২১ মে ২০১৯

অ্যালার্জির চিকিৎসা ও প্রতিরোধে বিভিন্ন জীবাণুর ব্যবহার

অ্যালার্জির চিকিৎসা ও প্রতিরোধে বিভিন্ন জীবাণুর ব্যবহার - ছবি : সংগৃহীত

মাঠপর্যায়ে ও গবেষণাগারের বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু জীবাণু প্রয়োগ করে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অ্যালার্জি প্রতিরোধ করা সম্ভব। ইতোমধ্যে বাজারে এ ধরনের কিছু ওষুধ ছাড়া হয়েছে। লিখেছেন ডা: গোবিন্দ চন্দ্র দাস

ইউরোপিয়ান অ্যাকাডেমি অব অ্যালার্গোলজি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমিউনোলজি একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। টাস্কফোর্সের কাজ হবে, ইতোমধ্যে অধিক গবেষণা কর্মগুলোর ফলাফল পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ গবেষণার রূপরেখা প্রণয়ন করা।

এই টাস্কফোর্স অ্যালার্জি চিকিৎসায় ব্যাকটেরিয়াল এক্সট্রাক্ট বা নির্যাস, প্রোবায়োটিক, মাইক্রোব্যাকটেরিয়া, অলিগোডিস অক্সিলিউক্লিওটাইড এবং লাইপোপলি স্যাকারাইড থেকে প্রস্তুতকৃত উপাদানগুলো আলাদা আলাদাভাবে পরীক্ষা করে দেখছে।

ব্যাকটেরিয়াল এক্সট্রাক্ট বা নির্যাস
কয়েকটি পরিচিত ব্যাকটেরিয়া শ্বাসতন্ত্র এবং রেচনতন্ত্রের সংক্রমণ ঘটায়। সেসব ব্যাকটেরিয়ার সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে এ ওষুধ। জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া আবার কিছু ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার গাত্রাবরণের লেগে থাকা প্রোটিন, যাকে লাইসেট বলা হয়। প্রথমে তৈরি করা হয়েছিল ত্বকের নিচে পুশ করার ইনজেকশন। এখন তৈরি করা হচ্ছে মুখে খাওয়ার ওষুধ।

দেখা গেছে, এসব ওষুধ খাওয়ার পর রোগীর রক্তে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধক উপাদানের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এ ছাড়া বেড়েছে আইজিজির পরিমাণ এবং কমেছে আইজিইর পরিমাণ। এই পর্যবেক্ষণগুলো প্রমাণ করেছে অ্যালার্জি চিকিৎসায় ব্যাকটেরিয়ার নির্যাস কার্যকর। এর ফলে শ্বাসতন্ত্রের কোষগুলো রোগ প্রতিরোধের বাড়তি ক্ষমতা লাভ করে। ফলে রাইনোসাইনোসাইটিস এবং অ্যাজমার প্রকোপ কমে যায়।
১২০ জন এ ধরনের রোগীকে তিন বছর ধরে মুখে খাওয়ার ওষুধ দেয়ায় পর দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ৭৫ জন সুস্থ হয়ে উঠেছে। এই পরীক্ষা করা হয়েছিল দুই থেকে আট বছর বয়সের শিশুদের নিয়ে। ফলাফল খুবই সন্তোষজনক। সুস্থ হয়ে উঠেছিল ৮৪ শতাংশ শিশু। এ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম। পরিপাকতন্ত্রের কিছু সমস্যা হলেও তা খুব সহজেই নিরাময়যোগ্য।

প্রোবায়োটিক
প্রোবায়োটিক বলা হয় সে সব জীবাণুকে, যারা শরীরে উপকারী হিসেবে পরিচিত, এসব জীবাণুসমৃদ্ধ (জীবিত অথবা পুনর্জন্ম কালচারের মাধ্যমে দুর্বলে পরিণত করে ফেলে) ওষুধগুলো বাজারে প্রোবায়োটিক নামে পরিচিত। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আছে ল্যাকটোব্যাসিলাস এবং বাইফিডোব্যাকটেরিয়া গ্রুপের জীবাণু। এরা ছাড়াও ইন্টারোকক্কাই এবং ই-কলাই গ্রুপের কিছু জীবাণুও প্রোবায়োটিক হিসেবে কাজ করে।
দেখা গেছে, প্রোবায়োটিক সেবন করলে রোগীর রক্তের শ্বেতকণিকা থেকে বেশি পরিমাণে ইন্টারফেরন গামা তৈরি হয়, যা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। এ ছাড়া রক্তে বেড়ে যায় ইন্টারলিউকন-২ এবং কমপ্লিমেন্ট রিসেটটর-৩ (ঈজ-৩)।

