২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বিশ্বকাপে অঘটন ঘটাতে প্রস্তুত ইরান

ইরান ফুটবল দল
ইরান ফুটবল দল - সংগৃহীত

রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলতে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে প্রথম মস্কোয় অবতরণ করেছে ইরান ফুটবল দল। ইরানের জাতীয় পতাকা নিয়ে ফুটবলাররা মস্কোর উপকণ্ঠে নুকোভো বিমানবন্দরে নামেন। গ্রুপ বি’তে ইরানকে খেলতে হবে শক্তিশালী স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর বিরুদ্ধে।

ইরানের কোচ কার্লোস কুইরোজ জানান, ‘আমাদের ছেলেদের বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন এবার সার্থক হবে। কঠোর পরিশ্রম করেছে দলটি।’

রাশিয়ার রাজধানীর অদূরে লোকোমোটিভ বাকোভকা ট্রেনিং সেন্টারে এখন থেকে অনুশীলন করবেন ইরানের ফুটবলাররা। ৮ জুন লিথুয়ানিয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রীতি ম্যাচে অংশ নেবে ইরান দল। ম্যাচটি হবে মস্কোয়। এরপর ১৫ জুন সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে মরক্কোর বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে খেলতে নামবে ইরান।

অতীতে পারস্য নামে পরিচিত ছিল ইরান। এশিয়ার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের দেশটিতে ফুটবলের ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। ঊনিশ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশদের হাত ধরে ফুটবলের বিকাশ ঘটে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের দেশটিতে। তবে ধর্মীয় অনুশাসন মানা ইরানি সমাজে তা খুব একটা সহজ হয়নি। দক্ষিণ পশ্চিম ইরানের তেলের খনিগুলোতে কাজ করতে আসা ব্রিটিশ শ্রমিক ও নাবিকরা সে সময় নিয়মিতই নিজেদের মধ্যে ফুটবল খেলত। ফুটবল খেলা নিয়ে স্থানীয় রক্ষণশীল সমাজে নেতিবাচক ধারণার কারণে স্থানীয়রা এতে অংশ নিতেন না।

১৯০৭ সাল ইরানের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছর তিনটি দল নিয়ে তেহরানের ব্রিটিশ অ্যাম্বাসেডর স্প্রিং রাইস একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু করেন। এতে অংশ নেয়া দলগুলো হচ্ছে অ্যাম্বাসি অব গ্রেট ব্রিটেন, ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব পার্সিয়া ও ইন্দো-ইউরোপিয়ান টেলিগ্রাফ কোম্পানি। একই বছর ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের জন্য তেহরান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। দলগুলোতে কোনো স্থানীয় খেলোয়াড় ছিল না। তবে, খেলার সময় পর্যাপ্ত খেলোয়াড় না পাওয়া গেলে দলগুলো স্থানীয় দর্শকদের মাঠে খেলতে ডাকতো। এভাবেই প্রথম ইরানি ফুটবলার হিসেবে মাঠে নামেন করিম জানদি। তিনি ১৯০৮ সাল থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত ফুটবল খেলেন। এবং তার পথ ধরেই অনেক স্থানীয় তরুণ ফুটবল মাঠে নামেন খেলতে। সামাজিক রক্ষণশীলতা অতিক্রম করে দ্রুতই স্থানীয় তরুণদের মধ্যে ফুটবল ছড়িয়ে পড়ে।

হোসেইন সাদাগহিয়ানি ইরানের প্রথম ফুটবলার, যিনি বিদেশি লিগ খেলেছেন। ১৯২৯ সালে তিনি বেলজিয়ান ফুটবল লিগে অংশ নেন। এভাবেই ব্রিটিশ ও আমেরিকাসহ আরো কিছু পশ্চিমা নাগরিকের হাত ধরে ইরানে ফুটবল খেলা জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইরান ফুটবল ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয় ১০২০ সালে। দেশটি ১৯৫৮ সালে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনে (এএফসি) যোগ দেয় ও ১৯৪৫ সালে ফিফা’র সদস্যপদ লাভ করে। দেশটি ১৯৬৮ সালে এশিয়ান কাপ চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতে।

পরবর্তীতে ১৯৭২ ও ১৯৭৬ সালেও এশিয়ান কাপের শিরোপা জেতে। ১৯৭৮ সালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নেয় ইরান। এবার রাশিয়াতেও অঘটন ঘটানোর জন্য তৈরি কার্লোস কুইরোজের দল। তবে স্কোয়াড থেকে বিস্ময়করভাবে বাদ পড়েছেন বেলজিয়ামের লিগে খেলা কাভেশ রেইজি। প্রাক-বিশ্বকাপে তিনি ইরান দলে নিয়মিত ছিলেন। বিশ্বকাপের জন্য ইরানের ঘোষিত ২৪ জনের দলে আছেন দুই বিতর্কিত ফুটবলার মাসুদ সোজুই এবং হাজি সফি। মাসুদ এবং সফি গ্রিক ক্লাবের ফুটবলার। ওই গ্রিক ক্লাবের হয়ে গত আগস্টে তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে খেলেছিলেন।

গ্রিক ক্লাবের হয়ে খেলার জন্য তাদের আজীবন সাসপেন্ড করা হবে বলে জানিয়েছিলেন ইরানের ফুটবল প্রশাসকরা। কিন্তু আন্তর্জাতিক স্পোর্টস কোড অনুসারে ওই দুই ফুটবলারকে আজীবন সাসপেন্ড করলে ইরানকে ফিফার কাছে জবাবদিহি করতে হত। তাই ইরান ফুটবল সংস্থা শেষ পর্যন্ত সেই পথে যায়নি। গত মার্চে ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচের জন্য মাসুদকে ডাকা হয়েছিল। এবার ২৮ বছরের মিডিও হাজি সফিকেও ডাকা হল।

৩৩ বছরের মাসুদ দলে ডাক পেয়েছেন স্রেফ তার অভিজ্ঞতার জন্যই। কুইরোজ টানা সাত বছর ইরানের কোচ। তার আমলে ইরান এশিয়া চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল। কুইরোজ এক বছরের জন্য রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি এক বছর ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের সহকারী কোচও ছিলেন। এ হেন কুইরোজের টিমকে এখন বিশ্ব ফুটবলে ‘টিম মিলি’ বলা হচ্ছে। এই নিক নেমের অর্থ নিজেদের পেনাল্টি বক্সের আশপাশে লোক বাড়ানো। যাতে স্পেন কিংবা পর্তুগালের কুশলী ফুটবলাররা সহজে গোল করতে না পারেন। স্পেন ও পর্তুগালের মতো বড় দলের পাশে ইরানের গ্রুপে আফ্রিকান দল হিসাবে আছে মরক্কোও। তাই রক্ষণকে আরো শক্তপোক্ত করাই কু‌ইরোজের লক্ষ্য।

নিজেদের ডিফেন্ডিং থার্ডে লোক বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে রুখে দেয়ার জন্যই বিশ্বকাপের তিন সপ্তাহ আগে ২৪ জন বেছে নিয়েছেন কোচ। এবারের এবারের বিশ্বকাপে কুইরোজের কাজটি কঠিন। কারণ ইরানের গ্রুপে আছে ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন স্পেন, ২০১৬ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল এবং মরক্কো। এই শক্ত গ্রুপে ভালো ফল করার জন্য ইরান তাকিয়ে আছে ২১ বছরের আলি রেজা জাহানবক্সের দিকে। তিনি ডাচ ক্লাব এ জেড আল কামারের হয়ে ২১টি গোল করেছেন। তিনিই প্রথম ইরানি খেলোয়াড় যিনি ইউরোপের কোনো লিগে সর্বাধিক গোলদাতা হয়েছেন।

 

আরো পড়ুন : বিশ্বকাপে ইরানের চমক

বিশ্বকাপ ফুটবলের ২১তম আসর অনুষ্ঠিত হবে রাশিয়ায়। ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাকর আসর বিশ্বকাপে অংশ নিতে প্রথম দল হিসেবে রাশিয়ার মাটিতে পা রাখলো ইরান। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী গতকাল রাতে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর ভনুকোভো বিমানবন্দরে পা রাখে এশিয়া অঞ্চল থেকে সুযোগ পাওয়া ইরান ফুটবল দল।

বিশ্বকাপে এই নিয়ে পঞ্চমবারের মত অংশ নিতে যাচ্ছে ইরান। ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপে অংশ নেয় তারা। ঐবার প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় ইরান। এরপর ১৯৯৮, ২০০৬ ও ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ খেলে তারা। প্রত্যকবারই প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের।

