২০ অক্টোবর ২০১৮

নবজাতকের চর্মরোগ, কীভাবে সারিয়ে তুলবেন?

নবজাতকের চর্মরোগ
নবজাতকের চর্মরোগ - সংগৃহীত

ত্বকের যত্ন সম্পর্কে প্রত্যেক মায়ের সঠিক জ্ঞান রাখা একান্ত প্রয়োজন। মায়ের পেটের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে শিশু যখন জন্ম নেয় একটি সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে, তখন তার প্রতিক্রিয়াও নানারকম হতে পারে। যেমন - বেশি নরম কিংবা বেশি ঠাণ্ডা আবহাওয়া, মশা-মাছি বা পোকামাকড়ের কামড় বা বেশি তেল সাবান মাখামাখির কারণে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে চামড়ার গুরুতর সমস্যা হতে পারে।

শিশুর জন্মের পর দেখা যায় নানা রকম জন্মদাগ। এতে ঘাবড়ানোর কিছুই নেই। এগুলো কোনো ক্ষতি করে না বা চিকিৎসার দরকার নেই। শিশুর গাল, নাক, মাথার পেছন ভাগে, হাতে পায়ে বাদামি রঙের ছোপের মত উঁচু স্থান দেখা যায় একে হিমানজিওমা বা রক্তের টিউমার বলা হয়। এটির জন্য কোনো চিকিৎসা বা অপারেশনের দরকার হয় না, আস্তে আস্তে কয়েকমাসের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়। জন্মের পরপরই চামড়ার কিছু পরিবর্তন দেখা দেয় যা স্বাভাবিক। যেমন : চামড়া উঠা, চামড়ার ময়লা উঠা ইত্যাদি। এ সময় বেশি তেল, মাজন কোনোটাই লাগানো ঠিক নয়।

শিশুর জন্মের প্রথম দু’একদিনের ভেতর যে সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তা হচ্ছে- ইরাইথেমা টক্সিকাম নিওনেটোরাম (Erythema toxicum neonaturum) বা মাসিপিসি। এক্ষেত্রে শিশুর দেহে লাল লাল ভাব র‌্যাশের আকারে ফুটে উঠে। সাধারণত, মুখমণ্ডল, বক্ষপিঞ্জরের ত্বক, হাত-পায়ের ত্বকে গুটি গুটি দানার মতো উঠে এবং সাথে কোনো রকম জ্বর বা অন্যরকম অসুস্থতা থাকে না। ১০ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। এক্ষেত্রে চিকিৎসার কোনো প্রয়োজন হয় না।

শিশুর মুখ, কপাল ও থুতনিতে ছোট ছোট মুক্তোর মত সাদা বা তলপেটে ফুসকুড়ির মতো অসংখ্য দানাকে ডাক্তার ভাষায় বলা হয় মিলিয়া এগুলোরও চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না।

শিশুদের আরো কতগুলো চর্মরোগ দেখা দেয় তার মধ্যে সেরোরিক অ্যাকমিজা, ডায়াপার র‌্যাশ, খোসপাঁচড়া, ব্রাস, ফাঙ্গাস ইনফেকশন, ভাইরাস ইনফেকশন, ইসপেটিশে প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

সিরোবিক অ্যাকজিমা শিশুদের মাথায়, ভ্রুণ, নাকের ভাঁজে, ঠোঁটে কানের পেছনে, বুকে, বগলে, নাভীতে, কুচকিতে, পেছনের ভাঁজে দেখা দেয়। মাথায় চটচটে আঠালো খুশকির মতো কখনো লেগে থাকে, সহজে উঠতে চায় না। এক্ষেত্রে শিশুকে তেল দেয়া যাবে না। কখনো কখনো সাদা খোসা শরীরের অন্য জায়গা থেকে ঝরে পড়ে সমস্ত গায়ে ছড়িয়ে পড়ে চামড়া লাল হয়ে যায়। পানি নিঃসরণ হয় ও চুলকানি হয়। এ ধরনের সমস্যায় সেলসান শ্যাম্পু ব্যবহার করা হয়। স্টেরয়েড ক্রিম ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। সাথে অ্যান্টিবায়োটিক সিরাপ দেয়া হয়। ছত্রাকের মধ্যে ক্যানডিডা শিশুদের বেশি ভোগায়। জন্মের সময় মায়ের সংক্রমণ শিশুদের সংক্রমিত করে।

যেমন- সাদা আস্তরণ জিহ্বা ও গালের ভেতর দেখা যায়। মুখের ভেতর থেকে ঠোঁটের কোণায় চলে আসে। মুখ ছাড়া ক্যানডিডা শিশুদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে, ভাঁজগুলোতে বেশি হয়। যেমন: গলার ভাঁজে, বগলে, ঘাড় কুচকিতে ও প্রস্রাব পায়খানায় রাস্তার চতুর্দিকে বেশি দেখা দেয়। চিকিৎসার জন্য ক্লোট্রিমাজল, নিস্টাটিন মলম ও ড্রপ দেয়া হয়।

