহের মধ্যেই ডেঙ্গু জ্বর নিজে থেকে ভালো হয়ে যায়। তবে রোগের উপসর্গগুলোকে নিরাময় করার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হয়। জ্বর ও শরীর ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ প্রয়োজন হয়। এসপিরিন-জাতীয় ওষুধ দেয়া হয় না। রোগীকে পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য তরল খাবার খেতে হবে। এ ছাড়া পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে স্বাভাবিক খাবারও খেতে হবে। রোগীকে মশারির মধ্যে বিশ্রামে রাখতে হবে।
কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়
এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও এর কামড়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে ডেঙ্গু জ্বর অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ ছাড়া ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীরও উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে তার শরীর থেকে ডেঙ্গু ভাইরাস অন্য মানুষের শরীরে ছড়াতে না পারে।
এডিস মশা প্রতিরোধ করা
এডিস মশা প্রতিরোধ করতে হলে এসব মশার বংশ বিস্তারের স্থানের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। পরিত্যক্ত গাড়ির টায়ার, নারকেলের মালা বা ডাবের খোসা ইত্যাদি যেন যেখানে সেখানে পড়ে না থাকে। ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, নারকেল বা ডাবের খোসাÑ এগুলোতে যেন চার-পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে পানি জমে থাকতে না পারে। বাড়িঘরের আশপাশে কীটনাশক ওষুধ ¯েপ্র করে এডিস মশা মারা যেতে পারে।
এডিস মশার কামড় প্রতিরোধ করা
এডিস মশা দিনের বেলায়ও কামড়ায়। তাই দিনের বেলায়ই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। অতএব, দিনের বেলায়ও এডিস মশার কামড়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। লম্বা হাতাযুক্ত জামা এবং শরীর ঢাকে, এরূপ পোশাক পরিধান করলে মশার কামড় থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। মশারি, মশার কয়েল, ¯েপ্র ইত্যাদি ব্যবহার করলেও মশার কামড় থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া : ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে মশারির ভেতরে বিশ্রামে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে, যেন তাকে মশা কামড় দিতে না পারে এবং অন্য মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে না পারে।
লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ,
কমিউনিটি বেজ্ড মেডিক্যাল কলেজ, ময়মনসিংহ


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum
portugal golden visa