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ১২টি ম্যাচ খেলেছে ইরান। ১টি জয়, ৩টি ড্র ও ৮টি ম্যাচে ড্র করে তারা। ১৯৯৮ সালের আসরে বিশ্বকাপের মঞ্চে একমাত্র জয়টি পায় ইরান। যুক্তরাষ্ট্রকে ২-১ গোলে হারিয়েছিলো তারা।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে টিকিট পেতে এশিয়া অঞ্চল থেকে প্রথম দল হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেছিল ইরান। বাছাই পর্বে ১০ খেলায় ৬ জয়, ৪ ড্র’তে সর্বোচ্চ ২২ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় ইরান।

রাশিয়ার মস্কোর লোকোমোতিভ বাকোভকা অনুশীলন সেন্টারে বিশ্বকাপের বেজ ক্যাম্প করবে ইরান। আসন্ন বিশ্বকাপে ‘বি’ গ্রুপে রয়েছে ইরান। গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ পর্তুগাল, স্পেন ও মরক্কো। আগামী ১৫ জুন মরক্কোর বিপক্ষে সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামবে কার্লোস কুইরোজের শিষ্যরা।

রাশিয়া পৌঁছে ইরান কোচ কুইরোজ বলেন, ‘রাশিয়ায় এসে ইরানিয়ান ফুটবলের স্বপ্ন সত্যি হলো। আমরা কঠোর শ্রম ও ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বকাপের খেলার টিকিট অর্জন করেছি। এজন্য ইরানিরা ও আমরা সম্মানিত বোধ করছি। এবারের আসরে আমরা নিজেদের সেরাটাই দিতে চাই। প্রথম রাউন্ডের বাঁধা টপকে যাওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। তবে কাজটি অনেক কঠিন হবে। কারণ আমাদের গ্রুপে পর্তুগাল-স্পেনের মত বড় দল আছে। তারপরও আমাদের চেষ্টার কমতি থাকবে না। আশা করছি, দারুণ একটি বিশ্বকাপ হবে। এজন্য সবাইকে শুভ কামনা জানাই।’

 

আরো পড়ুন : পর্তুগালের জার্সিতে বিশ্ব আমার চমক দেখবে

বিশ্বকাপ ফুটবলের ২১তম আসর শুরু হতে বাকি সাতদিন। এর আগে আর একটি প্রীতি ম্যাচ রয়েছে পর্তুগালের। আজ আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা।

ওই ম্যাচকে সামনে রেখে দলের অনুশীলন ক্যাম্পে যোগ দিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদ ও পর্তুগালের সেরা তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। বিশ্বকাপের আগে নিজেকে শেষবারের মত ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগ হয়েছে তার। তাই অনুশীলন ক্যাম্পে যোগ দিয়েই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে নিজের ছবি পোষ্ট করেছেন রোনালদো। টুইটারে লিখেছেন, ‘বিশ্ব এবার পর্তুগালের জার্সিতে আমার চমক দেখবে।’

রোনালদোকে ছাড়া শনিবারের প্রস্তুতি ম্যাচে ছন্দহীন ছিল পর্তুগাল। বেলজিয়ামের সাথে গোলশূন্য ড্র করে তারা। শুধুমাত্র বেলজিয়ামের সাথেই জয়হীন থাকেনি তারা। গত ২৮ মে তিউনিসিয়ার বিপক্ষেও জয়হীন মাঠ ছাড়তে হয় পর্তুগালকে। ওই ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র করে তারা।

রোনালদো ফেরার পর্তুগাল ক্যাম্পও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে বলে জানান দলের কোচ ফার্নান্দো সান্তোস। তিনি বলেন, ‘রোনালদো দলের জন্য প্রাণভোমরা। সে দলে ফেরায়, সবাই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। আশা করছি শেষ প্রীতি ম্যাচে আমরা নিজেদের ভালোভাবে ঝালিয়ে নিতে পারবো।’

বিশ্বকাপের ২১তম আসরে ‘বি’ গ্রুপে রয়েছে পর্তুগাল। স্পেন, মরক্কো ও ইরানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলতে হবে পর্তুগালকে।


আরো সংবাদ

সকল