২৪ মার্চ ২০১৯

টেস্টটিউব বেবি কী ও কেন

টেস্টটিউব বেবি কী ও কেন - ছবি : সংগৃহীত

৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে ছেলে, ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে মেয়ে এবং বাকি ২০ শতাংশ অজ্ঞাত কারণ জড়িত বন্ধ্যা হওয়ার পেছনে। ছেলেদের বন্ধ্যা হওয়ার প্রধান কারণ মানসিক চাপ ও অত্যধিক পরিশ্রম, দেরিতে বিয়ে, যৌনাঙ্গে জীবাণুর সংক্রমণ, পরিবেশ এবং ভিন্ন ধরনের লাইফস্টাইল যেমন- অ্যালকোহল গ্রহণ ইত্যাদি। পুংজননকোষ বা স্পার্মের সংখ্যার স্বল্পতা, এর গতি হ্রাস ও এবড়োখেবড়ো হয়ে যাওয়া, অণ্ডকোষে স্পার্ম তৈরি হলেও তা বের হয়ে না আসা, যাকে অ্যাজোস্পার্মিয়া বলে এবং স্পার্ম কখনো পাওয়া, কখনো না পাওয়া যাকে ওলিগোস্পার্মিয়া বলে। এসব কারণে পুরুষদের বন্ধ্যত্ব হয়। যদি এ ক্ষেত্রে মহিলাদের সব কিছু স্বাভাবিক থাকে, তবে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় সুচ দিয়ে ডিম বা ওভারির ভেতর স্পার্ম পৌঁছে দেয়া হয়। একে ইকসি (ওঈঝও) বলে। আর মহিলাদের বন্ধ্যা হওয়ার পেছনে যে কারণগুলো জড়িত তা হলো- যে টিউব বা নালী দিয়ে স্পার্ম ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হবে সেটি ব্লক বা ক্ষতিগ্রস্ত থাকলে, জরায়ুতে ফাইব্রয়েড-জাতীয় টিউমার বা এন্ডোমেট্রোয়েসিস জাতীয় রোগ থাকলে, ডিম্বাশয় বা ওভারিতে সিস্ট বা ওভারিয়ান ফেইলিউর হলে এবং যাদের পেটে বা ডিম্বাশয়ে অনেক অপারেশন হয়েছে- এসব ক্ষেত্রে পুরুষদের সব কিছু ঠিক থাকলে আইভিএফ (ICSI)-এর প্রয়োজন হয়।

স্বাভাবিক গর্ভধারণ : প্রাকৃতিকভাবে গর্ভধারণ যে প্রক্রিয়ায় হয় টেস্টটিউবেও তা হয়। তবে পার্থক্য হলো- এর প্রাথমিক কিছু অংশ শরীরের বাইরে বহিঃনিষেক হয়। প্রজননতন্ত্রের প্রক্রিয়ায় এককোষী ডিম স্পার্ম গ্রহণ করে নিষিক্ত হয়। শরীরের বাইরে এই ভ্রূণ দুই থেকে পাঁচ দিন বিশেষ কালচার মিডিয়াতে জরায়ু বা ডিম্বনালীসদৃশ পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখা হয়। এ কারণেই ওই বেবির নামের সাথে টেস্টটিউব যুক্ত হয়। সাধারণত মেয়েদের নিয়মিত ২৮ দিনের মাসিকে ১৩-১৪ দিনে ফলিকল পরিপক্ব হয়। এ সময় বা তার তিন-চার দিন আগে থেকে স্বামীর সাথে মেলামেশা হলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে হাজারখানেক স্পার্ম ডিম্বনালীতে চলে আসে। এরা এখানে ৩-৪ ঘণ্টা বেঁচে থাকে। সাধারণত প্রতি ইজাকুলেশনে প্রতি মি. লিটারে ২০-২০০ মিলিয়ন স্পার্ম বেরিয়ে আসে এবং ২-৩ মি. লিটার সিমেন বের হয়। এই ডিম্বনালীতে ১০০ মাইক্রন ব্যাসার্ধবিশিষ্ট একটি ডিমে ৮ মাইক্রন ব্যাসার্ধবিশিষ্ট একটি মাত্র শুক্রাণু কিছু বিশেষ প্রক্রিয়ায় ভেতরে ঢুকে যায়। পরবর্তী সময়ে পাঁচ-ছয় দিনে ক্লিভেজ প্রক্রিয়ায় ভ্রƒণ থেকে ব্লাস্টোসিস্ট হয়ে বিশেষ ধরনের তরল পদার্থ ফিটে গিয়ে হ্যাচিং হয়। পরে জরায়ুর ভেতরে এই অংশগুলোই টেস্টটিউবে ভরে দেয়া হয়। পরে ভ্রূণ ইমপ্লান্টেশন করা হয়। এখানে কিছু উদ্দীপককারী ওষুধ দিয়ে এই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা হয়।

