২৩ জুলাই ২০১৮

ইংলিশদের হতাশায় ডুবিয়ে ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া

ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া - ছবি : সংগ্রহ

সেই ১৯৬৬ সালের পর আবার শিরোপার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলো ইংল্যান্ড। কিন্তু ক্রোয়েশিয়া বাধায় ভেঙে টুকরো ‍টুকরো হয়ে গেছে সেই স্বপ্ন। দীর্ঘদিনের শিরোপা খরা কাটানোর আশায় দলটি প্রতিটি ম্যাচে দারুণ খেলে সেমিফাইনালে এলেও সেখানেই থেমে গেছে জয়যাত্রা। অতিরিক্ত সময়ের গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে গেল ক্রোয়েশিয়া। বুধবার দ্বিতীয় সেমিফাইনালে নির্ধারিত সময় ১-১ গোলে ড্র থাকার পর অতিরিক্ত ত্রিশ মিনিটের ১৯তম মিনিটে(ম্যাচের ১০৯ মি.) গোল করে ক্রোয়েশিয়া। বাকি সময়ে সেই গোল আর শোধ দিতে পারেনি হ্যারি কেনের দল। ফলে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় ক্রোয়েশিয়া।

আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের এই খেলায় অবশ্য শুরুতে গোল করে এগিয়ে গিয়েছিলো ইংল্যান্ড। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই দলকে এগিয়ে দেন ইংল্যান্ডের ত্রিপিয়ের। এরপর দুই দলই অনেক চেষ্টা করেছেন প্রতিপক্ষের জালে বল ঢোকাতে। ক্রোয়েশিয়া গোল শোধে মরিয়া হয়ে থাকলেও ম্যাচে দাপট ছিলো ইংলিশদের। উভয় দলই একের পর এক আক্রমণ করেছে। মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ রেখে ক্রোয়েশিয়া বলের দখল অপেক্ষাকৃত বেশি রাখলেও ইংল্যান্ড কাউন্টার অ্যাটাকে অনেকবারই ভীতি ছড়িয়েছে।

কিন্তু বিরতির পর ক্রোয়েট ফরোয়ার্ড ইভার প্যারিসিচের দারুণ বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় খেলায় সমতায় ফেরে তারা। ডান দিকে থেকে আসা ভারসালজকের ক্রস ক্লিয়ার করতে হেড করতে মাথা বাড়িয়েছিলেন ইংলিশ ডিফেন্ডার ওয়াকার, কিন্তু তার পেছনে থাকা ক্রোয়েট ফরোয়ার্ড পেরিসিচ উঁচু করে পা বাড়িয়ে ওয়াকারের মাথায় বল আসার আগেই জালে ঠেলে দেন(১-১)।

এরপর আবার বেড়ে যায় খেলার উত্তেজনা। অনেকগুলো সুযোগ তৈরি করেছিলো উভয় দল; কিন্তু নির্ধারিত সময় কোন দলই গোল পায়নি। অতিরক্তি সময়ের ১৯তম মিনিটে সম্মিলিত আক্রমণ থেকে গোল করেন ক্রোয়েশিয়ার মানজুকিচ। বাম প্রান্ত দিয়ে ক্রোয়েশিয়ার আক্রমণ ইংলিশ ডিফেন্ডাররা ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে বক্সের বাইরে থেকে হেড করে আবার বক্সের ভেতর ফেলেন পেরিসিচ। বল পড়ার আগে ডিফেন্ডারক ফাঁকি দিয়ে ভেতরে ঢুকে যান মানজুকিচ। দারুণ দক্ষতায় বল নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গোলকিপারকে পরাস্ত করেন।

ইতিহাস বলছে, ইংল্যান্ডের সাথে আগের সাতবারের দেখায় চারবারই হেরেছে ক্রোয়েশিয়া। তারা জিতেছে দু’টি, একটি ম্যাচ হয়েছে ড্র। ক্রোয়েশিয়ার দুই জয়ের সবশেষটি আজ তাদের জন্য ছিল অনুপ্রেরণার। ২০০৭ সালের নভেম্বরে লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-২ গোলে হেরে ২০০৮ ইউরোতে কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হয়েছিল ইংল্যান্ড।

চলতি বিশ্বকাপে আবারো ইংল্যান্ডকে দুঃস্বপ্ন উপহার দিলো ক্রোয়েটরা। অভিজ্ঞ ইংল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে ১০৯ মিনিটে মানজুকিচের প্লেসিং শটে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ফাইনাল নিশ্চিত করল ক্রোয়েশিয়ার সোনালী প্রজন্ম। ১৫ জুলাই শিরোপা লড়াইয়ে ফ্রান্সের মুখোমুখি হতে হবে তাদের।

