২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

হৃদরোগ নিরূপণে ইকোকার্ডিওগ্রাফি

-

হৃৎপিণ্ডের রোগ নির্ণয়ের জন্য ডাক্তাররা বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করে থাকেন। তার মধ্যে ইকোকার্ডিওগ্রাফি হৃৎপিণ্ডের বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ে বর্তমানে বহুলপ্রচলিত একটা পরীক্ষা। আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ড পরীক্ষাকে ইকোকার্ডিওগ্রাফি বা ইকো বলে। বর্তমানে ইকোকার্ডিওগ্রাফি একটা জনপ্রিয়, নিরাপদ পরীক্ষা যা হৃৎপিণ্ড ও রক্তসংবহনতন্ত্রের পরীক্ষায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। লিখেছেন ডা: নাহিদ শারমিন নূপুর

হৃৎপিণ্ড মানবদেহের একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যা বক্ষগহ্বরের মধ্যচ্ছাদার ওপরে এবং দুই ফুসফুসের মাঝখানে অবস্থান করে। হৃৎপিণ্ড বিশেষ এক ধরনের পেশী (হৃৎপেশী) নির্মিত, চার প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট, ক্রিকোনাকার, ফাঁকা পাম্প করা যন্ত্রের মতো, যার সঙ্কোচন প্রসারণে সারা দেহে রক্ত পরিবাহিত হয়। পেরিকার্ডিয়াম নামক দ্বিস্তরী ঝিল্লি দিয়ে হৃৎপিণ্ড আবৃত। হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ট চারটি। দুটি অলিন্দ ও দুটি নিলয়। একই দিকের অলিন্দ ও নিলয়ের মাঝখানে কপাটিকা থাকে, যা কেবল একই দিকে রক্ত প্রবাহিত করে। হৃৎপিণ্ডের রোগ নির্ণয়ের জন্য ডাক্তাররা বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করে থাকেন। তার মধ্যে ইকোকার্ডিওগ্রাফি হৃৎপিণ্ডের বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ে বর্তমানে বহুলপ্রচলিত একটা পরীক্ষা। আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ড পরীক্ষাকে ইকোকার্ডিওগ্রাফি বা ইকো বলে। বর্তমানে ইকোকার্ডিওগ্রাফি একটা জনপ্রিয়, নিরাপদ পরীক্ষা যা হৃৎপিণ্ড ও রক্তসংবহনতন্ত্রের পরীক্ষায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
এটা একটি ব্যবহারিক পরীক্ষা। এ পরীক্ষা অপারেটর অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। অপারেটরের দক্ষতার ওপর ইকো পরীক্ষার মান নির্ভর করে।
ইকো কিভাবে হয় : মানুষ ২০ থেকে ২০ হাজার হর্স তরঙ্গবিশিষ্ট শব্দ শুনতে পায়। ২০ হাজার হর্স তরঙ্গবিশিষ্ট শব্দকে আলট্রাসাউন্ড বা অতিশব্দ বলে। যা মানুষ শুনতে পায় না। ইকোর জন্য ১.৫ হতে ৭.৫ মেগা হর্সবিশিষ্ট অতি শব্দ ব্যবহৃত হয়। হৃৎপিণ্ডের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিফলিত অতি শব্দকে ইকো করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। ইকো অধ্যয়নের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডের রক্তসঞ্চালন, অভ্যন্তরীণ গঠন, বিভিন্ন ভাল্ব বা কপাটের আন্দোলন এবং হৃদ-মাংসের আন্দোলন অনুধাবন করা যায়। আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্রের প্রোবের মাঝে অতিশব্দ সৃষ্টিকারী করা বসান থাকে যখন বৈদ্যুতিক শক্তির সাহায্যে এই অণুগুলোকে উত্তেজিত করা হয় তখন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন শব্দতরঙ্গ তৈরি হয় এবং ওই শব্দতরঙ্গ হৃৎপিণ্ডে প্রবেশ করে আবার