টেস্টটিউব প্রক্রিয়া একটি টিমওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। এখানে গাইনোকোলজিস্ট, এমব্রায়োলজিস্ট ল্যাব-টেকনিশিয়ান, কাউন্সেলিং টিম এবং নার্সরা জড়িত। পুরো আইবিএফে সময় লাগে প্রায় ১০-১২ মাস। এর আগে একটি প্রি-আইভিএফ সাইকেল প্রয়োজন। কারণ, এ সময় রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কাউন্সেলিং ও এর চিকিৎসা খরচ, সফলতা-ব্যর্থতা সম্পর্কে জানানো হয়। স্বামীর সিমেন অ্যানালাইসিস, রক্তের সুগার এবং সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজগুলো পরীক্ষা করা হয়। আর স্ত্রীর মাসিকের দ্বিতীয় দিনে হরমোন প্যানেল, এইচবিএস এন্টিজেন, ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসনোগ্রাম, রক্তের সুগার, হিমোগ্লোবিন, বুকের এক্স-রে ও ইসিজি করা হয়। রোগীর ধৈর্য ও বিশ্বাসে অনেকাংশে এই চিকিৎসার সফলতা নির্ভর করে।

কোন ধরনের দম্পতি টেস্টটিউব বেবি নেয়ার উপযুক্ত?
শতকরা ৮০ ভাগ দম্পতি বিয়ের প্রথম বছরেই সন্তান লাভে সক্ষম হন। শতকরা ১০ ভাগ পরের বছরে সাফল্য লাভ করেন। বাকি ১০ ভাগের সন্তান লাভের জন্য প্রয়োজন হয় কোনো-না-কোনো পর্যায়ে চিকিৎসা সহায়তা। দুই বছর চেষ্টা করেও যেসব দম্পতি সন্তান লাভে সক্ষম হন না, তারা টেস্টটিউব বেবির জন্য উপযুক্ত বলে ধরা হয়।

মেয়েদের কী ধরনের সমস্যার জন্য বন্ধ্যত্ব হতে পারে?
প্রধানত আটটি কারণ রয়েছে। চল্লিশোর্ধ্ব মহিলাদের বন্ধ্যত্বের সবচেয়ে বড় কারণ ডিম্বনালীর অকার্যকারিতা। এর ফলে ডিম্বাণুর সাথে শুক্রাণুর মিলন ঘটে না। হরমোনের অসম নিঃসরণও একটি কারণ। ডিম উৎপাদন ও পরিপক্বতায় ব্যর্থতা, ডিম্বাণুর মান, ডিম্বাণুর খোলসের অতিরিক্ত পুরুত্ব, ডিম্বাণুর খোলসে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি মেয়েদের বন্ধ্যত্বের কারণ। এ ছাড়া ভ্রƒণ স্থাপনায় জরায়ুর ব্যর্থতা এবং জরায়ুতে টিউমার ও প্রদাহ যাকে এন্ডোমেট্রিওসিস বলে, এ সমস্যার জন্য মেয়েরা ইনফারটাইল বা বন্ধ্যা হতে পারে।

মেয়েদের বয়সের সাথে গর্ভধারণের কোনো সম্পর্ক আছে কি?
মনে রাখতে হবে, মহিলাদের সন্তান ধারণের বয়স অফুরন্ত নয়। বয়সের সাথে সাথে মেয়েদের সন্তান ধারণের সম্ভাবনা কমতে থাকে। ১০ থেকে ৩০ বছরই সন্তান নেয়ার উত্তম সময়। কাজেই এই বয়সের মধ্যে সন্তান না হলে সময় নষ্ট না করে উন্নত চিকিৎসার সাহায্য নেয়া উচিত। মেয়েদের বয়স ৩৫ অতিক্রান্ত হলেই সন্তান ধারণে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। বয়সসীমা চল্লিশ অতিক্রান্ত হলে উন্নত চিকিৎসাসেবাও তখন আর কোনো উপকারে আসে না।

টেস্টটিউব বেবির জন্য কী ধরনের পরীক্ষা ও পদ্ধতি মেয়েদের ক্ষেত্রে করা হয়?
ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসনোগ্রাফি একটি বিশেষ পরীক্ষা পদ্ধতি। যেসব মহিলার প্রতিবন্ধকতাহীন ডিম্বনালী রয়েছে এবং ডিম্বস্ফোটন সন্তোষজনক, তাদের জন্য কন্ট্রোল্ড ওভারিয়ান স্টিমুলেশন করা হয়। আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকণিকা ফলিকলের বৃদ্ধি মেপে উপযুক্ত সময় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া ইন্ট্রা-ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন বলে একটি প্রক্রিয়া আছে। এ ক্ষেত্রে স্বামীর সিমেন থেকে সচল সক্ষম শুক্রাণুগুলোকে ল্যাবে যন্ত্রের সাহায্যে আলাদা করে সঠিক সময় সূক্ষ্ম ক্যাথেটারের সাহায্যে স্ত্রীর জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়। ডিম্বনালী বন্ধ থাকলে বহুল প্রচলিত ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন করা হয়। ডিম্বাশয় থেকে অপারেশনের মাধ্যমে ডিম্বাণু সংগ্রহ করে স্বামীর শুক্রাণুর সাথে দেয়া হয়। উদ্ভূত ভ্রƒণকে পরে স্ত্রীর জরায়ুতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। এখানে আইভিএফ যন্ত্রের সাহায্যে ডিম্বাণুর মধ্যে শুক্রাণু ঢুকিয়ে দেয়া হয়।

