২৪ আগস্ট ২০১৯

স্বাস্থ্য রক্ষায় রমজানের ভূমিকা

-

পবিত্র মাহে রমজান আল্লাহ পাকের তরফ থেকে মুমিন বান্দাদের জন্য এক অফুরন্ত নেয়ামত ও বরকতময় বিধান। এ নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করে শেষ করা যায় না। রমজান ইসলামের মূল পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বছরে একবার এই মহিমাময় মাস আমাদের মাঝে এসে উপস্থিত হয়। রোজার হক আদায় করা মুসলমানদের জন্য অন্যতম কর্তব্য। কুরআন মজিদে বর্ণিত হয়েছে, হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীগণের ওপর। যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পারো। (সূরা: বাকারাহ-১৮৩)।
রমজান মানুষকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মানবীয় গুণাবলি শিক্ষা দেয়; যেন লোভলালসা পরিহার করে কামিয়াবি হাসিল করতে পারে। যাতে তার পারলৌকিক মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়। রমজান কেবল পরকালীন বিষয় নয়; এতে যথেষ্ট পার্থিব কল্যাণও নিহিত রয়েছে। তাই রমজান স্বাস্থ্য রক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখে।
আমরা সাধারণত স্বাস্থ্যবিধি পালনে তেমন সচেতন নই। প্রায়ই অতিভোজন, অনিয়মতান্ত্রিক খাদ্য গ্রহণ, নি¤œমানের খাবার, খাদ্যে ভেজাল ইত্যাদি কারণে আমরা নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছি। রমজান এসব অনিয়ম থেকে আমাদের রক্ষা করে। অতি ভোজনের কারণে পরিপাকের গোলযোগ দেখা দেয়। এতে বদহজম, পেটব্যথা, অস্বস্তি, বমনভাব ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। যা পরে ক্ষুধামান্দ্য, লিভারের দুর্বলতা, অম্লাধিক্য, পেপটিক আলসার সৃষ্টি করে। রমজান মানুষকে পরিমিত খাবার গ্রহণে শিক্ষা দেয়। ফলে উপরোক্ত পাকতান্ত্রিক জটিলতা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। আল্লাহর নবী বলেছেন, খাবার গ্রহণকালে পাকস্থলীর এক ভাগ খাদ্য, এক ভাগ পানি আর এক ভাগ শূন্য রাখবে। এতে পরিপাকের কোনো ত্রুটি দেখা দেয় না। আমরা রমজান মাসে দেখি এর বিপরীত চিত্র। অতি ভোজন, গুরুপাক খাবারের আধিক্য এবং ভাজা-পোড়া ভক্ষণের প্রতিযোগিতা। এটা আসলে ঠিক নয়।
সাহরিতে যথাসম্ভব স্বল্পাহার ভালো। অধিক উদরপূর্তি সারা দিন ক্ষুধার উদ্রেক সৃষ্টি করবে না এবং শরীর দুর্বল লাগবে নাÑ এ ধারণা থেকে অনেকে এটা করে থাকেন। আসলে প্রকৃত রোজাদার সিয়াম পালনে তেমন শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করেন না। সাহরিতে অল্প খাদ্য গ্রহণে হজমের ত্রুটির আশঙ্কা থাকে না। মূলত স্বল্পাহারের দরুন শারীরিক দুর্বলতা সৃষ্টি হয় না, বরং অনিয়মতান্ত্রিক খাবার গ্রহণ এবং তজ্জনিত পরিপাকের গোলযোগের কারণে দৈহিক সুস্থতা ব্যাহত হয়। এর কারণ অবিপাকীয় সমস্যা হেতু মানসম্পন্ন ক্যালরি উৎপন্ন হয় না। তাই শরীর দুর্বল লাগে।
অধুনা অনেকেই রোজা পরিহারের জন্য কথিত গ্যাস্ট্রিকে (আসলে রোগটি হলো গ্যাস্ট্রাইটিস) আক্রান্ত অথবা হবার ভয়ের কথা বলেন। এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ধারণাপ্রসূত। আসলে আপনি যখন রোজা রাখবেন, তখন পরিপাকতন্ত্রের কার্যাবলী রমজানের নিয়মতান্ত্রিকতার সুবাদে অত্যন্ত সুচারুরূপে পরিচালিত হয়। খাদ্য হজমের অতিরিক্ত চাপ না থাকায় স্বভাবতই পাচকরস বা এনজাইম নিঃসরণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরে আসে। অনেক পুরাতন গ্যাস্ট্রিক আলসার রোগী রোজাকালীন সুস্থতা বোধ করেন। যদি একিউট পেপটিক আলসার হেমোরেজিক তথা রক্তক্ষরণযুক্ত তীব্র পাকতান্ত্রিক ক্ষত দেখা দেয় তবে এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোজা ভঙ্গ করা যাবে। বস্তুত ইসলাম কারো ওপর বোঝা চাপিয়ে দেয় না।