অ্যাটোপিক ডারসাটাইটিসি হলে শিশুর মুখ, হাত পা অনেক সময় সারা শরীরে থমথমে চুলকানি দেখা দেয়। কোনো বিশেষ অ্যালার্জিজনিত খাবার, ধুলাবালি থেকে শুরু হতে পারে। এ ধরনের চুলকানিতে সাবান তেল, ব্যবহার না করাই ভালো। বিশেষজ্ঞের পরামর্শে চিকিৎসা নেয়া উচিত।

ন্যাপকিন র‌্যাশ
শিশুদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। শিশুরা বারবার প্রস্রাব-পায়খানা করে ভেজায় বলে মায়েরা ডায়পার পরিয়ে থাকেন। সবসময় খেয়াল রাখা উচিত যে ভেজানো মাত্র পরিবর্তন করতে হবে। দীর্ঘ সময় পরিয়ে রাখলে ওর মধ্যে জমে থাকা প্রস্রাবের ইফরিয়া ও পায়খানার জীবাণু মিলে অ্যালার্জি সৃষ্টি করে থাকে এবং ন্যাপকিনে ঢাকা জায়গায় র‌্যাশের সৃষ্টি করে। র‌্যাশের পাশাপাশি ছত্রাক আক্রমণ করতে পারে। এমতাবস্থায় কিছুদিন পর পর ডায়াপার বাদ দিয়ে জায়গা শুকনা রাখতে হবে এবং অ্যান্টিফাংগাল মলম ব্যবহার করতে হবে।

খুজলী পাঁচড়া
ছোট বড় সব শিশুরাই আক্রান্ত হতে পারে। ঘনবসতি, দ্রারিদ্র্যতা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও রোগীর সংস্পর্শে আসলে এ রোগ হতে পারে। অসহনীয় চুলকানি হয়। হাতের আঙ্গুলের ভাঁজে, চিপায়, কব্জিতে, পেটে এবং পেছনের দিকে হয়ে থাকে। পরে পেকে যায় সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যথা হয়, জ্বর আসতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না করালে কিডনিতে প্রদাহ, অ্যাকজিমা হতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শে scabisol, persithin, Tetmosol ব্যবহার করা হয়। চুলকানির জন্য হিস্টাসিন এবং পুঁজ হলে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয় ওজন অনুসারে।

ইসপেটিগো : শিশুর মুখে হাতে বা শরীরের কোন অংশে ছোট ছোট দানা হয়ে পেকে যায়।

আবটিকেরিয়া
শিশুর সমস্ত শরীরে লাল লাল চাকা হয়ে ভীষণ চুলকানি হয়। বিভিন্ন খাবারে অ্যালার্জি, কোনো ওষুধ, বেশি ঠাণ্ডা, গরম, পোকার কামড়, ফুলের রেণু থেকেও হতে পারে। এক্ষেত্রে অ্যান্টিহিস্টাসিন দিতে হবে এবং অ্যালার্জি পরিহার করতে হবে।

 

আরো পড়ুন : শিশুর পাইলস এবং চিকিৎসা

অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক

শিশুদেরও পাইলস হয়। তবে প্রকৃত পাইলস শিশুদের কম হয়। অভিভাবকেরা শিশুদের যে পাইলসের সমস্যা অর্থাৎ টয়লেটে রক্ত গেলে চিকিৎসকের কাছে আসেন তাদের বেশিরভাগই পাইলস নয়। শিশুদের টয়লেটে রক্ত যাওয়ার প্রধান কারণ রেকটাল পলিপ। এটি এক ধরনের আঙুর ফলের মতো টিউমার, যা ক্যান্সার নয়। এ টিউমার থেকে প্রচুর রক্ত যায়। এগুলো এক বা একাধিক হতে পারে এবং এরূপ শত শত পলিপ থাকতে পারে যা থেকে সাধারণত রক্ত ও মিউকাস বা আম যায়। রোগীর অভিভাবকেরা মনে করেন, এটি রক্ত আমাশয় এবং ওষুধ দিয়ে ভালো করা যাবে।

