২০ জুলাই ২০১৯

ক্যান্সার ঠেকাতে এ সবজিটি খান

বাঁধাকপি - সংগৃহীত

বাঁধাকপি বা ব্রোকোলির মতো সবুজ রঙয়ের পাতাওয়ালা কিছু সবজি পেটের জন্য ভালো, সেটা বহুদিন ধরেই প্রমাণিত। কিন্তু এ সবজিগুলো শরীরে কী প্রভাব ফেলে, তার খুব বিস্তারিত ব্যাখ্যা এতদিন ছিল না।

ব্রিটেনের একদল বিজ্ঞানী এখন বলছেন বলছেন, এসব সবজি পাকস্থলীতে গিয়ে যখন হজম হতে থাকে, সেসময় এগুলো থেকে ক্যান্সার প্রতিরোধী রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরিত হয়।

ফ্রান্সিস ক্রিক ইন্সটিটিউটের ওই গবেষকরা বলছেন, মলাশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধে বাঁধাকপি, ব্রোকোলি বা কেইল শাকের মত কিছু সবজি বাউয়েল বা মলাশয়ের ক্যান্সার ঠেকাতে পারে।

পরীক্ষাগারে ইঁদুরের ওপর গবেষণায় দেখা হয়েছে, কীভাবে সবজি পাকস্থলী এবং অন্ত্রের ওপর পাতরা আবরণ তৈরি করে।

চামড়ার মতো অন্ত্রের আবরণও ক্রমাগত বদলাতে থাকে। প্রতি চার-পাঁচ দিনের ব্যবধানে নতুন আবরণ তৈরি হয়। তবে এই প্রক্রিয়া বাঁধাগ্রস্ত হলে অন্ত্রে প্রদাহ, এমনকী ক্যান্সার হতে পারে।

নতুন এই গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, বাঁধাকপি বা ব্রোকোলির মত 'ক্রসিফেরাস' গোত্রের কিছু সবজি থেকে যে রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরিত হয়, তা এই আস্তরণ তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধাহীন করতে সাহায্য করে।

রান্নাঘর থেকে ক্যান্সার প্রতিরোধ?

গবেষকরা দেখছেন, খাবার চিবানোর সময় এই সবজিগুলো ইন্ডোল-থ্রি-কার্বিনোল নামে একটি রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে।

গবেষক ড গিট্টা স্টকিঞ্জার বলেন, "নিশ্চিত করতে হবে এসব সবজি যেন বেশি রান্না না করা হয়, বেশি যেন গলে না যায়।"

ইন্ডোল-থ্রি পাকস্থলীর অ্যাসিডের সংস্পর্শে এসে কিছুটা বদলে যায়। তারপর অন্ত্রের শেষভাগে গিয়ে এটি স্টেমসেলের আচরণ বদলে দিতে পারে। এই স্টেম সেলই অন্ত্রের পাতলা আবরণ তৈরিতে সাহায্য করে, অন্ত্রের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করে।

গবেষণায় দেখা গেছে ইন্ডোল-থ্রি-কার্বিনোল সমৃদ্ধ সবজি ইঁদুরের পাকস্থলীতে ক্যান্সার প্রতিরোধ করছে।

ড স্টকিঞ্জার বলছেন, "এমনকী আমরা দেখেছি, ইঁদুরের পাকস্থলীতে যখন টিউমার তৈরি হচ্ছে, তখন এই সবজিগুলো সেই টিউমারের গ্রোথ থামিয়ে দিচ্ছে।"

ড স্টকিঞ্জার নিজে এখন গোস্ত কমিয়ে বেশি সবজি খাচ্ছেন।

"খাবার নিয়ে কিছুদিন পরপর আমাদের নানা পরামর্শ দেয়া হয়, অনেক সময় এগুলো বিভ্রান্তি তৈরি করে, যুক্তি ছাড়া আমাকে যদি কোনো কিছু খেতে বলা হয়, আমি তা গ্রহণ করবো না।"

ব্রিটিশ চ্যারিটি ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে'র অধ্যাপক টিম কে বলেন, "এই গবেষণায় যেটা পাওয়া গেল তা হচ্ছে এসব সবজিতে শুধু যে বেশি ফাইবার বা আঁশ রয়েছে তাই নয়, এগুলো থেকে যে রাসায়নিক পদার্থ বের হয়, সেটা মলাশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে।"

 

আরো পড়ুন : স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত এক ছাত্রীর কেসহিস্ট্রি

