২১ নভেম্বর ২০১৮

বর্ষায় স্বাস্থ্য সচেতন থাকুন

স্বাস্থ্য
এই প্রচণ্ড গরমে আর মাঝে মধ্যে ছিটেফোঁটা বৃষ্টিতে গরম আরো প্রকট হয়ে ওঠে - সংগৃহীত

এই আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসের ঝমঝম বৃষ্টিতে মাধবী লতার ফুলে ফুলে ভরে থাকা বাড়ির গেটের ওপর লতিয়ে ওঠা দোল খাওয়া ফুল আর পাতার কী যে অপূর্ব শোভা!

বর্ষার সবুজ গাঢ় শ্যামল সৌন্দর্যে মনপ্রাণ ভরে ওঠে। কত কবি যে বর্ষার রূপে মুগ্ধ হয়ে কবিতা লিখেছেন।

এবার ওই সব কথা রেখে চলুন বাস্তবতা নিয়ে কিছু কথা বলি। ছাদের কার্নিশে জমে থাকা টলটলে পানি বা ফেলে রাখা গাড়ির টায়ারে জমা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা, ডিম পেড়ে বাচ্চা তুলে তারপর বিস্তার লাভ করে এডিস মশার বংশধর।

স্ত্রী এডিস মশা কামড় দেয় নিঃশব্দে এবং ফলে ডেঙ্গু জ্বর হয়। ডেঙ্গু জ্বর হলে গায়ে অসম্ভব ব্যথা হয়, দুই চোখে লাল হয়ে যায়। হাত-পায়ের গিরায় গিরায় প্রচণ্ড ব্যথা হয়। পুরো শরীরে বিন্দু বিন্দু র‌্যাশ ওঠে বা অসংখ্য লাল রঙের বিন্দু ওঠে। এগুলো চুলকিয়ে শরীরকে নাস্তনাবুদ করে দেয়। মুখের ভেতর ও খাদ্যনালিতে ওই রকম র‌্যাশ ওঠে। আর হেমোরোজিক ডেঙ্গু হলে প্লেটলেট কর্বন্ট বা অশুচক্রিকা কমে যায়। ওই সব পেশেন্ট কোলাপস করে, চিকিৎসা না করালে রোগী মারা যায়। কাজেই ঝমঝম ছন্দের সাথে মন্দ কথাও মনে রাখতে হবে। ফুলের টবে, পরিত্যক্ত টায়ারের পানি, ছাদের কার্নিশের জমা পানি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়।

বর্ষায় হয় প্রচণ্ড জ্বর
ভরা বর্ষায় প্রচণ্ড জ্বর হচ্ছে, জ্বরের সাথে মাথাব্যথা পুরো শরীর ব্যথা, সাথে খুসখুসে কার্শি পুরো শরীরের দুর্বলতা, খাবার দেখলে বমি বমি ভাব হওয়া এবং মাথা মুড়ানো ইত্যাদি এটিকে বলা হয় ভাইরাস ফিভার।

এ জ্বরে শরীর এতই দুর্বল হয় যে, দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্ট মনে হয়। কোনো কাজ করার এনার্জি থাকে না। এ জ্বর অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং বাসার একজনের এ জ্বর হলে একে একে পরিবারের সবার হবে। বিশেষ করে ছোট শিশুরা বেশি ভুগে থাকে।

এমন জ্বর হলে শরবত, আনারসের রস ইত্যাদি খেতে হবে। ভয়ের কোনো কারণ নেই। তিন দিন পর এ জ্বর সেরে যাবে।

ছিটেফোঁটা বৃষ্টিতে
এই প্রচণ্ড গরমে আর মাঝে মধ্যে ছিটেফোঁটা বৃষ্টিতে গরম আরো প্রকট হয়ে ওঠে। শরীর ঘামছে এবং বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতোই। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঘরে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। এই ভেজা প্রকট গরমে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও জ্বর হচ্ছে ঘরে ঘরে। কোনো কোনো পরিবারের সবারই এ জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। এ জ্বর ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত হতে পারে। তবে ভাইরাসজনিত প্রকোপেই বেশি। এ জ্বরের তাপমাত্রা ১০১ থেকে ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে। শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, মাথাব্যথা করে এবং খাবার খেতে প্রচণ্ড অনীহা হয়। শরীর খুবই দুর্বল লাগে। এ জ্বরের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ দিন হতে পারে। জ্বরের মধ্যে চোখ লাল হওয়া, খাবারের প্রতি অনীহা হওয়া ইত্যাদি দেখা যায় নাক দিয়ে পানি পড়ে, খুসখুসে কাশি হয় এবং কখনো কখনো কাশি বেশি পরিমাণে ওঠে।

তবে এ জ্বরের ঘাবড়ানোর কারণ নেই। তিন থেকে পাঁচ দিনেই সেরে যায়। কিন্তু জ্বর সেরে যাওয়ার পরও শরীর খুব দুর্বল লাগে। মাথা ঘোরায়। এ উপসর্গগুলো আস্তে আস্তে ভালো হয় এবং খাবারের রুচি ফিরে আসে। এ ভাইরাস জ্বরে তেমন কোনো ওষুধ লাগে না। জ্বর হলে প্যারাসিটামল বা পেইনকিলার খেতে হবে। তবে খালি পেটে নয়। আর যদি জ্বর পাঁচ দিনেও না সারে তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে টাইফয়েড বা প্যারাটাইফয়েড বা ডেঙ্গু জ্বর কি না। জ্বরের সময় ঠাণ্ডা পানিতে মাথা ধুলে ভালো লাগবে এবং সাথে সাথে ভেজা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে। তখন জ্বর কমে আসবে, খুসখুসে কাশি হলে কফ সিরাপ খেতে হবে। অ্যান্টি অ্যালার্জি ওষুধ খেলে ভালো হয়। পথ্য হিসেবে আনারস, কাগজী লেবু, কালিজিরা ভর্তা দিয়ে গরম ভাত খুব উপকারী।

 

আরো পড়ুন : এই বর্ষায় কিছু নিয়ম মেনে চলুন, সুস্থ থাকুন

নিপা আহমেদ

বর্ষাকালে যতই বৃষ্টির আনন্দ থাকুক না কেন, অসুখ-বিসুখের প্রকোপ থেমে থাকে না। চার দিকে ভেজা ভেজা পরিবেশ। দেখা দিতে পারে নানা সমস্যা। সর্দি, কাশি, জ্বর, বর্ষার সাধারণ রোগ। এ ছাড়া রয়েছে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, জন্ডিসের মতো মারাত্মক রোগ। ডেঙ্গুর প্রকোপও দেখা দেয় এ সময়। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মতে, বর্ষাকালে আবহাওয়া থাকে স্যাঁতসেঁতে, সে কারণে কিছু রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। একটু সাবধানতা অবলম্বন করে চললেই এসব রোগ থেকে রক্ষা পেয়ে বর্ষা কাটিয়ে দেয়া যায় নিরুদ্বিগ্নভাবে। তাই বর্ষায় সুস্থ থাকতে হলে মেনে চলতে হবে কিছু নিয়ম।

- যাদের বৃষ্টির পানিতে ভিজলে ঠাণ্ডায় অসুস্থ হওয়ার সমস্যা থাকে, তাদের বৃষ্টিতে ভেজা থেকে দূরে থাকতে হবে। যদি বৃষ্টিতে ভিজে যান তাহলে যত দ্রুত সম্ভব ভেজা স্থান শুকিয়ে নিতে হবে। ভেজা কাপড় তাড়াতাড়ি পাল্টে নিতে হবে। বৃষ্টির পানি শরীরের যেখানেই লাগুক পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

- বর্ষায় চুলেরও যত্ন নিতে হবে। চুল ভেজা থাকলে গন্ধ ছড়ায়। এ ছাড়া ফাঙ্গাল ইনফেকশন ছড়াতে পারে। সে কারণে বৃষ্টিতে চুল ভিজলে বাসায় এসে চুল মুছে খোলা রেখে ধীরে ধীরে শুকিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়া হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্ষায় খুশকি সমস্যাও দেখা দেয়, সে কারণে একদিন পরপর শ্যাম্পু ব্যবহার করুন।

- বর্ষাকালে যে রোগ বেশি দেখা দেয় তা হলো সর্দি-কাশি বা জ্বর। সাধারণত সর্দি-কাশি, ভাইরাস জ্বর দু-এক দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। বেশি প্রয়োজন হলে প্যারাসিটামল-জাতীয় ট্যাবলেট খেলে কাজ হবে। জ্বর কয়েক দিন স্থায়ী হলে অবশ্যই ডাক্তার দেখাতে হবে।

- বর্ষায় যেসব রোগ হয় তা সাধারণত পানিবাহিত। অবশ্যই পানি ফুটিয়ে, ছেঁকে পান করতে হবে। গোসল, অজু, কুলি করা, হাত-মুখ ধোয়া, থালাবাসন ধোয়া, কাপড় ধোয়া ও রান্নার কাজে ব্যবহৃত পানি বিশুদ্ধ পরিষ্কার হতে হবে।

- যাদের অ্যাজমা বা সাইনাসের সমস্যা আছে, তাদের একটু বে+শি সতর্ক থাকতে হবে। শরীর ভেজা রাখা যাবে না। স্যাঁতসেঁতে ঘরে থাকা যাবে না। প্রচুর আলো-বাতাস আসে এমন ঘরে বাস করতে হবে।

- বর্ষায় সাধারণত চর্মরোগ বেশি হয়। চর্মরোগ থেকে বাঁচতে অবশ্যই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। হাত ও পায়ের নখ পরিষ্কার রাখা জরুরি। অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

- শিশুদের ক্ষেত্রে বর্ষায় বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ঠাণ্ডায় শিশুদের টনসিলের ব্যথা এমনকি নিউমোনিয়া হতে পারে। শিশুদের ডায়রিয়া হলে স্যালাইন খাওয়াতে হবে। বর্ষাকালে বাড়িতে খাবার স্যালাইন, প্যারাসিটামল-জাতীয় ট্যাবলেট হাতের কাছে রাখুন।

- সকালে ঘুম থেকে উঠে কুসুম গরম পানির সাথে মধু খেলে সারা দিন শরীর চাঙ্গা থাকবে। এ ছাড়া গোসলের সময় হালকা গরম পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।

- বর্ষায়ও প্রচুর ঘাম হয়ে থাকে। এ থেকে মুক্তি পেতে ঘাম হলেই মুছে ফেলতে হবে। ঘামের কারণে অনেকের পায়ের মোজা থেকে গন্ধ বের হয়। এর জন্য বারবার মোজা বদলে ফেলতে হবে। সুতি মোজা পরতে হবে। মোজা পরার আগে পায়ে ট্যালকম পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে গন্ধ কিছুটা কমবে। এ ছাড়া ভেজা পা যত দ্রুত সম্ভব শুকিয়ে ফেলতে হবে।

- বর্ষায় শহরাঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। এ সময় ডেঙ্গু যেন না ছড়ায় সে জন্য বাসার আশপাশে যেসব জলাধার বা পানি জমে এমন পাত্র সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে। ঘরের দেয়ালে যেন পানি পড়ে ফাঙ্গাস না জন্মায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঘর যাতে স্যাঁতসেঁতে হয়ে না থাকে সে ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ এ থেকে রোগবালাই হয় বেশি।

- বর্ষায় গ্রামাঞ্চলে পোকামাকড়, সাপ ও জোঁকের উৎপাত বেশি হয়, সে কারণে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

দেখুন:

আরো সংবাদ