দরিদ্র দেশগুলোর শিশুদের অন্ত্রনালীয় দেয়ালে এসব ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে দরিদ্র দেশের শিশু ধনী দেশের শিশুদের চেয়ে অ্যালার্জিজনিত রোগে কম ভোগে। সুইডেন এবং ফিনল্যান্ডে বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব শিশুকে প্রোবায়োটিক খাওয়ানো হয়েছে, তাদের মধ্যে অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অন্য শিশুদের তুলনায় কম।

অ্যাজমা ও অ্যালার্জিতে আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রোবায়োটিক ওষুধ কিংবা ল্যাকটোক্যাসিলাস র‌্যামনোসাসমৃদ্ধ ইদোগার্ট বিশেষভাবে সুফলদায়ক বলে সমীক্ষায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইদোগার্টের মধ্যে বাইফিডোব্যাকটেরিয়াস ল্যাকটিস প্রয়োগ করেও একই ফল পাওয়া গেছে।

শিশু মাতৃগর্ভে থাকাকালে গর্ভবতী মাকে ল্যাকটোস্যাসিলাস র‌্যামনোসাস জিজিসমৃদ্ধ ওষুধ খাওয়ালে শিশুর অ্যালার্জির ঝুঁকি কমে যায় বলে মনে করেছেন কোনো কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানী। পারিবারিকভাবে অ্যালার্জির ইতিহাস আছে, এমন ১৩২ শিশুর জন্মের আগে তাদের মায়েদের দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিদিন প্রোবায়োটিক খাওয়ানো হয়েছিল। পরে দেখা গেছে, শতকরা ২৫ শিশু অ্যাটোপিক একজিমা থেকে মুক্ত থাকতে পেরেছে পুরোপুরি। এসব শিশু সব ধরনের অ্যালার্জি থেকে মুক্ত ছিল ১২ মাস বয়স পর্যন্ত।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা অ্যালার্জির আধুনিক চিকিৎসা হিসেবে এ ওষুধগুলো ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে যারা প্রাইমারি এবং অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনোডেফিসিয়েন্সিতে আক্রান্ত, তাদের ওপর এই ওষুধ অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

মাইকোব্যাকটেরিয়া
এই প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া প্রকৃতিতে সর্বব্যস্ত। মাটি ও পানিতে কমপক্ষে ৮০ ধরনের মাইকোব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পাওয়া যায়। এদের মধ্যে বিসিজি-কে সাফল্যজনকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে রোগ প্রতিরোধক শক্তি বাড়ানোর কাজে। একটি নির্দোষ প্রজাতির নাম মাইকোব্যাকটেরিয়াম। এই জীবাণুকে অ্যাজমা এবং অ্যালার্জির চিকিৎসায় ব্যবহার করার চেষ্টা অনেকদিন থেকে। গবেষণা করে দেখেছেন যে এই ধরনের ব্যাকটেরিয়া ঞয-ও ধরনের সাইটোকাইনের প্রতিসারণ বৃদ্ধি করতে পারে, ফলে অ্যালার্জির চিকিৎসায় এর ব্যবহারের সম্ভাবনা আছে।

ওলিগোডিঅক্সিনিডক্লিওটাইড এবং লাইপোলিস্যাকরাইড-কে অ্যালার্জির চিকিৎসা এবং অ্যালার্জি প্রতিরোধে ব্যবহার করার জন্য একই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সেগুলো থেকে ফলাফল প্রোবায়োটিকস ফলাফলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
এই সব জীবাণুর ব্যবহার অ্যালার্জি প্রতিরোধক ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরিতে সহায়ক হবে বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করেছেন। এ যাবত যে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণাকর্ম সংঘটিত হয়েছে, বিজ্ঞানীদের কাছে তা কোনো উপসংহারে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়নি। তবে অ্যালার্জি চিকিৎসায় এ ধরনের পদ্ধতির প্রয়োগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে, এমনটিই ভাবছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা।

লেখক : অধ্যাপক, ইমুনোলজি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা। চেম্বার : হলিস্টিক হেলথ কেয়ার সেন্টার, ৫৭/১৫ পান্থপথ, ঢাকা।

ফোন : ০১৭১১৫৯৪২২৮


আরো সংবাদ

agario agario - agario