পুরুষেরা বন্ধ্যা হয় কেন?
অনেক কারণের মধ্যে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ অন্যতম। এতে করে তাদের শারীরিক প্রোডাক্টিভিটি নষ্ট হয়। এ ছাড়া আধুনিক নগরকেন্দ্রিক জীবনে দেরি করে বিয়ে করাও একটি অন্যতম কারণ। অ্যালকোহল গ্রহণ ও অতিরিক্ত ধূমপান ছেলেদের ইনফারটাইল করে তুলতে পারে। আরেকটি কারণ হচ্ছেÑ প্রজননতন্ত্রে সংক্রমণ বা ইনফেকশন। আমাদের দেশে এর প্রকোপ বেড়েই চলছে। অরক্ষিত ও অনিরাপদ যৌনাচার এর কারণ। এর মাধ্যমে পুরুষদের শুধু গনোরিয়া, সিফিলিস, এইচআইভি, এইডস বা অন্যান্য যৌনরোগই হচ্ছে না, সাথে সাথে পুরুষেরা ইনফারটাইলও হচ্ছে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। অনেকে চর্বিজাতীয় খাদ্য একেবারেই খান না, এটি অনুচিত। মাছের তেল, বাদাম ও মধু পুরুষদের জন্য উপকারী। অনেক পুরুষের জন্মগতভাবেই প্রজনন অঙ্গে ভাস ডিফারেন্স অনুপস্থিত থাকে। তাদের স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ্যত্ব হয়।

মেয়েদের কী ধরনের সমস্যার জন্য বন্ধ্যত্ব হতে পারে?
মেয়েদের ফেলোপিয়ান টিউব বন্ধ থাকা একটি কারণ। কারণ, এ নালীপথেই শুক্রাণু ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়। এ ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কপিক অপারেশন করে এটি ঠিক করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ওভারিয়ান ফেইলিউর হয় হরমোনের কারণে। এর ফলে ডিম্বাণু পরিপূর্ণতা পায় না। জরায়ুর ভেতরে প্রদাহ থাকে, যাকে এন্ডোমেট্রোয়েসিস বলে। এর ফলে নারীরা গর্ভধারণে অক্ষম হন। ওভারি বা ডিম্বাশয়ে সিস্ট, টিউমার থাকলেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। পুরুষদের মতো মহিলাদেরও প্রজননতন্ত্রে জীবাণু সংক্রমণ একটি অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের দ্বারা মহিলারা বিভিন্ন যৌনরোগে আক্রান্ত হন এবং ফলে বন্ধ্যা হন। এ সমস্যার জন্য সন্তান না হলে আইভিএফ বা ইন-ভিট্রো ফারটিলাইজেশন যাকে বহিঃনিষেক বলা যায় তা করা উচিত।

আইভিএফ বলতে কী বোঝায়?
দেহের বাইরে বিভিন্ন রাসায়নিক তরলের মাধ্যমে জরায়ুসদৃশ পরিবেশ সৃষ্টি করে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন ঘটিয়ে ভ্রূণ উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে আইভিএফ বলা হয়। এরই অন্য নাম টেস্টটিউব বেবি। এ প্রক্রিয়ার আগে মহিলাদের দেহে ডিম্বাণু সৃষ্টির জন্য বিশেষ ধরনের হরমোন ইনজেকশন দেয়া হয়। বর্তমানে রিকম্বিনেন্ট ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন ইনজেকশনের মাধ্যমে এটি করা হয়। এর খরচ এক থেকে দেড় লাখ টাকা। এ কারণে প্রতি দম্পতির প্রতিবার খরচ হয় ৭০-৮০ হাজার টাকা এবং টেস্টটিউব বেবির জন্য দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। আমেরিকায় এই খরচ প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা এবং সিঙ্গাপুর, ব্যাংককে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা। কোনো দম্পতির প্রথমবার চেষ্টায় যদি টেস্টটিউব বেবি না হয়, তবে তাকে অন্তত আরো দুইবার এর জন্য চেষ্টা করা উচিত। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এ প্রক্রিয়ার সাফল্যের হার ৩০-৪০ ভাগ। বাংলাদেশে অর্থাৎ ঢাকায় এ ধরনের যে পাঁচ-ছয়টি সেন্টার আছে তাতেও সাফল্য একই রকম। এ প্রক্রিয়ায় রোগীদের প্রতি একটিই পরামর্শ, তারা যেন ধৈর্যসহকারে কোনো সেন্টারে দক্ষ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে তাদের চিকিৎসা করান। আমেরিকা থেকে প্রচুর রোগী বাংলাদেশে এসে পজিটিভ রেজাল্ট পাচ্ছেন।


আরো সংবাদ

iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al