ডাঃ শাহীন আরা আনওয়ারী

সাবিহা। বয়স ২২। ইউনির্ভাসিটির অনার্সের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। এতদিন মোটামুটি ভালোই ছিল। মানে মাসিকের সময় তলপেটে একটু ব্যথা কিংবা মাঝে মাঝে শরীরটা একটু দুর্বল লাগা ছাড়া তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু মাস তিনেক যাবত সাহিবার নতুন কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাম স্তনের বোটা থেকে নিজে নিজেই হলুদ পানির মতো ঝরে। তেমন ব্যথা নেই। তবে আশপাশের চামড়ার রঙ তামাটে বর্ণ হয়ে গেছে। অনেক সময় এত বেশি পানির মতো ঝরে যে উপরের জামা ভিজে যায়। মাঝে মাঝে স্তনের বোটা টন টন করে ব্যথা করে। গত ১০-১২ দিন যাবত হলুদ রঙের পানির সাথে একটু একটু রক্তবর্ণ পুঁজও আসা শুরু হয়েছে।

মেয়েটি অবিবাহিত। হলে থাকে। লজ্জায় কাউকে কিছু বলতেও পারে না। ইদানীং আবার বাম বগলের নিচে দুটো চকালো গোল চাকার মতো কী যেন মনে হয়। স্তনের বোটার চামড়া অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। গত তিন চার দিন ধরে এখানেও একটা শক্ত চাকার মতো হয়ে গেছে। একটু আঘাত লাগলে কিংবা কাপড়ের ঘষা লাগলে রক্ত পড়ে। আর কী চুপ করে রোগকে লুকানোর উপায় আছে। সাবিহা ঝরঝর করে কেদে ফেলে। হায় আল্লাহ। এখন কী হবে? সাবিহা এমনিতেই লাজুক। পুরুষ ডাক্তারের কাছে মরে গেলেও যাবে না। মহিলা ডাক্তারের খোঁজে কোথায় যাবে?

অবশেষে রুমমেটকে সব খুলে বলে। ইদানীং গায়ে জ্বরও আসে। খাবার রুচিও কম। চোখের নিচে কালচে দাগ পড়তে শুরু করেছে। রুমমেট সব শোনার পর সেদিন দুপুরেই ওরা ডাক্তারের কাছে যায়। ডাক্তার বিস্তারিত জানার পর একটি সরকারি হাসপাতালের স্তন ক্লিনিক নামের একট সেন্টারে তাড়াতাড়ি দেখা করতে বলেন। ডাক্তার যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে সাবিহার সমস্যাগুলো শোনেন এবং কিছুতেই যেন আর দেরি না করেন সেজন্য ভালোভাবে বোঝান। সাবিহা ভয়ে কেদে ফেলে। কেনো এমনটি হলো?

সাবিহার বাবা নেই। পড়ার খরচ বড় ভাইয়ের টাকায় চলে। এখন এই চিকিৎসার বাড়তি খরচের টাকা ভাইয়ের কাছে কিভাবে চাইবে? মনে মনে ঠিক করে স্কলারশিপের অল্প কিছু টাকা ব্যাংকে আছে প্রয়োজনে সেটা তুলবে। ব্রেস্ট ক্লিনিকে যাওয়ার পর সাবিহাকে যত্ন করে দু’জন মহিলা ডাক্তার দেখলেন। আশ্বস্ত করলেন স্তনের বোঁটা থেকে নিঃসৃত রস পরীক্ষার জন্য পাঠালেন। স্তনে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করালেন। বায়োপসি নামের একটি পরীক্ষাও করালেন। সরকারি হাসপাতাল বলে টাকা বেশি খরচ হলো না। সাবিহাকে কিছু ওষুধপত্র লিখে দিলেন। এত তো দেরি করে আসা যে কোনো মতেই উচিত হয়নি সেটি বারবার ঘুরেফিরে ডাক্তার বললেন। তবে যেকোনো অবস্থাতেই হোক না কেনো সাবিহাকে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে- ডাক্তার একরকম ওয়াদা করালেন। প্রয়োজনে বিনা টাকায় কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেমন রক্তের কিছু পরীক্ষা কিডনি এবং লিভারের কিছু পরীক্ষা তিনি ফ্রি লিখে দিলেন। কিন্তু সব কিছু মিলিয়ে সাবিহার কান্না পাচ্ছে। কোনো এমনটি হলো?

রিপোর্ট নিতে আবার পরের দিন আসতে হবে। বায়োপসির রিপোর্ট দিতে তিন দিন সময় লাগবে, ডাক্তার বারবার বলেছেন অবহেলা করার কোনো সুযোগও নেই। সাবিহা এখন কী করবে?