প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। এ প্রতিফলিত শব্দকে কম্পিউটারের মাধ্যমে আল্ট্রাসাউন্ড মেশিনের পর্দায় ছবি আকারে দেখা যায়। ইকো করার সময় আল্ট্রাসাউন্ড মেশিনের ছোট প্রোবটিকে রোগীর বুকে রাখা হয়। এটাকে বক্ষ বা Transthoracic ইকো বলে। মেশিনের প্রোবটিকে রোগীর বুকের বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে হৃৎপিণ্ডের বিভিন্ন ধরনের ছবি নেয়া হয়। রোগীকে সাধারণত বাম কাতে শুইয়ে আল্ট্রাসাউন্ড জেলি বুকে লাগিয়ে ইকো করা হয়। ইকো করার সময় রোগীর ইসিজিও রেকর্ডিং করা যায়। একটা রোগীর ইকো করতে ১৫-২০ মিনিট সময় লাগে। বর্তমানে তিন ধরনের ইকো প্রচলিত আছে : (১) দ্বিমাত্রিক (2D) দ্বিমাত্রিক ইকোকে রিয়েল টাইম ইকোও বলে। দ্বিমাত্রিক ইকো হৃদযন্ত্রের গঠনের কর্তিত ছবিসহ হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন অংশের স্পন্দিত চিত্রও প্রদর্শন করে। দ্বিমাত্রিক চিত্র হৃৎপিণ্ডের (ক) আকৃতি ও গঠনগত প্রতিবিম্ব (খ) হৃদযন্ত্রের প্রকোষ্ঠের এবং কপাটিকার চিত্র, (গ) চলমান ও ডপলার ইকোর জন্য প্রোবের অবস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে।
(২) চলমান (M.mode) ইকো : হৃদযন্ত্রের স্পন্দিত অংশগুলো সম্পর্কে এটা সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদান করে। এটা হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন প্রকোষ্ঠের ও রক্তনালীর গভীরতার মাপ ও হৃৎপিণ্ডের দ্রুত সংগটিত বিভিন্ন ঘটনার তথ্য প্রদান করে।
(৩) ডপলার ইকো : দু’ধরনের সাদা ও রঙিন। ডপলার ইকো প্রক্রিয়ায় অতি শব্দরশ্মিগুলো রক্তে চলন্ত লাল রক্তকণিকা থেকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসার নীতিকে ব্যবহার করে। ফলে এটা হৃদযন্ত্র ও রক্তসংবহনতন্ত্রের নালীগুলোতে রক্ত-সঞ্চালন ও প্রবাহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান দান করে। বিশেষ করে হৃদযন্ত্রের কপাটের ছিদ্র সঙ্কীর্ণ হয়ে যাওয়া এবং কপাটের কোনো ফাঁক দিয়ে রক্ত চোঁয়ানো এবং অস্বাভাবিকতার মাত্রার গভীরতা পরিমাপ এবং বিভিন্ন প্রকোষ্ঠের মাঝে অস্বাভাবিক আন্তঃরক্ত সঞ্চালন এবং হৃদযন্ত্রের এসব অস্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন প্রবাহ নির্ণয়ে রঙিন ইকো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়াও রঙিন ইকো ডপলার শরীরের টিউমার শনাক্তকরণে ধমনী ও শিরার অস্বাভাবিকতা নির্ণয়ে এবং গর্ভস্থ ভ্রƒণের হৃদ ও সংবহনতন্ত্রের অস্বাভাবিকতা সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান দেয়।
সংক্ষিপ্তভাবে বলতে গেলে ইকো হৃদপিণ্ড সম্পর্কে নি¤েœাক্ত তথ্য সরবরাহ করেÑ
(১) হৃদযন্ত্রের প্রকোষ্ঠর আকার, (২) প্রকোষ্ঠের কাজ (সঙ্কুচিত ও সম্প্রসারিত অবস্থায়), (৩) হৃদপ্রকোষ্ঠের এবং বিভিন্ন কপাটের স্পন্দন ও কাজ (৪) হৃদযন্ত্রের ভেতর ও বাইরে পিণ্ড, জমাটবাঁধা রক্ত, হৃদপিণ্ডে পানি জমা শনাক্তকরণ, ৫) রক্ত প্রবাহ ও সঞ্চালনের তথ্য (কপাটের সঙ্কীর্ণতা, চোয়ানো এবং বিভিন্ন প্রকোষ্ঠের চাপের তারতম্য)। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইকোকার্ডিওগ্রাফি করাবেন : (১) হৃদপিণ্ডে অস্বাভাবিক শব্দ হলে (Murmur) (২) এক্সরেতে হার্ট বড় হলে (Cardiomegaly) (৩) সন্দেহজনক হার্ট ফেলিওরÑযখন রোগীর শ্বাসকষ্ট ও পায়ে পানি আসে, (৪) হৃৎপিণ্ডে পানি জমা (Pericardial effusion), ৫) হৃদপেশির পচনজনিত জটিলতা নির্ণয় (Complication of MI), ৬) উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগ (LVH) অর্থাৎ হৃদপিণ্ডের দেয়াল মোটা হয়ে যাওয়া, (৭) হৃৎপিণ্ডের নিলয়দ্বয়ের কার্যকারিতা জানা, (৮) হৃৎপিণ্ডে সন্দেহজনক কোট জমাট রক্ত বা টিউমার সম্পর্কে তথ্য জানা। ইকোকার্ডিওগ্রাফিতে সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন : (ক) রোগীর উপসর্গ, লক্ষণাদির ও ক্লিনিকের রোগ নির্ণয় সম্পর্কে তথ্য জানানো।
(খ) বুকের এক্সরে ও ইসিজি। ডাক্তার কোন বিশেষ তথ্য জানতে চাইলে তা উল্লেখ করা।
ইকোর জন্য জানালা (Echo Window) : বায়ু ও হার্ড অতি শব্দ সঞ্চালনের জন্য বড় বাধা। হৃৎপিণ্ড বায়ুভর্তি ফুসফুস দিয়ে বেষ্টিত থাকায় এবং পাঁজরের দু’পাশে পাঁজর অস্থি থাকায় ইকো করার জন্য হৃৎপিণ্ডে অতিশব্দ পরিবাহিত হওয়ার জন্য বড় বাধা। তাই হৃৎপিণ্ডের ভালো ইকো প্রতিবিম্বের জন্য বুকের কতকগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় আলট্রাসাউন্ড প্রোব স্থাপন করলে অতি শব্দের ভালো সঞ্চালন হয় এবং ভালো ইকো প্রতিবিম্ব পাওয়া যায়। বুকের পাঁচটি ইকো জানালার মধ্য দিয়ে ইকো প্রতিবিম্ব পাওয়া যায়। সেগুলো হচ্ছেÑ
(১) স্টার্নামের বাম পাশের জানালা : (২য়-৪র্থ বাম বক্ষপিঞ্জর অস্থির মধ্যস্থ স্থান) বেশির ভাগ ইকো পরীক্ষা এখান থেকে শুরু হয়। এ জানালা দিয়ে হৃৎপিণ্ডের দৈর্ঘ্যচ্ছেদ ভালো পাওয়া যায়।
(২) হৃদচূড়া জানালা : এ জানালা দিয়ে হৃৎপিণ্ডের চারটি প্রকোষ্ঠের (ডান ও বাম অলিন্দ ও নিলয়ের) ভালো প্রতিবিম্ব দেখা যায়।
(৩) রক্ষপিঞ্জারিস্থর নি¤œ জানালা : যার মাধ্যমে আন্তঃ অলিন্দ পর্দা, নি¤œ মহাশিয়া ও নি¤œ মহা ধমনীয় ছবি পাওয়া যায়।
(৪) স্টার্নামের উপরস্থ জানালা : মহাধমনীয় সঙ্কীর্ণতার (Aortic Stenosis) ছবি দেখার জন্য ব্যবহৃত হয়।
(৫) স্টার্নামের ডান পাশের জানালা : মহাধমনীর সঙ্কীর্ণতার ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বগামী মহাধমনীÑ দেখার জন্য ব্যবহৃত হয়।

 


আরো সংবাদ

১ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি ও আইনজীবীদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করবেন প্রধান বিচারপতি পর্যটন শিল্পে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার : পর্যটনমন্ত্রী এরশাদ সিঙ্গাপুর গেছেন ধানমন্ডিতে পুলিশের গুলিতে ছিনতাইকারী আহত ঢাবির দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ : পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ড. মঈন খানের বাসায় বার্নিকাট সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় সরকার দিন : ইসলামী ছাত্রসমাজ অপরাধীদের পক্ষ নেয়ার অভিযোগ ছাত্রলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে সংসদ নির্বাচন অবাধ করতে কমিশনের সব প্রস্তুতি রয়েছে : সিইসি ৫৭ ধারায় গ্রেফতার চবি শিক্ষক মাইদুল ইসলামের মুক্তি দাবি রাজধানীতে চার হাসপাতালকে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা : বন্ধ ৪ হাসপাতাল

সকল