২১ আগস্ট ২০১৯

রোগ প্রতিরোধে কাঁচা আম

-

মহান আল্লাহ পাকের অশেষ নেয়ামত মওসুমি ফল। গ্রীষ্মের অসংখ্য ফলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ফল আম। এ জন্য আমকে ফলের রাজা বলা হয়। আম পাকা ও কাঁচা খাওয়া যায়। এ ফলটি মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণে বিরাট ভূমিকা পালন করে। তবে পাকা আমের চেয়ে কাঁচা আম মানবদেহের জন্য বেশি উপকারী। আবার পাকা আম সবার জন্য প্রযোজ্য নয় বা খেতে পারে না। কিন্তু কাঁচা আম সবাই খেতে পারে। হয়তো আমরা সবাই কাঁচা আমের গুণাগুণ সম্পর্কে জানি না বা জানলেও গুরুত্ব দেই না। মূলত মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণের অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে কাঁচা আম। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, মানুষের শরীরে রোগের প্রতিষেধক হিসাবে মওসুমি ফলের অধিক কার্যকর কোনো ওষুধ নেই।
আয়ুর্বেদিক নাম : আম, আম্র, হিন্দি নাম আম, ইংরেজি নাম গধহমড়, বৈজ্ঞানিক নাম গধহমরভবৎধ ওহফরপধ উদ্ভিদ জগতের অহধপধৎফরধপবধব পরিবারের একটি বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। আমাদের জাতীয় গাছ আমগাছ। কাঁচা আমের ত্বকে প্রচুর পরিমাণে সবুজ বর্ণকণিকা ক্লোরোফিল থাকে ফলে কাঁচা আম সবুজ দেখায়। কাঁচা আমে নানান জৈব এসিড থাকে। এজন্য কাঁচা আম টক লাগে। এসিডগুলো হলো : অ্যাসকারবিক এসিড, ফরমিক এসিড, টারটারিক এসিড, অক্সালিক এসিড, সাইট্রিক এসিড, ম্যালিক এসিড ও সাকসিনিক এসিড থাকে। যত বেশি পরিমাণ এসিড থাকে সে আম তত বেশি টক লাগে। কাঁচা আম ভিটামিন-‘সি’র খুব ভালো উৎস। তা ছাড়া ভিটামিন-বি, নিয়াসিন ও পটাসিয়াম পাওয়া যায়। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা আমে পুষ্টি উপাদান হলো : জলীয় অংশ ৮১ গ্রাম, খাদ্যশক্তি ৪৬ কিলোক্যালরি, প্রোটিন ২০.১ গ্রাম, আঁশ ২ গ্রাম, ভিটামিন-এ ১০ গ্রাম, ভিটামিন-সি শতকরা ১৬ ভাগ, বি১ ০.০৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি২ ০.০১ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৪ মিলিগ্রাম, আয়রন ৫.১ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ১৬ মিলিগ্রাম।
রাসায়নিক উপাদান : আমগাছের পাতায় রাসায়নিক উপাদান হলো পলিফেন-জ্যাস্থোন, ম্যাঙ্গিফেরিন, আইসোম্যাঙ্গিফেরিন, গ্যালিক পেন্টাসাইক্লিক, টার্পিন, চিনি। পাতায় আরো আছে উদ্বায়ী তেল, ইথানল, ইথাইল, প্রোপাইল, অ্যামাইল, ইথাইল এসিটেট ইত্যাদি।
উপকারিতা : কাঁচা আম আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। শরীরের ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণ করে। কাঁচা আম প্রচুর ভিটামিন-সি থাকে, যা শরীরের ইনফ্লামেশনের বিরুদ্ধে কাজ করে নতুন রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। দেহে আয়রন শোষণের ক্ষমতা বাড়ায়। শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে রক্তপাতের প্রবণতা প্রতিরোধ করে। মানবদেহের লিভারের বা যকৃৎ বা কলিজার নানা রোগ নিরাময়ের একটি প্রাকৃতিক ওষুধ কাঁচা আম। গরমে শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হয়। ঘামের সাথে দেহ থেকে প্রচুর লবণ বা সোডিয়াম ক্লোরাইড ও লোহা বেরিয়ে যায়। কাঁচা আম খেলে তা দেহ থেকে বেরিয়ে যেতে বাঁধা দেয়। কাঁচা আমে গ্যালিক এসিড থাকে, যা পাকস্থলীর হজম শক্তির প্রক্রিয়াকে গতিশীল করে। তাই যাদের এসিডিটির সমস্যা আছে বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আছে তাদের জন্য বেশ উপকার সাধন করে কাঁচা আম। শরীরের পানির পিপাসা বা পানির শূন্যতা পূরণে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। কাঁচা আমে আলফা ক্যারোটিন বা বিটা ক্যারোটিনের মতো ফ্লাভনয়েড থাকে যা আমাদের চোখের স্বাস্থ্য ঠিক রাখে এবং দৃষ্টিশক্তি প্রখর করে। ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণে কাঁচা আম ভালো কাজ করে। কাঁচা আমে প্রি-বায়োটিক ডায়াটারি ফাইবার নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকে, যা পাকস্থলী ও কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে এবং কপার নামে একটি উপাদান থাকে যা দেহে রক্ত বাড়াতে সাহায্য করে। কাঁচা আমে থাকে উচ্চমাত্রায় পটাসিয়াম যা হৃৎপিণ্ডের বা হার্টের গতি এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেহের রক্তের মধ্যে টক্সিন নামে কিছু উপাদান থাকে, যা দেহে জমা হয়ে নানা রোগ তৈরি করে। কাঁচা আম খেলে এই বিষাক্ত টক্সিন দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। কাঁচা আমে ১৭ ধরনের অ্যামাইনো এসিড থাকে, যা দেহের পুষ্টি, বৃদ্ধি ও বর্ধনের জন্য খুবই প্রয়োজন। গর্ভবর্তী মায়েরা নিয়মিত কাঁচা আম খেলে গর্ভের সন্তান সুস্থ সবল ও মেধাবী হয়। জন্মের পর সংক্রামক ব্যাধি কম হয়। কাঁচা আমের ভিটামিন-সি ছোঁয়াচে রোগ প্রতিরোধ করে এবং চামড়ার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। তা ছাড়া কাঁচা আম আমাদের দেহের নানা রোগ নিরাময়ে কাজ করে তা হলো : * যাদের হার্টের সমস্যা আছে তারা কাঁচা আম খান এতে বিটা-ক্যারটিন রক্তসঞ্চালনের সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে। * যারা রোগা রোগা বা শরীরে রক্ত কম তারা নিয়মিত পরিমাণ করে কাঁচা আম খান উপকার পাবেন। * যাদের শ^াস প্রশ^াসে কষ্ট বা হাঁপানির সমস্যা আছে তারা কাঁচা আম খান উপকার পাবেন। * জ্বর হলে মুখের স্বাদ কমে যায় এবং অরুচি হয় তারা কাঁচা আম খান রুচি বাড়বে। * যাদের পেটে বেশি গ্যাস হয় বা হজম শক্তি কম তারা নিয়মিত কাঁচা আম খান গ্যাস কমে আসবে। * যাদের ঘন ঘন সর্দি, কাশি, মুখের ঘা, চামড়ার নানান রোগ দেখা দেয় তারা নিয়মিত কাঁচা আম খান আমের ভিটামিন-‘সি’ এ সমস্যা কমিয়ে দেবে। * কাঁচা আমে ভিটামিন বি৬ বা পাইরিডক্সিন আছে যা মানবদেহের মস্তিষ্কে গাবা নামের একধরনের হরমোন তৈরি করে ফলে মস্তিষ্কের স্ট্রোকসহ মাথার নানা রোগ হয় না এবং স্মৃতি শক্তি ভালো থাকে। * কাঁচা আমে প্রচুর আঁশ থাকায় যাদের পায়খানা কম বা শক্ত হয় তারা নিয়মিত কাঁচা আম খান সমস্যা কমে আসবে। * কাঁচা আম মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোর অক্সিজেন সরবরাহ বাড়িয়ে দেয় ফলে শরীর সবল ও সতেজ করে তোলে। * পাকা আমের চেয়ে কাঁচা আমে ভিটামিন-সি বেশি থাকে তাই দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। * কাঁচা আম দেহের রক্ত পরিষ্কার করে। * যেকোনো কাটা ছেঁড়া বা অপারেশনের পর কাঁচা আম খান কাটা স্থান অতি তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে। তবে মনে রাখবেন অতিরিক্ত টক হলে খাবেন না। এতে কাটা স্থান পেকে পুঁজ জমতে পারে।
সতর্কতা : বেশি উপকারের আশায় কাঁচা আম বেশি খাবেন না, এতে ডায়রিয়া হতে পারে। ডায়রিয়া চলাকালে আম খাবেন না। উচ্চ রক্তচাপ হার্টের রোগীরা লবণ বা চিনি দিয়ে কাঁচা আম খাবেন না। কারণ কাঁচা লবণ রক্তচাপ বাড়ায় আর চিনি বা মিষ্টি রক্তের সুগার বাড়ায়। কাঁচা আম খেলে যাদের গ্যাস হয় তারা ভরা পেটে খাবেন। আম কেটে ফ্রিজে ভরে রাখবেন না। এতে পুষ্টিমান কমে যায়। কাঁচা আম খাওয়ার পরপরই পানি খাবেন না। কারণ আমের রসকে পানি জমাট বাঁধায়, ফলে গলা চুলকাতে পারে। নিয়মিত দেশীয় ফলমূল পরিমাণমতো খান সুস্থ থাকুন।

 


আরো সংবাদ




bedava internet