২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বাংলার লটকন এখন সৌদি আরবে

ঘিওরের বাজারে বিক্রির জন্য আনা লটকন - ছবি : নয়া দিগন্ত

টক-মিষ্টি স্বাদের লটকন আমাদের দেশী ফল। বর্ষাঋতুর এই লটকন ফল বাঙালির মন জয় করে নিয়েছে। লটকন ফল খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনি এর চাষও লাভজনক। ফেরিওলা থেকে অভিজাত ফলের দোকানে এখন শোভা পাচ্ছে লটকন।
দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনাময় দেশীয় ফল লটকন দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি হচ্ছে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কদর বেড়েছে দেশেও। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে লটকন বাগানের আবাদ।
কৃষি অধিদফতরের বিভিন্ন সূত্রমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশ থেকে প্রায় সাড়ে ১৬ টন লটকন বিদেশে রফতানি হয়েছে।

চলতি অর্থবছরেও বিপুল পরিমাণ লটকন যাবে বিদেশে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় সাড়ে ২৮ হাজার টন লটকন উৎপাদন হয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি ও বাউ লটকনের দু’টি জাত উদ্ভাবন করেছে। বারি লটকন-১ ও বাউ লটকন-১ এখন কৃষক পর্যায়ে চাষ হচ্ছে।

দেশের সব এলাকাতেই এটি কমবেশি চাষ হয়ে থাকে। নরসিংদী, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, লালমনিরহাট, নেত্রকোনা, সিলেট প্রভৃতি এলাকায় ইদানীং বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লটকনের চাষ হচ্ছে। বাজারে লটকনের খুচরামূল্য ৬০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি। এক কেজিতে আকারভেদে ৩০ থেকে ৭০টি পর্যন্ত হয়। একটানা ১৮-২০ বছরের গাছে সর্বোচ্চ ফলন থাকে।

চাষিরা জানান, প্রকার ভেদে লটকন তিন হাজার থেকে সাড়ে হাজার টাকা মণ দরে পাইকারি বিক্রি করছেন। খুচরা দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। পাইকাররা বাগান থেকেই লটকন কিনে নিয়ে যাচ্ছে। 
মানিকগঞ্জের হিজুলী এলাকার লটকনচাষি গফুর মিয়া জানান, লটকন চাষ করতে বাড়তি কোনো জায়গার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আঙিনায় বা বড় বড় গাছের নিচে অধিক ছায়াযুক্ত জায়গায় লটকনের আবাদ করা যায়। লটকন চারা রোপণের উপযুক্ত সময় হচ্ছে এপ্রিল থেকে আগস্ট। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় লটকন গাছে ফুল আসে। তাই গাছে ফুল আসার আগে মার্চ মাসে গাছটির গোড়ার মাটি সামান্য কুপিয়ে তাতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার প্রয়োগ করে হালকা সেচ দিলে ফলন বৃদ্ধি পায় এবং ফলগুলোও আকারে বড় হয়।

বিভিন্ন ফলজ বৃক্ষের চারা কলম প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান বানিয়াজুরীর ‘সিফাত নার্সারি’র মালিক আব্দুর রশিদ জানান, লটকন গাছের রোগবালাই খুব একটা হয় না। লটকন গাছ অধিক ছায়াযুক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠায় মাঝে মধ্যে এ গাছে ছত্রাক জাতীয় আবরণ পড়ে। তখন ফলের ওপর ছত্রাকনাশক ওষুধ ছিটিয়ে ছত্রাক থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব। এতে ফলের রঙও উজ্জ্বল হয়। 

মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: লুৎফর রহমান জানান, ‘লটকন একটি ভিটামিনসমৃদ্ধ ফল। এই ফলে নানা রকম খনিজ উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ক্রোমিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম উল্লেখযোগ্য। এসব উপাদান শরীরকে সুস্থ রাখে। প্রতি ১০০ গ্রাম লটকনে ৯২ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়, যা আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। 

লটকনের ভেষজগুণও রয়েছে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক উত্তম পালিত বলেন, এটি অত্যধিক তৃষ্ণা নিবারণ ও বমির ভাব দূর করতে কার্যকর। শুকনো পাতার গুঁড়ো সেবনে ডায়রিয়া নিরাময় ও মানসিক চাপ কমে। কাজেই হাতের নাগালে থাকা দেশী ফলের স্বাদ যত বেশি আস্বাদন করা যায় ততই ভালো। 

লটকন সরাসরি খাওয়া ছাড়াও এটি দিয়ে জ্যাম তৈরি করা যায়। গাছের ছাল থেকে রঙ তৈরি করা হয়, যা রেশম সুতা রাঙাতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া লটকনের বীজ মূল্যবান রঙ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। সিল্ক, তুলা ও পোশাকশিল্পে এ রঙ ব্যবহার করা হয়।
সরকারি ও বেসরকারি কৃষি উন্নয়নবিষয়ক সংস্থাগুলো লটকন চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ ও সহযোগিতা করলে বাংলাদেশে লটকন চাষ বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্ট কৃষকরা মনে করেন।


আরো সংবাদ