তারকা ভরপুর ও গতিময় আক্রমণে সজ্জিত হাইভোল্টেজ এই ম্যাচে নজর ছিল অধিনায়ক এবং প্রাণভোমরা লুকা মরডিচের ওপর। শরণার্থী শিশু থেকে ক্রোয়েশিয়া ফুটবল দলের অধিনায়ক হওয়া লুকা মরডিচের ফুটবলে উত্থান হার মানিয়েছে সিনেমার কাহিনীকেও। ফুটবল মাঠে আক্রমণ করা বা আক্রমণে বল জোগান দেয়া উভয় ক্ষেত্রেই ক্রোয়েশিয়ান অধিনায়ক খুব একটা পিছিয়ে নেই। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জিততে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। বিশ্বকাপে একেবারে সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মাঠে তার গতি, স্কিল, পাসিং একুরেসি সবকিছু খুবই প্রশংসনীয়। পেনাল্টি বা ফ্রি-কিকেও রয়েছে চোখ ধাঁধানো দতা। মরডিচের সাথে র‌্যাকিটিচ, মানজুকিচ নামগুলো প্রতিপক্ষের ত্রাস হিসেবে কাজ করেছে।

দেলে আলিকে ডি বক্সের বাইরে ফাউল করায় ২০ গজ দূর থেকে পঞ্চম মিনিটে ফ্রি-কিক পায় ইংল্যান্ড। কিরিন ট্রিপিয়ের ডানপায়ের বাঁকানো শটে কিছু করার ছিল না ক্রোয়েশিয়ার গোলরক সুবাসিকের। জাতীয় দলের হয়ে নিজের প্রথম গোল করে শুরুতেই লায়ন্সদের থউল্লাসে ভাসান তিনি (১-০)। গোল হজমের পর একাধিক সুযোগ সৃষ্টি করেছিল ক্রোয়েশিয়া। ১৪ মিনিটে মাগুইরির হেড বার পোস্ট ঘেঁষে বাইরে না গেলে ব্যবধান দ্বিগুণ করত ইংল্যান্ড।

৩০ মিনিটে জটলা থেকে হ্যারি কেন দুই দফায়ও বল জালে পাঠাতে পারেননি। ৭, ১২, ১৮, ২৫, ৩৩ ও ৩৫ মিনিটে সমতায় আসার দারুণ সুযোগ নষ্ট করে ক্রোয়েটরা। তন্মধ্যে ৩৫ মিনিটে লিংগার্ডের বল বারে না লাগলে ও ৩১ মিনিটে রেবিচের পরপর দু’টি শট ডিফেন্ডার ওয়াকার ও কিপার পিকফোর্ড না ফিরালে ফলাফল হতে পারত ভিন্ন। এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় ইংল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধে আরো বেশি পরিণত মরডিচ বাহিনী। তবে পাল্টা আক্রমণে যখন বিপজ্জনক হয়ে উঠে ইংলিশরা তখন একটু রক্ষণাত্মক ভূমিকায়ই যায় ক্রোয়েটরা। অবশ্য গোলমুখে সহজ সুযোগ পেয়েছিল কেন-স্টারলিংরা। যেটি কাজে লাগাতে পারেনি ফরোয়ার্ডরা।
৬৫ মিনিটে ডি বক্সের ভেতর থেকে মরডিচের আচমকা শট রুখে দেয় ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার ওয়াকার। ৬৮ মিনিটে অবশ্য আর ভুল করেন না পেরিসিচ(১-১)।

পরের ১০ মিনিট শুধুই ক্রোয়েশিয়ার। রেবিক-পেরিসিচ-মরডিচ এক ধরনের ছেলেখেলাই খেলে ইংলিশদের নিয়ে। শুধু ভাগ্য সহায় হয়নি বিধায় দু’টি গোল বঞ্চিত হয় ক্রোয়েটরা। ৭৭ মিনিটে লিংগার্ডের একটি প্লেসিং শট ধরতে পারেনি হ্যারি কেন। নির্ধারিত সময় কোন পক্ষ গোল করতে না পারলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে ড্র থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের প্রধমার্ধেও ছিল সমতায়। আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের একই ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে ১০৯ মিনিটেবাম প্রান্ত দিয়ে ক্রোয়েশিয়ার আক্রমণ ইংলিশ ডিফেন্ডাররা ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে বক্সের বাইরে থেকে হেড করে আবার বক্সের ভেতর ফেলেন পেরিসিচ। বল পড়ার আগে ডিফেন্ড ফাঁকি দিয়ে ভেতরে ঢুকে যান মানজুকিচ। দারুণ দক্ষতায় বল নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গোলকিপারকে পরাস্ত করেন(১-২)। শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হলে প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠার আনন্দে মাঠ ছাড়ে ক্রোয়েশিয়া।


আরো সংবাদ