২১ আগস্ট ২০১৮

পাহাড়ি রাস্তায় ঝুঁকিপূর্ণ অনুশীলন মেয়ে ফুটবলারদের

এভাবেই পাহাড়ি রাস্তায় অনুশীলন করতে হয়েছে ফুটবলারদের - ছবি : নয়া দিগন্ত

দারুণ এক জয়ে বাংলাদেশের শুরু। অতি দুর্বল ও তিন বছর ফিফার নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরা পাকিস্তানের জালে ১৪ গোল। বৃহস্পতিবার সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা ফুটবলে এমন জয়ের পর শুক্রবার কার্যত বিশ্রামে কাটিয়েছেন মারিয়া, তহুরা, শামসুন্নাহাররা। অবশ্য তা সিডিউলেই ছিল।

তবে একবারেই হোটেল আরিয়াতে শুয়ে বসে কাটাননি লাল সবুজ ফুটবলারেরা। সকাল দশটায় তাদের ওয়ার্মআপ করতে নেয়া হয় থিম্পুর বাবেসাতে অবস্থিত আরিয়া হোটেলের পাশের পাহাড়ে। সেখানে বেশ কষ্ট করেই উঠতে হয়েছে বাংলাদেশ দলের সবাইকে। পাহাড়ের পাকা সড়কে তাদের ওয়ার্মআপ করিয়েছেন বাফুফের টেকনিক্যাল ও স্ট্যাটিজিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলি। সাথে ছিলেন হেড কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। মূলত পাকিস্তানের বিপক্ষে যারা খেলেননি তারাই এই পাহাড়ী উঁচু রাস্তায় অনুশীলনে ছিলেন। একাদশের ফুটবলারদের অতোটা করতে হয়নি।

সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ২৩৩৪ মিটার উচ্চতার থিম্পুর পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য এমন উচু পাহাড়ে ওয়ার্মআপ হতেই পারে। যা ম্যাচের দিন উচ্চতাজনিত ক্লন্তি থেকে রক্ষা করতে সহায়ক হবে ফুটবলারদের। তবে যে রাস্তায় প্রতি মুহূর্তে প্রাইভেট কার, ট্রাক, ট্যাক্সি ছুটে চলছিল সেই সড়কের উপর এমন অনুশীলন ছিল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। পল স্মলির নেতৃত্বে মারিয়া, মনিকা, আঁখি খাতুনরা দৌড়ে দৌড়ে ওঠে হোটেল থেকে ৫/৬ ’শ ফুট উপরের এই পাহাড়ে। তাদের পাশ দিয়েই ছুটে ছলছিল যানবাহনগুলো।

এরপর রাস্তার উপর চক্রাকারে দৌড়াতে থাকেন কিশোরী ফুটবলারেরা। এটা হয়েছে এই সড়কের বেশ কয়েকটি স্থানে। বিপদটা ছিল এখানেই। ব্যস্ত এই সড়কে যে কোনো সময় দূর্ঘটনার শিকার হতে পারতেন খেলোয়াড়েরা। পল স্মলি ও ছোটন মিলে বারবার ফুটবলাদের সতর্ক করছিলেন এই যান্ত্রিক বাহনগুলো সম্পর্কে। এক পর্যায়ে পল স্মলিই দাঁড়িয়ে যান ট্রাফিকের ভূমিকায়। শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় এই অনুশীলন পর্ব সম্পন্ন হয়েছে।

অবশ্য বাংলাদেশের গাড়ি চালকদের মতো বেপোরোয়া নন ভুটানের ড্রইভাররারা। এই ধরনের পাহাড়ি রাস্তায় তাদের সর্বোচ্চ গতিসীমা স্থান ভেদে ৩৫/৪০ কিলোমিটার। এর চেয়ে জোরে গাড়ি চালানো মানে তাদের আর্থিক জরিমানা। শাস্তির ব্যাপারে বেশ কঠোর ভুটান কর্তৃপক্ষ। তাদের রাস্তায় কোনো গাড়ি চালকই নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া হর্ন বাজায় না। সবাই সচেতন শব্দ দূষণের বিষয়ে। স্কুল হাসপাতাল ও অফিস এলাকায় তো হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ। আর জেব্রা ক্রসিংয়ের পাশে কোনো মানুষকে দাঁড়ানো দেখলে থেমে যায় ভুটানিদের গাড়ি। এসব কি কল্পনা করা যায় বাংলাদেশে! শুক্রবার বাবেসার পাহাড়ি রাস্তায় এভাবেই বাংলাদেশ দলকে দেখে থেমে গেছেন গাড়ির চালকরা।

পাহাড়ি ওই এলাকটি ভুটান সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্পের কাছে হওয়ায় বেশীক্ষণ অনুশীলন করতে দেয়নি সেনা সদস্যরা। জানা গেছে তাদের বাস্কেটবল কোর্টে অনুশীলনের অনুমতি না পাওয়ায় এমন রাস্তায় করতে হয়েছে ওয়ার্মআপ। ‘পাহাড়ী রাস্তায় এই অনুশীলন ফুটবলারদের রিকভারির জন্য ভালো হয়েছে’ জানান কোচ ছোটন।

আরো পড়ুন : ‘হ্যাটট্রিক করে মায়ের কথা খুব মনে পড়েছে’

বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ দলে দুই শামসুন্নাহারের উপস্থিতি। একজন খেলেন ডিফেন্সে, অন্য জন মিডফিল্ডার। ডিফেন্ডার শামসুন্নাহারের পরিচিতি ‘বড় শামছুন্নাহার’ হিসেবে। ফলে অন্য জন চলে গেছেন জুনিয়রের কাতারে।

বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের বিপক্ষে গোল করেছেন দুই জনই। তবে সিনিয়রকে ছাড়িয়ে ম্যাচ সেরা হয়েছেন ছোট মেয়েটি। তার হ্যাটট্রিকই (চার গোল) ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার জুটিয়ে দিয়েছে। এই ম্যাচে ৪৬ মিনিটে বদলী হিসেবে নামেন ছোট শামসুন্নাহার। এই ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছে ১৪-০ গোলে।


এটি অবশ্য ‘ছোট’ শামসুন্নাহারের প্রথম হ্যাটট্রিক নয়। মার্চ-এপ্রিলে হংকংয়ে অনুষ্ঠিত জকি কাপে তার হ্যাটট্রিক ছিল ইরানের বিপক্ষে। তার মতে, ‘হংকংয়ের সেই আসরের দলগুলোই ছিল বেশী শক্তিশালী।’

তবে গতপরশু বদলী হিসেবে মাঠে নেমেই ১৭ মিনিটের মধ্যে তিন গোল করে নিজের পায়ের কাজের অনন্য স্বাক্ষর রাখেন তিনি। শুক্রবার অনুশীলনের আগে এই মিডফিল্ডার জানান, ‘হ্যাটট্রিকের পর রাতে হোটেলে ফিরে খুব মনে পড়েছে মায়ের কথা। আমি যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি তখন মা চলে যান দুনিয়া ছেড়ে।’

এখন নবম শ্রেণিতে পড়েন ছোট শামসুন্নাহার। ময়মনসিংহের কলসিন্দুরের ছাত্রী তিনি। তার বাড়ী মুক্তাগাছায়। তার ছোট বেলাতেই মারা যান মা। অসুস্থ মাকে ময়মনসিংহ হাসপাতালে আনা হয়েছিল; কিন্তু ডাক্তারদের সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে চলে যান পরপারে। শামসুন্নাহার জানান, ম্যাচ শেষে খুব মনে পড়েছিল আমার আম্মাকে। কেঁদেছিও উনার জন্য। মা বেঁচে থাকলে খুব খুশী হতেন আমার এই সাফল্যে।

শামসুন্নাহারের বাবা অসুস্থ। তার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বিয়ে করেন শাছুন্নাহারের মাকে। তিনিও মারা গেছেন। এই ছোট মেয়ে এখন তাদের সংসারের আয়ের উৎস। বলেন, ‘বাবা অসুস্থ। ফলে ফুটবল থেকে যে টাকা পাই তা সংসারের খরচ মেটাতে বাবার হাতে তুলে দেই। আমার টাকা দিয়ে বাবা গরু কিনেছেন। গত বছর সাফে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর যে টাকা পেয়েছি বাবা তা আমার জন্য ব্যাংকে রেখেছেন। বলেছেন পরে আমার কাজে লাগবে।’

গত ডিসেম্বরে সাফের সময় বাংলাদেশ দলে ডাক পান তিনি। তখন অবশ্য তেমন একটা খেলার সুযোগ পাননি। তবে হংকংয়ের টুর্নামেন্টে তাকে মাঠে নামান কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটন। সেখানে তিন ম্যাচে তার গোল পাঁচটি। হয়েছেন আসর সেরা।

গত সাফে করেন এক গোল। আর বৃহস্পতিবার ভুটানে ৪ গোল মিলে তার আন্তর্জাতিক গোলের সংখ্যা এখন ১০টি। ২০১৪ বঙ্গমাতা ফুটবলে তিনি জেতেন সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডন বুট। পরের বার হয়েছেন টুর্নামেন্ট সেরা। দুই বারই পুরস্কার নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে।

পরশুর হ্যাটিট্রক সম্পর্কে শামসুন্নাহার বলেন, পুরো দল ভালো খেলেছে বলেই আমি হ্যটট্রিক করতে পেরেছি। মিডফিল্ডাররা বল না দিলে তো আমি গোল দিতে পারতাম না। জানান , এখন আমাদের লক্ষ্য শিরোপা ধরে রাখা । কোনো ভাবেই নিচে নামা যাবে না।


আরো সংবাদ