সেদিন বায়োপসির রিপোর্ট ডাক্তার দেখলেন বললেন, সাবিহার গার্ডিয়ানের সাথে কথা বলতে হবে। স্তনে ক্যান্সার ভালোভাবে বাসা বেঁধেছে, অপারেশন লাগবে এবং অপারেশনের আগেই কিছু ওষুধ ইনজেকশন নিতে হবে। এত কথা তো আর সাবিহাকে বলা যায় না। রুমমেটকে ডাক্তার কিছুটা খুলে বললেন এবং বাড়ির লোকদের যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি খবর দিতে বললেন। কিন্তু ডাক্তারের আচরণে সাবিহা কিছুটা বুঝে ফেলে যে, তার রোগটি ক্যান্সার হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। তবে মনোবল হারালে চলবে না। সাবিহা চোখের পানি মুছে এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে। জীবনে অসুখ-বিসুখ আসবেই কিন্তু তার কাছে পরাজিত হলে চলবে না। সাবিহার দাদির কথা মনে পড়ে। তারও একটা স্তন পাথরের মতো শক্ত চাকা হয়ে হাড়ের সাথে লেগে গিয়েছিল। একটু চাপ লাগলেই রক্ত ঝরত। শেষের দিকে এমন দুর্গন্ধ ছড়াত যে আশপাশে কেউ যেতে চাইত না। তিন মাস এভাবে কষ্ট পাওয়ার পর দাদি মারা যান। গ্রামে থাকা দাদির চিকিৎসাও তেমন করা হয়েছিল না তখন। সাবিহা ভাবে দাদির মতো হলে চলবে না। ওর যতটা শক্তি আছে চিকিৎসা করার জন্য সেটা ব্যয় করবে। জীবনের কাছে পরাজিত হওয়া চলবে না।

ডাক্তার আমাকে খুলে বলুন আমার অবস্থা কি খুবই খারাপ? ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

না না আপনি ঘাবড়াবেন না। এর চিকিৎসা আছে। তবে ধৈর্য ধরে আপনাকে চিকিৎসা নিতে হবে। আমরা যারা চিকিৎসা দেবো তাদের আপনি সহযোগিতা করবেন। আপনি তো শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী। ফলোআপে থাকতে হবে। মনোবল হারাবেন না। চিকিৎসা নিলে আপনি ভালো থাকবেন।

আমি কি আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারব? নাকি সারা বছর হাসপাতালে পড়ে থাকতে হবে?

না না কী যে বলেন আপনি? আপনি পুরোদমে আপনার পড়াশোনা, ক্যারিয়ার সবই চালিয়ে যাবেন। শুধু মাঝে মাঝে ফলোআপ আসতে হবে। অপারেশনের ওই ক’দিন হাসপাতালে থাকতে হবে। তার পর আপনি হাসপাতালে আসা-যাওয়া করলেই চলবে।

বাঁচালেন ডাক্তার। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, আমার অনেক দায়িত্ব আছে। আমি সুস্থ জীবন চাই।

সাবিহার স্তনে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর কিছু দিন ইনজেকশন দেয়া হালো। পরে অপারেশন করা হলো। সরকারি হাসপাতালেই। দু’ব্যাগ রক্ত লেগেছিল। ইউনিভার্সিটির সহপাঠীরা টাকা, রক্ত ম্যানেজ করে দিয়েছিল। এখন সাবিহা দুর্বলতা অনুভব করলেও ক্লাস মিস করে না। বিসিএসের জন্য যতটা সম্ভব প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে মনে মনে ভীষণ অনুতপ্ত। কেন লজ্জায় এবং কোনো কারণ ছাড়াই সে এত দেরি করে ডাক্তারের কাছে গেল? লজ্জা এবং ভয় এই দুই অন্তত অসুখের ব্যাপারে থাকতে নেই। ডাক্তার বারবার বলছিলেন, যদি আরেকটু আগে আসতেন তবে চিকিৎসা অনেকটা সহজ হয়ে যেত।

এ জন্য বলছি, প্রতিটি মেয়ে নিজে নিজের স্তন প্রতি মাসে অন্তত একবার পরীক্ষা করে দেখুন। স্তনের বোঁটায় চাপ দিয়ে দেখুন কোনো রক্ত পুঁজ বের হয় কিনা? স্তনে কোনো চাকা আছে কিনা নিজে নিজেই শনাক্ত করুন। কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন। খবরদার পরে যাবো কিংবা লুকাবেন না। এতে সমস্যা আরো বেড়ে যাবে। যদি স্তন ক্যান্সারে আপনার বোন, মা, খালা, দাদি এ রকম কেউ আক্রান্ত হয়ে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে আপনারও ঝুঁকি কিছুটা থাকতে পারে।

আপনি স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন। নিজে না বুঝতে পারলে যারা এ ব্যাপারে বোঝে তাদের সাথে শেয়ার করুন। স্তনে ব্যথা হতে পারে অনেক সময়। অনেকের আবার মাসিকের আগে স্তনে খুব ব্যথা হয়। ভারী ভারী লাগে। জামা কাপড়ের ছোঁয়া লাগলেও ব্যথা করে। বগলের নিচে কোনো চাকা আছে কিনা ভালোভাবে দেখুন। মোট কথা সুস্থ থাকার জন্য আপনাকেই আপনার দায়িত্ব নিতে হবে। ভালো থাকুন।

লেখক : গাইনোকোজিস্ট, চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শান্তি নগর শাখা, ঢাকা


আরো সংবাদ

gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi