১৭ আগস্ট ২০১৮

হেপাটাইটিস : লিভারে প্রদাহ

হেপাটাইটিস
লিভারের প্রদাহের নামই হেপাটাইটিস - সংগৃহীত

মানবদেহের অত্যন্ত জরুরি একটি অঙ্গের নাম যকৃত বা লিভার। লিভারের প্রদাহের নামই হেপাটাইটিস। হেপাটাইটিসের একটি প্রধান উপসর্গ হচ্ছে জন্ডিস। তাই অনেকেই জন্ডিস এবং হেপাটাইটিস একই বলে মনে করেন। জন্ডিস হেপাটাইটিসের প্রধান লক্ষণ হলেও জেনে রাখা ভালো যে, হেপাটাইটিস ছাড়া অন্য কারণ যেমন, হেমোলাইটিক অ্যানিমিয়া বা পিত্ত সঞ্চালনের পথে প্রতিবন্ধকতার জন্যও জন্ডিস হয়।

হেপাটাইটিস বিভিন্ন কারণে হয়। তবে তিন ধরনের হেপাটাইটিস বেশি দেখা যায়। এসব হেপাটাইটিস হলো ভাইরাল হেপাটাইটিস, ড্রাগ হেপাটাইটিস ও এলকোহলিক হেপাটাইটিস। নাম থেকেই যেমন বোঝা যায় ড্রাগ হেপাটাইটিস বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য এবং এলকোহলিক হেপাটাইটিস হয় মদ্যপান করার জন্য। ভাইরাল হেপাটাইটিস হয় ভাইরাসের সংক্রমণের জন্য। যেসব ভাইরাস হেপাটাইটিস তৈরি করে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি, ই এবং জি ভাইরাস। এসব ভাইরাসের বেশির ভাগই পানীয় বা খাদ্যের মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়। তাই এগুলো প্রতিরোধের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বিশুদ্ধ পানি এবং খাদ্য গ্রহণের বিকল্প নেই।

হেপাটাইটিস ভাইরাসের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ভাইরাস হচ্ছে- বি এবং সি। এদের সংক্রমণ সংক্রমিত ব্যক্তির রক্তের সংস্পর্শে আসা, রক্ত গ্রহণ এবং কোনো যন্ত্রপাতি যেমন- সিরিজ, শেভিং ব্লেড বা ডাক্তারি যন্ত্রপাতি এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সংসর্গের মাধ্যমে হয়। এ সব ভাইরাস আক্রান্ত মায়ের থেকে তার গর্ভের বাচ্চার শরীরেও জন্মগ্রহণের সময় ছড়াতে পারে। এই দুই ভাইরাসের ভয়াক দিক হলো এরা শরীরে কোনো লক্ষণ ছাড়াই দীর্ঘস্থায়ীভাবে ‘ক্রনিক কেরিয়ার’ হিসাবে থেকে যেতে পারে এবং লিভারের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ যেমন ক্রনিক হেপাটাইটিস, সিরোসিস, এমনকি লিভারের ক্যান্সারও করতে পারে। যখন লক্ষণ ছাড়া কারো শরীরে হোপাটাইসিসের জীবাণু থাকে তখন এই জীবাণু কারো অজান্তেই অন্যদের শরীরে ছড়াতে পারে।

হেপাটাইটিস রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে খাদ্যের অরুচি, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা এবং চোখ ও প্রসাবের রং হলুদ হয়ে যাওয়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়। তবে যাদের ক্রনিক হেপাটাইটিস বা সিরোসিস হয় তাদের শরীর আস্তে আস্তে খারাপ হয়ে যায়। পেটে পানি আসে, কখনো রক্তবমি হয় বা পায়খানার সাথে রক্ত যায় এবং এভাবেই আস্তে আস্তে রোগীর মৃত্যু হয়। এই রোগের আরো ভীতিকর দিক হলো যে, এই রোগের চিকিৎসা সুবিধা খুব সীমিত। ক্রনিক হেপাটাইটিস বা সিরোসিস হয়ে গেলে সম্পূর্ণভাবে সারানোর মতো চিকিৎসা নেই বললেই চলে; যাও কিছু আছে যেমন- ইন্টারফেরন, লিভার প্রতিস্থাপন ইত্যাদি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষেরই নাগালের বাইরে। তাই এই রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো এই রোগের প্রতিরোধ।

হেপাটাইটিস রোগের প্রতিরোধের জন্য দেশের সরকার ও জনগণ সবার ভূমিকাই মুখ্য। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নিয়োজিত কর্মীরা ছাড়া প্রতিটি সচেতন নাগরিকের এ ব্যাপারে নজর দেয়া দরকার। এই রোগের প্রসারের উপায় সম্বন্ধে সব নাগরিককে জানাতে হবে এবং কিভাবে প্রসার বন্ধ করা যায় তার ব্যাপারেও সবাইকে সচেতন করতে হবে। এই রোগের প্রসার বন্ধ করার কয়েকটি উপায় হলো :

-পরীক্ষার মাধ্যমে এসব ভাইরাসের অনুপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে কোনো রক্ত শীরে গ্রহণ না করা।
-অন্য কারও ব্যবহার করা সুই বা সিরিঞ্জ নিজে ব্যবহার না করা।
-সেলুনে অন্যের ব্যবহার করা ব্লেড দিয়ে সেভ না করা।
-কোনো ডাক্তারি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আগে সেসব যন্ত্রপাতির জীবাণুমুক্তকরণের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া।
-কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির (পুরুষ বা মহিলা) বা অজানা অবিশ্বস্ত ব্যক্তির সাথে যৌন সংসর্গ না করা।
-হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা নিলেও এই রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। অনেকেই এই টিকাকে জন্ডিসের টিকা বলে জানেন এবং তাদের ধারণা যে এই টিকা দিলে আর জন্ডিস হবে না। কিন্তু কথাটা হলো, এই টিকা নিলে মারাত্মক হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ হবে না। তবে অন্য কারণে জন্ডিস হতে পারে। অন্য মারাত্মক ভাইরাস হেপাটাইটিস-সির এখনো কোনো প্রতিষেধক টিকা পাওয়া যায়নি।


সুস্বাস্থ্যের জন্য খাবার

ডা: সেহেলী জাহান

যুগ যুগ ধরে যখন মানুষ আমিষ খেয়ে আসছে, তখন এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। কী সেই কারণ? প্রাথমিকভাবে আমিষ খাওয়ার কারণ অবশ্যই স্বাদ। আমিষ খাওয়া শুরু হয়েছিল যে সময়ে সেই সময় অবশ্য মানুষ কেবল পেটের ক্ষুধা মেটাতেই শিকার করত এবং গোশত খেত। কিন্তু আগুন আবিষ্কারের পর কোনো সন্দেহ নেই গোশত খাওয়ার প্রধান কারণ স্বাদ। নানা উপায়, নানা কায়দায় খাওয়া হয় নানা ধরনের গোশত।

গোশত খাওয়ার প্রধান কারণ প্রোটিন। আমিষ তথা গরু, ভেড়া, ছাগল, হরিণ ও মাছ প্রভৃতি থেকে পাওয়া যায় প্রাণিজ প্রোটিন, যার প্রয়োজন কোষের পুষ্টির জন্য। আমরা জানি শিশু বড় হয়ে ওঠার সময় তো বটেই, বয়সীদেরও কোষ বিভাজন হচ্ছে অনবরত। আর এই কোষের পুষ্টির জন্য, কোষ তৈরির জন্য প্রয়োজন প্রোটিনের। বলে রাখা প্রয়োজন, যে প্রোটিনে অ্যামাইনো অ্যাসিড আছে সেটি সম্পূর্ণ প্রোটিন। আর আমিষ প্রোটিনেই আছে অ্যামাইনো অ্যাসিড। আমিষের দ্বিতীয় গুণ হলো এর মধ্যে ভিটামিন বি-১২ এর উপস্থিতি। যার প্রয়োজন শরীরের মধ্যে যাওয়া খাদ্যসম্ভার থেকে লোহা টেনে নিয়ে হজম করানো। প্রোটিনের অর্থাৎ প্রাণিজ প্রোটিনের তৃতীয় গুণ হলো এটি শক্তি অর্থাৎ এনার্জি প্রদানকারী।

বাঙালিসহ পৃথিবীর বহু দেশের মানুষ মনে করে আমিষ, প্রোটিন ছাড়া শরীর সুস্থ রাখা অসম্ভব। আমাদের দেশে প্রচলিত আছে যারা বেশি মাথার কাজ করেন তাদের জন্য এই প্রাণিজ পুষ্টি অত্যন্ত জরুরি। প্রাণিজ প্রোটিন ছাড়া যে শরীর সুস্থ রাখা যায় এবং সহজেই তা সম্ভব তার প্রসঙ্গে এবার বলা যাক। নিরামিষ খেয়ে যে মাথা মোটাদের সংখ্যা বাড়ে না তার প্রমাণ পাওয়া যাবে ভারতে নিরামিষ খান এমন মানুষের এলাকায় গেলে। পরিসংখ্যান বলে সেখানে ঘাটতি পড়ে না ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বৈজ্ঞানিকের জোগান। মাথার অর্থাৎ মস্তিষ্কের পুষ্টির জন্য কখনোই আলাদা করে প্রাণিজ প্রোটিন প্রয়োজন হয় না। সুষম খাদ্য পেলে শরীরের অন্যান্য অংশের মতোই মস্তিষ্কের পুষ্টি সাধন হবে। আর শরীরের জন্য? সবাই অবশ্যই জানেন গরু, হাতি, গণ্ডার প্রভৃতি প্রাণীর শরীরের ওজন ওয়েইং স্কেলের বেশ ওপরের দিকেই যাবে। এই বিশাল বপুর জন্তুদের শরীর কিন্তু পুষ্ট ও সুস্থ থাকে কেবল নিরামিষ ভক্ষণেই।

এবার বলে নেয়া যাক প্রাণিজ প্রোটিনের বিকল্পগুলো। প্রাণিজ প্রোটিনে থাকা ভিটামিন বি-১২ অতি সহজেই পাবেন দুধে, যা সহজেই আপনার শরীরে থাকা লোহাকে হজম করিয়ে দেবে। আর এনার্জি? সহজেই পাওয়া যাবে কার্বোহাইড্রেট বা চিনিজাতীয় খাদ্য। নিরামিষাশীদের সংখ্যা বাড়ছে। সারা পৃথিবী এখন ঝুঁকছে নিরামিষ খাদ্যের দিকে। ভাবলে অবাক হতে হয়, কিন্তু এটাই সত্যি, এটাই ঘটনা। প্রাণিজ প্রোটিন যারা গ্রহণ করেন না, তারা অনেক বেশি সুস্থ থাকেন। একটা ছোট্ট পরিসংখ্যানের দিকে চোখ রাখুন, ব্রিটেনে একজন আমিষাশীর বছরে চিকিৎসার খরচ লাগে ৫৮.০৬২ পাউন্ডে। অথচ একজন নিরামিষাশীর চিকিৎসার খরচ বছরে মাত্র ১২,৩৪০ পাউন্ডে। এত গেল অর্থনৈতিক ফারাক, আর স্বাস্থ্য? যদি ১০০ জন আমিষাশী শারীরিক পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যান তা হলে তুলনায় মাত্র ২২ জন নিরামিষাশী শারীরিক সমস্যা নিয়ে হাসপাতালমুখী হন। বেশ কিছুদিন আগে সমগ্র ব্রিটেন এবং সেই সাথে প্রায় গোটা পৃথিবী কেঁপে উঠছিল একটি নামে ‘বোভাইন স্পঞ্জিফর্ম এনসেফালোপ্যাথি’। পুরো নামটা বোধহয় বোঝা গেল না, স্বাভাবিক। ‘ম্যাড কাউ ডিজিজ’ বললেই সবাই লাফিয়ে উঠবেন। এই ম্যাড কাউ ডিজিজের ফলে গত তিন বছরে ব্রিটেনে নিরামিষাশীদের সংখ্যা বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

এবার একটু অন্যতম তথ্যে আসা যাক। আমিষাশীরা নিরামিষাশীদের থেকে বেশি অসুস্থ হন। কিন্তু তা কী ধরনের?
- যারা নিরামিষ খান তাঁদের রক্তে কোলস্টেরলের মাত্রা অনেক কম। আমিষাশীদের তুলনায় ২০% কম। ফলে নিরামিষ যারা খান তাদের হৃদরোগের আশঙ্কাও অনেক কম।
- গরু ও ভেড়ার মাংস এবং প্রচুর পরিমাণে মাছ খেলে পেটে ক্যান্সারের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়। খাদ্যনালীতে ক্যান্সারের অন্যতম কারণ মাংসের চর্বি।
- আমিষাশী মহিলারা স্তনের ক্যান্সারে ভোগেন তুলনামূলক অনেক বেশি।
- জাপান, রাশিয়া, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষরা মাছ খান বেশি। এদের পাকস্থলীতে ক্যান্সারও হয় বেশি।
- আমিষাশীদের পেটে পাথর জমে তুলনামূলক অনেক বেশি। এক হাজার জনের মধ্যে ২৫০ জনের পেটে পাথর জমে কেবল আমিষ খাওয়ার কারণে।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তামাক, মদ ও মাদকের প্রভাবে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। এরপরই মৃত্যুর বড় কারণ মাংস।

লেখক : অধ্যাপিকা ও বিভাগীয় প্রধান, নিউরোমেডিসিন, বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ


আরো সংবাদ