১৪ নভেম্বর ২০১৮

দুর্দান্ত খেলছে মেয়েরা, প্রধমার্ধে তিন গোলে এগিয়ে

দুর্দান্ত খেলছে মেয়েরা, প্রধমার্ধে তিন গোলে এগিয়ে - সংগৃহীত

গ্রুপ পর্বে দারুণ ফুটবল খেলেছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। দুই ম্যাচে ১৭ গোলে করে শেষ চারে উঠে লাল-সবুজের দল। সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফানালেও চমৎকার নৈপুণ্য দেখাচ্ছে তারা। স্বাগতিক ভুটানের বিপক্ষে প্রথমার্ধ শেষে তিন গোলে এগিয়ে আছে মারিয়া-মনিকারা।

ভুটানের রাজধানী থিম্পুর চাংলিমিথাং স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে এদিন বাংলাদেশকে গোলের দেখা পেতে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। ম্যাচের ১৮ মিনিটে লক্ষ্যভেদ করে আনাই মোগিনি।

ঠিক ২০ মিনিট পর ম্যাচের ব্যবধান দ্বিগুণ করে আনুচিং মোগিনি। ডি-বক্সের বাইরে থেকে চমৎকার শেটে বল জালে জড়ায় সে।

ম্যাচের ৪৩ মিনিটে বাংলাদেশ দলের গোল ব্যবধান আরো বড় করে তহুরা খাতুন। দলের পক্ষে তৃতীয় গোল করে বড় জয়ের আশা জাগিয়ে তোলে।   

এর আগে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানকে একরকম উড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের মেয়েরা। জিতেছিল ১৪-০ গোলে। আর দ্বিতীয় ম্যাচে নেপালকে ৩-০ গোলে হারায়।

এই আসরে বাংলাদেশ দল অন্যতম ফেভারিট। সম্প্রতি দারুণ ফুটবল খেলছে তারা। ২০১৪ সালে নেপালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম শিরোপা জিতেছিল। এরপর তাজিকিস্তানে একই টুর্নামেন্টে শিরোপা জেতে। এর পর ঢাকায় এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাইপর্বে, গত বছর ঢাকায় সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপে এবং গত এপ্রিলে হংকংয়ে চার জাতি জকি কাপে শিরোপা জিতেছিল তারা।

আরো পড়ুন : ভুটানকে হালকাভাবে নিচ্ছে না বাংলাদেশ
রফিকুল হায়দার ফরহাদ, ভুটান থেকে (১৫ আগস্ট ২০১৮, ২০:০০)

লাল-সবুজদের টানা দ্বিতীয় সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবলের শিরোপা জয়ে এখন দুই বাধা। দুটি হার্ডল ডিঙ্গাতে পারলেই দেশ বাসীকে ঈদুল আজহার উপহার দিতে পারবে মারিয়া, আঁখি, মনিকা, তহুরারা। এই মিশনে বৃহস্পতিবার তাদের সামনে প্রতিপক্ষ ভুটান। সেমিতে তাদের বিপক্ষে জিততে পারলে এরপর ১৮ আগষ্ট ফাইনালে ভারত বা নেপালের সাথে লড়াই। অবশ্য তাদের মাথায় এখন শুধু সেমিফাইনাল। এবার থিম্পুর অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা সাফে ৬ দলের লড়াই এই চার দল এখন সেমিফাইনালিস্ট। সুতরাং এদের কাউকেই দুর্বল ভাবার সুযোগ নেই। তাই বৃহস্পতিবার বাংলাদেশও তাদের সেমির প্রতিপক্ষ ভুটানকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নিচ্ছে না। চাংলিমিথাং স্টেডিয়ামে সন্ধ্যা সাতটায় আসরের দ্বিতীয় সেমি ফাইনালে মুখোমুখি বাংলাদেশ এবং ড্রাগন গার্লরা। বিকেল চারটায় প্রথম সেমিতে খেলবে ভারত ও নেপাল।

এই ভুটানের বিপক্ষেই গত বছর অনূর্ধ্ব-১৫ সাফে লিগ ম্যাচে ৩-০তে জিতেছিল মারিয়া মান্ডার দল। সেই আসরে ভুটানিদের সর্বোচ্চ অর্জন ছিল নেপালের সাথে ১-১ এ ড্র। কিন্তু অ্যাকাডেমিতে নিত্য ফুটবল চর্চা করা ভুটানের মেয়েরা এখন অনেক পোক্ত। তারাই এবার ইতিহাস গড়ে দেশের মহিলা ফুটবল প্রথম জয় তুলে এনেছে। ৬-০তে পরাজিত করে শ্রীলংকাকে। এরপর শক্তিশালী ভারতেকে কীভাবেই না নাস্তানাবুদ করেছিল এই আসরের স্বাগতিকরা। বয়স এবং অনভিজ্ঞতারা কারণে এবং গোলরক্ষকের ভুলে ১-০তে হারতে হয়েছিল ভারতের কাছে।

একে তো নিজের মাঠ। নিজস্ব গ্যালারী ভর্তি দর্শক। রয়েছে উচ্চতার সুবিধা। সেই সাথে খেলে ছোট ছোট পাসের গোছানো ফুটবল। তার উপর তারা সেমিফাইনালিস্ট। সুতরাং তাদেরকে সমীহ করছেন বাংলাদেশ কোচও। কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটনের মতে, আমরা কোনোভাবেই দুর্বল বা হালকা ভাবছি না ভুটানকে। সব দলই আমাদের কাছে সমান। শক্তিশালী বলেই তারা সেমি ফাইনালে এসেছে। তিনি যোগ করেন, গতবারের ভুটান দলের চেয়ে এবারের দলটি শক্তিশালী। তারা বেশ উন্নতি করেছে। এটা তাদের অ্যকাডেমির ফসল।

তবে ছোটনের মতে, আমাদের শুরুর দিকেই গোল পেতে হবে। এরা ১৫ বছরের মেয়ে। প্রথম দিকে গোল না পেলে পরে তারা চাপে পড়ে যাবে। জানান , অতীত রেকর্ড বলছে বাংলাদেশ দল শুরুতে গোল দিয়ে পরে জয় তুলে নিয়েছে বড় ব্যবধানে। বাংলাদেশ কোচের আশাবাদ, ‘আমাদের মেয়েরা স্বাভাবিক এবং প্রেসিং ফুটবল খেলতে পারলে ভুটানের ছোট ছোট পাসের খেলা কোনো সমস্যা হবে না।’ থিম্পুর উচ্চতা, স্থানীয় দর্শক এসব কোনো কিছুই আসেরর বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বাধা হবে না। ছোটনের মতে, ‘ফুটবলারা এসব মানিয়ে নিয়েছে। তারা বিদেশের মাটিতে একাধিক শিরোপা জেতা দল।’ ভুটান দলের ৯ নং জার্সীধারী ডেকি লাহজম এবং ১০ নং পোশাকওয়ালা সোনাম লাহমোকে বিপদজনক বলে উল্লেখ করলেন তিনি।

অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা, স্ট্রাইকার আনু চিং মগিনি, ডিফেন্ডার আনাই মগিনি, আঁখি খাতুন সবার মুখেই আজ জয়ের আত্মবিশ্বাস। তবে কেউই বলনেনি সহজে জয় আসবে আজ।

আজকের এই সেমি ফাইনালের নব্বই মিনিটে জয় পরাজয়ের নিষ্পতি না হলে সরাসরি টাইব্রেকার। সেই পেনাল্টি শ্যূট আউটেরও প্রস্তুতি আছে। বললেন ছোটন।

মহিলা সাফ ফুটবলের সিনিয়র জুনিয়র মিলে তিন ম্যাচেই বাংলাদেশ হারিয়েছে ভুটানকে। সিনিয়র সাফে ২০১০ এ কক্সবাজারে ৯-০, ২০১২ এর কলম্বো সাফে ১-০ এবং অনূর্ধ্ব-১৫ সাফে গত বছর ঢাকায় ৩-০তে জয়। এছাড়া এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ ফেস্টিভাল ফুটবলে নেপালের মাটিতে ভুটানের বিপক্ষে ১৬-০ গোলের জয়। এটিই মহিলা ফুটবলে লাল সবুজদের সবচেয়ে বড় বিজয়।


আরো পড়ুন : আঁখির চোখ জুড়ানো গোল আবার?

‘ভাই তোমাদের পাঁচ নাম্বার জার্সিধারী ফুটবলার তো দারুণ খেলে। তার শট তো নয় যেন বুলেট। আমার খুব ভালো লেগেছে তার খেলা।’ পরশু চ্যাং ঝি ঝি ফুটবল মাঠ থেকে ফেরার সময় ট্যাক্সি ড্রাইভার দিলীপ কুমার ঘালির মুখে এভাবেই বাংলাদেশের আঁখি খাতুনের প্রশংসা। শুধু এই ট্যাক্সি ওয়ালাই নন, মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে ভুটান লিগের দল ফুন সলিং এফসির ফুটবলার প্রেমা ওয়াংচুক, রিজঝুং এফসির খেলোয়াড় দর্জি গেলসেন সহ অনেকের মন জয় করেছেন এই আঁখি খাতুন। ডিফেন্সে যেমন প্রাচীর সম তিনি, তেমনি ওভার ল্যাপ করে উপরে উঠে আসেন চমৎকার পায়ের কাজে ড্রিবলিং করে। কর্নারের সময় হেড করতে আসেন। তার দীর্ঘ দেহটা তখন বড় অস্ত্র। সেই সাথে যুক্ত হয় তার দূর পাল্লার প্রচণ্ড গতির শট। এই দূর পাল্লার শটেই এবার পাকিস্তানের বিপক্ষে গোল করেছিলেন তিনি। গতবছরের সাফে আজকের প্রতিপক্ষ ভুটানের বিপক্ষে তার ছিল জোড়া গোল। তাই আজও তার কাছে গোল প্রত্যাশা সবার। আঁখি খাতুন জানান, আমার প্রধান দায়িত্ব প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানো। এরপর সুযোগ পেলে গোলের চেষ্টা করবো।

এই পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ফুটবলে চার গোল আঁখির। ২০১৬ সালে তাজিকিস্তানের মাটিতে গোল করেছিলেন নেপালের বিপক্ষে। ৯ আগষ্ট পাকিস্তানের বিপক্ষে তার দর্শনীয় গোলটি ভাইরাল হয়েছে। তবে তিনি এগিয়ে রাখলেন গত বছর ঢাকায় করা ভুটানের বিপক্ষে কর্নার থেকে সাইড হিলে করা গোলটিকে। তখন ভুটানের বিপক্ষে তার অপর গোলটিও কর্নার থেকে। হেডে বল জালে পাঠান তিনি।

লাল-সবুজদেরে নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার আঁখি খাতুন। হেডে বিপক্ষ দলের ক্রস বা লব ক্লিয়ারে দারুন দক্ষ তিনি। এছাড়া প্রতিপক্ষের থ্রূ পাস গুলো নস্যাৎ করে দেন সময় মতো ছুটে এসে। এরপর কয়েক জনকে কাটিয়ে ঢুকে পড়েন বিপক্ষ সীমানায়। সাথে আছে দূরপাল্লার শট। নেপালের বিপক্ষে তো তার এমন একটি শট অল্পের জন্য জালে যায়নি। মাঠের এমন উজ্জ্বল পারফরম্যান্সই দৃষ্টিবন্দী করেছে দর্শকদের‌্য। তার ভক্তও কম নয়।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের পাটগোলা গ্রামের তাঁতী পরিবারের মেয়ে আঁখি। গ্রামের অন্য আট দশটা মেয়ের মতো তারও হওয়ার কথা ছিল তাঁত শ্রমিক। কিন্তু ২০১৪ সালে শাহজাদপুরের ইব্রাহিম পাইলট স্কুলের হয়ে বঙ্গমাতা ফুটবলের মাধ্যমে তার ফুটবলে আসা। সুযোগ হয় বিকেএসপিতে। ২০১৬ সালে ডাক পান বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় দলে। এরপর আর তাঁত নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি তাকে।

আঁখির বাবা আক্তার হোসেন তাঁত শ্রমিক। নিজের কোনো মেশিন নেই। কাজ করেন অন্যের মেশিনে। আঁখির মা নাসিমা বেগম চাইতেন মেয়েও যেন তাঁত শ্রমিকরে কাজ করে সাংসারে বাড়তি উপার্জনে সাহাস্য করে। এখন অবশ্য ফুটবল খেলেই পরিবারকে সাহায্য করছেন। আঁখি জানান , ‘আমি কখনও তাঁত শ্রমিকের কাজ করিনি। তবে মায়ের সাথে সুতা বুনতাম।’ ফুটবলের প্রতি তার টান দেখে স্কুল শিক্ষক মনসুর আহমেদ তাকে বাড়তি ট্রেনিং করাতেন। তার দীর্গ দেহের কারনইে বাফুফের কোচরা তাকে নির্বাচন করে।। সেই সূত্র ধরে আজ তিনি বাংলাদেশ সিনিয়র জাতীয় দলের ভবিষ্যতের তারকা।


আরো সংবাদ