১৪ আগস্ট ২০১৮

সাবধান! সাপে কামড়ালে এই কাজগুলো ভুলেও করবেন না

সাপ
সাপের কামড় - সাপ

সর্পদংশন আমাদের দেশে এক জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসমস্যা। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় আট হাজার মানুষ সর্পদংশনের শিকার হন। যদিও আধুনিককালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সর্পদংশনের চিকিৎসা করা হয়। তথাপি আমাদের জনসাধারণের ঐতিহ্যগত লোক চিকিৎসার প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস ও পাশাপাশি চিকিৎসা পেশায় জড়িতদের সর্পদংশনের বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে সর্পদংশনের শিকার প্রায় ২০ শতাংশ লোকই মৃত্যুবরণ করেন। অথচ সর্পদংশনের প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি চিকিৎসকদের সর্পদংশনের বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার সাথে পরিচিত করার মাধ্যমে এই মৃত্যুর হার অনেকাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। নিম্নে সর্পদংশনের প্রাথমিক চিকিৎসার কতিপয় করণীয় ও বর্জনীয় কাজের তালিকা দেয়া হলো।

করণীয় : (১) সর্পদংশনে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সর্পদংশনের নিরাময়যোগ্য আধুনিক চিকিৎসার ব্যাপারে আশ্বস্ত করুন। কারণ সর্পদংশনে আক্রান্ত ব্যক্তি মৃত্যুভয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন থাকেন। (২) পা আক্রান্ত হলে হাঁটা যাবে না। (৩) হাত আক্রান্ত হলে এড়িয়ে চলতে হবে হাতের সমস্ত নড়াচড়া। (৪) প্রয়োজনে আক্রান্ত হাত বা পায়ের সাথে একটি বন্ধফলক এঁটে দিয়ে তা উপযুক্ত বাঁধন যেমন : দড়ি, গামছা প্রভৃতি দ্বারা বেঁধে রহিত করতে হবে সব নাড়াচাড়া। কারণ আক্রান্ত স্থানের অযাচিত নাড়াচাড়া পুরো শরীরে বিষ ছড়ানোর জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করে। (৫) যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর মানসিক স্বস্তির লক্ষ্যে লোক সমাজে বহুল প্রচলিত দুটি পট্টি যথাক্রমে আক্রান্ত স্থানের কিছুটা আগে ও পরে এমনভাবে বাঁধতে হবে যে, যার মধ্য দিয়ে হাতের কনিষ্ঠা আঙুল সহজে প্রবেশ করানো যায়। এতে করে পায়ের রক্ত সঞ্চালনে কোনো রূপ বিরূপ প্রভাব পড়ে না। যদিও আধুনিক চিকিৎসায় এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তদুপরি চন্দ্র বোড়া সাপের দংশনে এর ব্যবহার পুরোপুরি নিষেধ। (৬) সেই সাথে আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উন্নত চিকিৎসার জন্য নিকটস্থ উপযুক্ত হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে।

বর্জনীয় : (১) আক্রান্ত স্থানের আগে ও পরে দুই বা ততধিক পট্টি শক্ত বাঁধা। কারণ এতে আক্রান্ত স্থানে রক্তের প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। এমনকি আক্রান্ত স্থানে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। (২) আক্রান্ত স্থান ও এর চারপাশে ধারালো জিনিস দিয়ে চেরার মাধ্যমে বিষ ঝরানোর ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে অযাচিত রক্ত ঝরানো। (৩) আক্রান্ত স্থানে চেরার মাধ্যমে রক্ত ঝরানোর পর তা মুখ বা মুরগির বাচ্চার পায়ুপথ (ক্লোয়াকা) দ্বারা চোষানো। (৪) কোনো দহনকারক পদার্থ যথা- কার্বলিক এসিড দ্বারা আক্রান্ত স্থান পোড়ানো। (৫) আক্রান্ত স্থানে বিষ শোষণকল্পে বিভিন্ন লতাগুল্মের লেই কিংবা গোবর বা কাদামাটি লাগানো। কারণ এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং আক্রান্ত স্থানে তা বিভিন্ন জীবাণুঘটিত জটিল সংক্রমণ তৈরি করতে পারে। (৬) আক্রান্ত ব্যক্তিকে তেল, ঘি, গোলমচির কিংবা বিভিন্ন লতাগুল্মজাতীয় পদার্থ খাওয়ানোর মাধ্যমে বমি করানো। (৭) আক্রান্ত স্থানে বিষ শোষণকল্পে পাথর, বীজ বা লালা প্রয়োগ করা।

 

লাজুক সাপের এক ছোবলে মৃত্যুর কোলে শত মানুষ

ভারতে সম্প্রতি সাপের কামড়ে এক নারী ও তার তিন বছর বয়সী কন্যাসন্তান মারা গেছেন। সাপের আক্রমণের শিকার হয়েছেন বুঝতে না পেরে তিনি তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে শুরু করেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে মারা যান দু'জনই।

এ খবরটি এমন একটি দিনে পাওয়া যায় যেদিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাপের দংশনের ঘটনাকে "বিশ্ব স্বাস্থ্য অগ্রাধিকার" হিসেবে বিবেচনা করার ঘোষণা করে।

প্রতিবছর ৮১ হাজার থেকে এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষ সাপের কামড়ে মারা যান, যার প্রায় অর্ধেক মৃত্যুর ঘটনাই ঘটে ভারতে।

কতটা গুরুতর এই সমস্যা?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়, যদিও সেসব ঘটনার অর্ধেকের কিছু বেশি ক্ষেত্রে আক্রমণ হওয়া ব্যক্তির শরীরে বিষ প্রবেশ করে।

সাপের আক্রমণের শিকার হওয়ার পর সারাবিশ্বে লক্ষাধিক মানুষ অন্ধত্ব বা চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এসব ঘটনাকে গ্রীষ্মপ্রধান এলাকার সবচেয়ে উপেক্ষিত ব্যাধি বলে আখ্যা দিয়েছে।

সাব-সাহারান আফ্রিকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে।

দরিদ্র গ্রামবাসীরা সাধারণত সাপের কামড়ের ভুক্তভোগী হয়ে থাকেন। অনেক সময় প্রতিষেধক ও আধুনিক চিকিৎসার সুব্যবস্থা না থাকায় সনাতন পদ্ধতিতে চিকিৎসা করার কারণে দরিদ্র গ্রামবাসীদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি থাকে।

সাপের আক্রমণের হার প্রবল এমন অনেক দেশেরই নিজেদের প্রতিষেধক তৈরির ব্যবস্থা নেই। বিষক্রিয়ার প্রভাব দূর করতে বা কমাতে সাধারণত দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী সাপের আক্রমণ সংক্রান্ত বিষয়ে সব দেশে একই পদ্ধতিতে চিকিৎসা, প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

বিষাক্ত সাপ কামড় দিলে কি হয়?

বিষাক্ত সাপকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

স্থায়ী দাঁতসহ সাপের বিষে সাধারণত নিউরোটক্সিক বিষ থাকে যা স্নায়ুতে আঘাত করে ও শ্বাস-প্রশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অন্যান্য প্রজাতির সাপের দাঁত লুকানো থাকে যা সাধারণত শিকার করার সময় বা শত্রুকে আক্রমণ করার সময় ব্যবহৃত হয়। এই ধরণের সাপের আক্রমণে চামড়ার টিস্যু ক্ষিতগ্রস্ত হয় ও শরীরে অভ্যন্তরীন রক্তপাত হয় থাকে।

কোন সাপের বিষ সবচেয়ে বিষাক্ত?

কোন সাপের বিষ সবচেয়ে বিষাক্ত ও কোন ধরণের সাপ মানুষের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর তা নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

মাটিতে বসবাস করা যে কোনো সাপের মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ তাইপানের বসবাস অস্ট্রেলিয়ায়।

বলা হয়, এই সাপের এক ছোবলে যে পরিমাণ বিষ উদগীরণ হয় তা দিয়ে এক শ' জন মানুষ মারা যেতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এই প্রজাতির সাপের দংশনে কোনো মানুষ মারা গেছে এমন খবর পাওয়া যায়নি।

এই প্রজাতির সাপ সাধারণত লাজুক প্রকৃতির হয়ে থাকে এবং দুর্গম জায়গায় বাস করে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় এর প্রতিষেধকও সহজলভ্য।

সামুদ্রিক সাপও অত্যন্ত বিষাক্ত হয়। তবে মানুষের সংস্পর্শে কম আসার কারণে এই সাপের কামড়ের ঘটনা বিরল।

অপেক্ষাকৃত কম বিষাক্ত কিন্তু অত্যন্ত বিদজনক ব্ল্যাক মাম্বা ও উপকূলীয় তাইপান (অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়) মানুষের জন্য বেশি ঝুঁকির কারণ।

এ দুই ধরনের সাপই একই প্রজাতির এবং তাদের বিষ খুবই দ্রুত কাজ করে। সঠিক চিকিৎসা করা না হলে এই ধরণের সাপের কামড়ের শিকার ব্যক্তি আধা ঘণ্টার কম সময়ে মৃত্যুবরণ করতে পারে।

কোন সাপের কামড়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়?

সাপের আক্রমণের সংখ্যা ও মৃত্যুহারের হিসেবে, অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের ভাইপার (বোরা সাপ) সবচেয়ে বেশি বিপদজনক। পশ্চিম আফ্রিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশে এই ধরণের সাপ পাওয়া যায়। এরা সাধারণত অন্ধকারে আক্রমণ করে।

সাপের কামড়ে বিশ্বে প্রতিবছর মৃত্যুর ঘটনার অর্ধেকই ভারতে হয় বলে মনে করা হয়। ভারতে যে চার ধরণের সাপের আক্রমণে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় তাদের মধ্যে এই ভাইপার বা বোরা সাপ অন্যতম।

শীর্ষ চার প্রজাতির বাকিগুলো হলো :

ইন্ডিয়ান ক্রেইৎ বা কালাচ সাপ : যদিও দিনের বেলা এরা সাধারণত আক্রমণ না করলেও রাতে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। দৈর্ঘ্যে এরা ১.৭৫ মিটার (৫ ফুট ৯ ইঞ্চি) পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।

রাসেল'স ভাইপার : ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক এলাকায় এই আক্রমণাত্মক সাপ দেখতে পাওয়া যায়। ইঁদুর প্রজাতির প্রাণী এদের প্রধান খাদ্য, তাই শহর ও গ্রামের লোকালয়ের কাছে এদের পাওয়া যায়।

ভারতীয় কোবরা বা গোখরা সাপ : ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এই সাপ পাওয়া যায়। এরা সাধারণত রাতে আক্রমণ করে থাকে। এই ধরণের সাপের কামড়ে দেহে অভ্যন্তরীন রক্তক্ষরণ হয়।

সাপ কামড়ালে কি করা উচিৎ?

সাপের দংশনের শিকার হলে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের পরামর্শ অনুযায়ী যা করণীয় তা হোলো:

- শান্ত থাকুন এবং অতিদ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
- শরীরের যে স্থানে সাপ কামড়েছে সেটি যতটা কম সম্ভব নড়াচড়া করুন। ঘড়ি বা অলঙ্কার পড়ে থাকলে তা খুলে ফেলুন। কাপড়ের বাঁধ ঢিলে করুন, তবে খুলবেন না।

 

সাপ সম্পর্কে এই ধারণাগুলো ভুল

সাপ নিয়ে কৌতুহলের অন্ত নেই কারোই। বেশকিছু ভুল ধারণাও আছে আমাদের। সাপের ক্ষমতা সম্পর্কেও রয়েছে সেই ভ্রান্ত ধারণাই। আর তাই অনেক সময়ই ভয়ের থেকেই মৃত্যু হয় মানুষের।

অনেকেরই ধারণা, হাসনাহানা বা সুগন্ধি ফুলের গন্ধে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসে সাপ। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা। সাপের ঘ্রাণ শক্তি অত্যন্ত দুর্বল। তাই তারা কোনো ফুলের গন্ধই পায় না।

বীনের তালে সাপের নাচ দেখে অনেকেই মনে করেন, সাপ দেখতে পায়। কিন্তু, মজার ঘটনা সাপের দৃষ্টি শক্তিও অত্যন্ত দুর্বল। সাপের কান নেই। শোনার জন্য সাপ জিভ বের করে। এই কারণেই সাপকে ঘনঘন জিভ বের করতে দেখা যায়। এছাড়াও সাপের পেটের তলায় আঁশে একধরণের স্নায়ুতন্ত্র থাকে। এই আঁশের সাহায্যেই মাটি থেকে উচ্চমাত্রার কম্পনযুক্ত শব্দ সংগ্রহ করে সাপ মস্তিষ্কে চালান করে দেয়। এইভাবেই সাপ কোনো বস্তুর অবস্থান কত দূরে তা বুঝতে পারে।

বিশ্বে প্রায় তিন হাজার প্রজাতির সাপ আছে। আন্টার্কটিকা বাদে বিশ্বের সর্বত্রই সাপের দেখা মেলে।

সাপের খাদ্য তালিকায় থাকে ইঁদুর, পাখি, ব্যাঙ, বড় সাপ ছোট হরিণ, শূকর, বাঁদর। নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্যই সাপ আক্রমণ করে। তবে, আদতে এরা শান্ত ও নিরীহ প্রাণী।

৭০ শতাংশ প্রজাতির সাপই ডিম পাড়ে। সবথেকে বড় সাপ গ্রিন অ্যানাকোন্ডা, যা গড়ে ১৭ ফুট লম্বা হয়। সবথেকে ছোট সাপ বার্বাডোস থ্রেড স্নেক, মাত্র চার ইঞ্চি লম্বা হয় এ সাপটি। তবে, সবথেকে বড় বিষয় বিশ্বের বেশিরভাগ সাপই হয় নির্বিষ।


আরো সংবাদ