রেকটাল পলিপ রোগের চিকিৎসা হচ্ছে এটিকে কেটে ফেলে দেয়া। রোগীকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে এটি করতে হয়। অভিভাবকদের ভয়, ছোট্ট শিশুকে অজ্ঞান করলে তার ক্ষতি হবে। কিন্তু বহু দিন রক্ত যাওয়ায় শিশুটি যে রক্তশূন্যতায় ভুগছে সেদিকে তাদের লক্ষ থাকে না। সবচেয়ে অসুবিধা হচ্ছে, দাদি-নানিরা অপারেশনের কথা শুনলেই একেবারে বেঁকে বসেন। তাদের ধারণা, এতটুকুন শিশুকে কখনো অজ্ঞান করা উচিত নয়। তারপর অনন্যোপায় হয়ে আধুনিক তরুণ বাবা-মা বিভিন্ন ডাক্তারের কাছে ধরনা দেন চিকিৎসায় এ রোগ ভালো করার জন্য। কিন্তু সেটি কোনো ডাক্তারের পক্ষেই সম্ভব নয়।

রেকটাল পলিপ অপারেশনের জন্য একজন শিশুকে কয়েক ঘণ্টা হাসপাতালে রাখলেই চলে। রোগীর পেট খালি করার জন্য আগের দিন কিছু ওষুধ দেয়া হয় যাতে পায়খানা পরিষ্কার হয়। খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর খালি পেটে অপারেশন করাই ভালো। এ জন্য রোগীকে ঘুম পাড়ানোর ইনজেকশন দিতে হয়। একটি বিশেষ ধরনের যন্ত্রের সাহায্যে টিউমারটি (পলিপ) কেটে আনা হয়। যেহেতু এ অপারেশনে মলদ্বারে কোনো কাটাছেঁড়া করা হয় না, তাই অপারেশনের পর ব্যথা হওয়ার প্রশ্নই আসে না। অপারেশনের দু-তিন ঘণ্টা পর রোগী স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া করতে পারে এবং সরাসরি বাসায় চলে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বহির্বিভাগের রোগী হিসেবে পরক্ষণেই চলে যেতে পারে।

শিশুদের জন্য একটি সমস্যা হয়। এতে পায়খানা শক্ত হলে মলদ্বার ফেটে যায় এবং ব্যথা হয়। কিছুটা রক্তও যেতে পারে। কিছুদিন পর মলদ্বারে একটি গ্যাজ দেখা যায়। শিশু টয়লেটে যেতে ভয় পায় ব্যথার কারণে। এ রোগটির নাম এনালফিশার। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক মল নরম করার জন্য ওষুধ দেন। পানি, সবজি, সালাদ খেলে উপকার পাওয়া যায়। পায়ুপথে মলম লাগানো যেতে পারে। চুলকানি হলে কৃমির ওষুধও দিতে হবে। জন্মের পরপরই যেকোনো সময় এ রোগ হতে পারে। সর্বকনিষ্ঠ এক মাস ১০ দিনের শিশুকে দেখেছি এ রোগে আক্রান্ত হতে। উপরোক্ত পদ্ধতি ও ওষুধ প্রয়োগেও ভালো না হলে অপারেশন করতে হয়।

মলদ্বারে শিশুদেরও হয় সেরকম আরেকটি রোগ হচ্ছে ফিস্টুলা বা ভগন্দর। এতে মলদ্বারের পাশে একটি মুখ থেকে পুঁজ ও রক্ত যায় এবং ব্যথা হয়। ১৭ মাসের একটি শিশুর এ রোগ দেখেছি। এ রোগের একমাত্র চিকিৎসা অপারেশন, তবে এটি শিশুদের খুব কম হয়।
মলদ্বারের প্রতিটি রোগের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা রয়েছে এবং এর প্রতিটিতেই সঠিক চিকিৎসায় সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করা যায়।

বড়দের যে রোগটি সবচেয়ে বেশি হয় সেটি হলো পাইলস। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে এখন ৮০-৯০ শতাংশ পাইলস রোগী বিনা অপারেশনে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেন। এ পদ্ধতির নাম হচ্ছে ‘রিং লাইগেশন’ পদ্ধতি। কোনোরূপ অবশ, অজ্ঞান না করেই চেম্বারেই এর চিকিৎসা করা হয়। যে ক্ষেত্রে অপারেশন দরকার সে ক্ষেত্রেও দু-তিন দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। অপারেশনের পর পাইলস আবার হয় এ ধারণা সম্পূর্ণ অমূলক। তবে দুই শতাংশ ক্ষেত্রে আবার হতে পারে। পেটে কৃমি থাকলে তার অবশ্যই চিকিৎসা করা উচিত। তবে কৃমির বাসা থেকে এ রোগের উৎপত্তি এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।

লেখক : বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ বিশেষজ্ঞ, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, (অব) কলোরেকটাল সার্জারী বিভাগ, বিএসএমএমইউ, ঢাকা।
চেম্বার : ইডেন মাল্টি-কেয়ার হসপিটাল, ৭৫৩, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৭৫৫৬৯৭১৭৩-৬


আরো সংবাদ