ইফতারের সময় ভাজাপোড়া, গুরুপাক খাদ্য, অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার গ্রহণে আমরা অতি-অভ্যস্ত। এটা মুখরোচক তবে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ওই সময় স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দেহ ক্লান্ত থাকে। তখন দ্রুত ক্যালরি পৌঁছে দেয়ার জন্য তরল পানীয় শরবত। (তবে বাজারে প্রচলিত রঙিন শরবত এবং তরল কার্বনেটেড ড্রিংকস বর্জনীয়) এ জন্য লেবুর শরবত উত্তম। লঘুপাচ্য খাবার এবং ভিটামিনসমৃদ্ধ ফলমূল গ্রহণ উপযোগী। কিন্তু আমরা তা করছি না। এতে রমজানের উপকারিতা থেকে অনেকে বঞ্চিত হচ্ছি। ওইসব ক্ষতিকর গুরুপাক খাবার গ্রহণের ফলে অনেকেই রমজান মাসে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগে থাকেন। এ সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য ইসবগুলের ভুষির শরবত, পাকা বেলের শরবত, পাকা পেঁপে এবং শাক-সবজি বেশি করে খেতে হবে। মনে রাখতে হবে, রমজান মাসের দিবা উপবাস রাতে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের দ্বারা পূরণ করা সঙ্গত নয়। কারণ রাত্রিকালীন যথাযথ দেহ সঞ্চালনের অভাবে হজম ক্রিয়া হ্রাস পায়। এ জন্যই রাতে গুরুপাক খাবার বর্জনীয়। রমজান আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষায় পানাহারে সংযমী হতে নিয়ম শিক্ষা দেয়। লক্ষণীয় যে, রমজান মাসে কেবল উদরপূর্তি আর অনিয়ম দিয়ে যেন পাকস্থলীর গোলযোগ সৃষ্টি করা না হয়। কারণ হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে : পাকস্থলী সমস্ত রোগের সূতিকাগার।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, কিছু রোগে রমজানের উপকারিতা বেশ লক্ষণীয়। যেমন : ১. অবিসিটি বা স্থূলতা একটি দৈহিক সমস্যা। এতে রোগী স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারে না। দেহে সঞ্জীভূত দূষিত ও অপ্রয়োজনীয় রস-পদার্থ রোজা পালনে হ্রাস পায়। এতে দেহের অতিরিক্ত ওজন কমে। ফলে রোজাদার দৈহিক সজীবতা অনুভব করেন। তাই রোজা এ ধরনের লোকের জন্য একটি নেয়ামত। ২. হাই ব্লাড প্রেসার বা উচ্চ রক্তচাপ একটি ঘাতক ব্যাধি। মনোদৈহিক নানা জটিলতা থেকে মানুষ এতে আক্রান্ত হচ্ছে। এ সমস্যার স্থায়ী চিকিৎসা পাওয়া দুষ্কর। তবে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে অনেক সুস্থ থাকা যায়। এ রোগে অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার বর্জন একান্ত বাঞ্ছনীয়। রোজা পালনে দেহের মেদ কমে যায়। এতে রক্তচাপ সুনিয়ন্ত্রিত হয়। ৩. ডায়াবেটিস বা মধুমেহ বহুল আলোচিত একটি রোগ। রোজা পালন এ রোগে অনেক উপকারী। যেসব রোগী ইনসুলিন অনির্ভর; তাদের ব্লাড সুগার লেভেল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে। কিন্তু যাদের সম্পূর্ণ ইনসুলিনের ওপর নির্ভর করতে হয় এবং হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা অতি শর্করা হ্রাসের আশঙ্কা থাকে; তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোজা পরিহার করা যেতে পারে।
উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা এটা সুস্পষ্ট যে, রোজা কেবল আত্মশুদ্ধি লাভের জন্য নয়। এ দ্বারা যথেষ্ট দৈহিক উপকারিতা লাভ করা যায়। যদি এক মাস রমজানের নিয়ম-কানুন যথাযথভাবে পালিত হয় তবে বছরের অবশিষ্ট মাসগুলো রোগমুক্ত সুস্থ-স্বাভাবিক থাকা সম্ভব। বস্তুত, ইসলাম মানুষের কল্যাণের নিমিত্তে আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত একটি পূর্ণাঙ্গ বিধান। আসুন! আমরা জেনে-বুঝে রমজানের আহকাম পালন করি যেন আল্লাহর অশেষ রহমত ও বরকত লাভ করতে পারি।
লেখক : সাবেক সহকারী অধ্যাপক, হাকিম হাবিবুর রহমান ইউনানি মেডিক্যাল কলেজ।
মোবাইল : ০১৭১৫৩৪০৯৫৩


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet