১৭ আগস্ট ২০১৮

ঘাড়ে, পিঠে ব্যথা! সামান্য চেষ্টাতেই পেতে পারেন মুক্তি

ঘাড়ে, পিঠে ব্যথা! সামান্য চেষ্টাতেই পেতে পারেন মুক্তি - ছবি : সংগৃহীত

শোওয়ার সময় সামান্য কিছু নিয়ম মেনে চললেই অনায়াসে ঘাড়, কোমড়, পিঠের ব্যথা এড়িয়ে চলা যায়। তাই আজই শোওয়ার সঠিক পদ্ধতি সম্বন্ধে জেনে নিন।

ব্যাক পেইন সাধারণত তিন ধরনের হয়। ঘাড়ের ব্যথা বা নেক পেইন অথবা সারভাইক্যাল লেভেলের পেইন, পিঠের ব্যথা বা থোরাসিক লেভেলের পেইন এবং কোমড়ের ব্যথা বা লাম্বার পেইন। সমীক্ষায় দেখা গেছে ৮০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো সময় লো ব্যাক পেইন-এ আক্রান্ত হয়েছেন। মানুষের কাছে এটি একটি সমস্যা বলা যেতে পারে। অনেক সময় সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এই ব্যথা বা লো ব্যাক পেইন বেশি লক্ষ করা যায়। ঘাড়ে বা থোরাসিক লেভেলেও কখনো কখনো এই ব্যথা দেখা যায়।
বেশ কয়েকটি কারণে ব্যাক পেইন হতে পারে। অন্যতম কারণগুলো হলো—

 পেশির দুর্বলতা।
 সারভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসিস অর্থাৎ ঘাড়ে স্পন্ডাইলোসিস।
 লাম্বার স্পন্ডাইলোসিস, লাম্বার ফ্যাসেট জয়েন ডিস ফাংশন।
 থোরাসিক লেভেল অর্থাৎ পিঠের ফ্যাসেট জয়েন্ট ডিস ফ্যংশান।
 সর্বপরি সফট টিসুর ডিস ফাংশান।

ব্যাক পেইন বা ব্যথা থেকে দূরে থাকতে কতকগুলো নিয়ম মেনে চলা উচিত—
 সারা দিনে কখনোই অতিরিক্ত ওজন তুলবেন না।
 অতিরিক্ত হাঁটবেন না।
 শোওয়ার সময় আরাম অনুভূত হচ্ছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
 কখনো খুব নরম বা খুব শক্ত বিছানা ব্যবহার করবেন না।
 অবশ্যই শোওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম মানবেন।
 সারা দিন শরীরের পশ্চার ঠিকভাবে মেনে চলুন।

শোওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চললে আপার ব্যাক পেইন বা ঘাড়ের ব্যথা, কোমড়, পিঠের ব্যথা এড়িয়ে চলা যায়। শোওয়ার সময় এগুলি মেনে চললে ঘুমও ভালো হয় ব্যথা থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়—

কাত হয়ে শোওয়া :
একপাশে কাত হয়ে শুতে পারলে ভালো। ঘাড় যেন বিছানার সংস্পর্শে থাকে। পুরো দেহটাও বিছানার সংস্পর্শে রাখতে হবে। দুই হাঁটুর মাঝখানে একটি নরম বালিশ দিলে আরাম অনুভূত হয়। ঘুম ভালো হবে। ব্যথা থেকেও দূরে থাকা যাবে। কোমড় ও বিছানার মাঝে ফাঁকা থাকলে নরম তোয়ালে ভাঁজ করে দিলে হিপ-পেলভিস-স্পাইন অর্থাৎ নিতম্ব-তলদেশ-মেরুদণ্ড একই সমান্তরাল থাকবে আর সাপোর্টও পাবে। এতে যেমন আরাম অনুভূত হবে তেমনই ব্যথার ভয়ও থাকবে না। পেশিও আরামদায়ক অবস্থায় থাকবে। মনে রাখবেন যেদিকে কাত হয়ে শোবেন, সেদিকের কাঁধে চাপ না দিয়ে একটু সামনের দিকে কাঁধকে প্রসারিত করে রাখুন। যাতে সরাসরি শরীরের ভার কাঁধে না পড়ে।

হাঁটুকে বুকের কাছে ভাঁজ করে একপাশে শোওয়া :
হাঁটুকে একটু বুকের কাছে ভাঁজ করে নিয়ে একপাশে কাত হয়ে শুয়ে থাকলে একদিকে যেমন আরাম পাওয়া যায়, তেমনই ঘুমও ভালো হয়। অনেকটা মায়ের গর্ভে যেমন অবস্থায় থাকে ঠিক তেমন।

অনেক সময় স্পাইন-এ দু’টি ভাটির্ব্রা বা কশেরুকার মাঝখানে যে ডিক্স থাকে সেই ডিক্স-এর মধ্যে চাপ বেড়ে গিয়ে ডিক্স তার জায়গা থেকে সরে যায়। ফলে নার্ভ ফাইবারগুলোতে চাপ পড়ে ব্যথা অনুভূত হয়। এক্ষেত্রে সকালে ঘুম থেকে উঠলে পায়ের দুর্বলতা অনুভূত হতে পারে। এই ভঙ্গিতে শুয়ে থাকলে স্পাইন বা শিরদাঁড়ার মধ্যে কিছুটা জায়গা তৈরি হয়। যার ফলে চাপ কমে গিয়ে আরাম অনুভূত হয় ও ঘুম ভালো হয়। ব্যথাও থাকে না।

উপুর হয়ে শোওয়া :
উপুর হয়ে শোওয়ার অভ্যেস আছে অনেকেরই। কিন্তু এভাবে শোওয়ার ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, পেলভিস অর্থাৎ তলদেশ ও লোয়ার অ্যাবডোমেনের বা তলপেট বিছানার মধ্যে যেন ফাঁক না থাকে। প্রয়োজনে ফাঁকা স্থানে নরম বালিশ বা অন্য কিছু দিতে হবে। যাতে আরামদায়ক মনে হয়। এতে মেরুদণ্ডের গঠন সঠিকভাবে একই লাইনে ও সাপোর্টে থাকবে।

যাদের ডি জেনারেটিক ডিক্স-এর সমস্যা থাকলে লাভবান হবে। এই ভঙ্গিতে শুলে ডিক্সে যে প্রেশার তৈরি হয়, সেই প্রেশার অনেকটা কমে যায়। ফলে ঘুমও ভালো হয়।

চিত হয়ে শোওয়া:
চিত হয়ে শোওয়ার সময় হাঁটুর নিচে একটি নরম বালিশ দিয়ে দিলে তা মেরুদণ্ডের পক্ষে খুবই ভালো। ঘাড়ের নিচেও একটি তোয়ালে ভাঁজ করে দিতে হবে। পারলে তোয়ালেকে বালিশের কভারের মধ্যে ঢুকিয়ে দিন, যাতে সরে না যায়। এর ফলে মেরুদণ্ড সোজা ও সমান্তরাল থাকবে এবং মেরুদণ্ড পুরোপুরি সাপোর্ট পাবে। এভাবে শোওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধাও আছে যেমন— এই ভঙ্গিতে শোওয়ার ফলে শরীরের ওজন বা প্রেশার সারা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় সমভাবে ছড়িয়ে যায়। ফলে মেরুদণ্ডের বিভিন্ন ভাট্রিব্রার উপর চাপ কম পড়ে। ভাটিব্রার মাঝে থাকা ডিক্সও আরাম পায়। ভাটিব্রাগুলি সোজা থাকে ও পাশের পেশিগুলিও সতেজ থাকে। এর আশপাশে যে অঙ্গ আছে সেগুলিও প্রেসার ছাড়া থাকতে পারে। ফলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর খুব আরামদায়ক মনে হবে। এভাবে শোওয়ার ফলে কোনো পেশিই চাপে থাকে না।

স্পন্ডাইলোলিসথেসিস রোগীদের ক্ষেত্রে একটা ভাটিব্রা আর একটা ভাট্রিবার উপর দিয়ে স্লিপ করে চলে যায়। ফলে একটি গ্যাপ তৈরি হয় ও স্পাইনের ভাট্রিবার অবস্থান পরিবর্তন হয়। রিক্লাইনিং পজিশনে শুলে রোগীদের ক্ষেত্রে ভালো। ফলে বিছানাটা অনেকটা ইনক্লাইন্ড পজিশনে নিলে সুবিধা পাওয়া যায়। কারণ এটা ট্রাঙ্ক এবং থাইয়ের মধ্যে অ্যাঙ্গেল তৈরি করে মেরুদণ্ডের ওপর চাপ অনেকাংশেই কমিয়ে দিতে সাহায্য করে।
 বালিশ কেমন হওয়া উচিত?

বালিশ এমন হওয়া উচিত, যা ঘাড়কে সাপোর্ট দেবে, মাথাকে সাপোর্ট দেবে, শিরদাঁড়ার উপরের অংশকে সাপোর্ট দেবে ও আরাম দেবে। কাত হয়ে শোওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে ঘাড় যেন ঝুলে না থাকে, ঘাড় ও দেহ যেন বালিশ ও বিছানার সঙ্গে স্পর্শ থাকে। প্রয়োজনে বালিশের সঙ্গে একটি তোয়ালে ব্যবহার করতে হবে। যাতে মাথা ও শিরদাঁড়া যেন একই লাইনে থাকে।

ম্যাট্রেস বা গদি কেমন হওয়া উচিত?
ম্যাট্রেস বা গদি দু’ প্রকার সফট ও ফার্ম অর্থাৎ নরম ও শক্ত। ম্যাট্রেস সবসময় শরীরের সঙ্গে মানানসই হওয়া উচিত। লক্ষ রাখতে হবে গদি যেন সব সময় আরামদায়ক হয়। গদির প্রকৃতি সব সময় চেহারার ওপর নির্ভর করবে। যাদের নিতম্ব কোমড়ের থেকে চওড়ায় বড়, তাদের জন্য সফট ম্যাট্রেস বা নরম গদি উপযুক্ত। কারণ এই ধরনের সফট ম্যাট্রেস শিরদাঁড়াকে ঘুমানোর সময় সোজা রাখতে সাহায্য করে। ফলে শিরদাঁড়া পুরোপুরি সাপোর্টে থাকে ফলে ব্যথাকে এড়ানো যায়। কিন্তু যাঁদের নিতম্ব এবং কোমড় সমান্তরালে থাকে বা একই লাইনে থাকে তাদের তুলনামূলকভাবে শক্ত ম্যাট্রেসে শোওয়া সুবিধাজনক। কারণ এই ধরনের ম্যাট্রেস শিরদাঁড়াকে বেশি সাপোর্ট দেয় এবং শিরদাঁড়ার পশ্চারও ঠিক রাখে। অনেক সময় চিকিৎসকেরা সফট ম্যাট্রেস বা নরম গদি এড়িয়ে চলতে বলেন। কারণ, শরীরের কোন অংশ সফট ম্যাট্রেসের মধ্যে বেশি ঝুঁকে যায় ফল শিরদাঁড়ার জয়েন্ট ঘুরে বা টুইস্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যার ফলে বেশি ব্যথা হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। সেজন্য সফট ম্যাট্রেস ব্যবহার করলে সাবধানতা অবলম্বন করুন।

বিছানায় যাবার সময় ও বিছানা থেকে ওঠার সময় কিছু সাবধানতা
বিছানায় শুতে যাবার সময় তাড়াহুড়ো শারীরিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে কিছু নিয়ম মেনে চলা উচিত যা সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। বিছানায় যাবার সময় কখনই কোমড় থেকে সামনে ঝুঁকে যাওয়া ঠিক না। তাড়াহুড়ো করে বা লাফিয়ে বিছানায় যাওয়ায় শিরদাঁড়ার কোনও অংশ ও পেশিতে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। তাই বিছানা থেকে বেড়নোর সময় একপাশে কাত হয়ে (যে পাশে কাত তার উল্টো হাতে চাপ দিয়ে) আস্তে আস্তে উঠে পা ঝুলিয়ে রেখে কয়েক সেকেন্ড পর দু’হাত দিয়ে বিছানায় চাপ দিয়ে নেমে পড়লে পেশিতে বা জয়েন্টে চাপ কমানো যায়।

ঘাড়ে সটকা লাগলে বা ব্যথা হলে :
অনেক সময় সারা রাত ঘাড় যদি সাপোর্ট না পেয়ে থাকে সেক্ষেত্রে ঘাড়ে ব্যথা অনুভূত হয়। ঘাড়ের পেশি ক্লান্ত হয়ে যায়। শিরদাঁড়া বা পেশিতে ঝটকা লেগে ব্যথা হতে পারে। ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে বা শরীরের ব্যথা কমাতে ঘাড়ের অবস্থান ঠিক রাখা প্রয়োজন। সে কারণে সঠিক বালিশ ব্যবহার করুন এবং ভালো ফিজিওর পরামর্শে সঠিক ব্যায়াম করুন।

 


আরো সংবাদ