০৭ ডিসেম্বর ২০১৯
স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনে শেখ হাসিনা

পেঁয়াজ উঠে গেছে বিমানে, চিন্তা নেই

৪ দিনের সফরে দুবাইয়ে প্রধানমন্ত্রী
দুবাইয়ের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগের আগে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানানো হচ্ছে : পিআইডি -

পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দাম বাড়ানোর সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে বিমানে করে পেঁয়াজ আনা হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক হয়ে যাবে। গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের জাতীয় সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির টাকায় কাউকে আয়েশ করতে দেয়া হবে না।
দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, অসৎ পথে বিরিয়ানি খাওয়ার চেয়ে সৎ পথে নুন ভাত খাওয়াও ভালো। মানুষের মধ্যে আমরা আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করতে পেরেছি। এই গতিধারা অব্যাহত রাখতে হবে। আমরা সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দূর করতে চাই। এর বিরুদ্ধে চলছে এবং তা অব্যাহত রাখব।
বিএনপির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আজকে তারা অনেক কথা বলে। তাদের সময়েই সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, গ্রেনেড হামলা হয়েছে। তারাই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শুরু করে। সেই জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া পর্যন্ত। তাদের এই স্বভাব কোনোদিন যাবে না। ওই খুনি, দুর্নীতিবাজরা যেন আর কোনোদিন এই দেশে ক্ষমতায় আসতে না পারে, বাংলাদেশের জনগণকে সে ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। এরা আসা মানেই মানুষের দুর্ভোগ, এরা ক্ষমতায় থাকা মানেই দেশকে একেবারে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া।
সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত ইস্যু পেঁয়াজ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন পেঁয়াজ নিয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে। সব দেশে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু আমাদের দেশে কেন, কী কারণে এত অস্বাভাবিকভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ছে জানি না। তবে যে কারণেই হোক আমি ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা কার্গো বিমানে পেঁয়াজ আমদানি করছি। দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পেঁয়াজ চলে আসবে। এখন পেঁয়াজ বিমানে উঠে গেছে। কাজেই আর চিন্তা নেই। তবে এর পেছনে মূল কারসাজি যারা করেছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, স্বাভাবিকভাবে আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় অনেক পণ্যের উৎপাদন বাড়ে বা কমে। আর যেহেতু পেঁয়াজটা বেশিদিন রাখা যায় না। কিন্তু যদি এখন হোল্ডিং করে দাম বাড়িয়ে দুই পয়সা কামাতে চান তাদের এটাও চিন্তা করতে হবে, পেঁয়াজ তো পচে যাবে। আর এখন পচা পেঁয়াজও শুকানোর চেষ্টা হচ্ছে। তো মানুষকে এই কষ্ট দেয়াটা কেন? কারা এর পেছনে আছে সেটাও আমাদের দেখতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা যতই এগিয়ে যাই, মানুষ যখন ভালো থাকে একটা না একটা ইস্যু তৈরি করা হয় এবং মানুষের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। আমাদের লক্ষ্য মানুষকে সুন্দর জীবন দেয়া, মানুষ যখন ভালো থাকে তখন একটা শ্রেণী আছে, একটা গোষ্ঠী আছে, মানুষ যখন ভালো থাকে তারা তখন মনঃকষ্টে ভোগে। অসুস্থতায় ভোগে। তাদের এ রোগ কিভাবে সারানো যায়Ñ এটা জনগণই বিচার করবে। জনগণই এটা দেখবে।
পেঁয়াজের দাম ভারতেও বেশি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইন্ডিয়াতেও পেঁয়াজের দাম অনেক। সেখানে ১০০ রুপিতে তারা প্রতি কেজি পেঁয়াজ কিনতে পারে। শুধু এক স্টেটে তারা তাদের পেঁয়াজ ওই স্টেটের বাইরে যেতে দেয় না। শুধু সেখানে একটু দাম কম। তা ছাড়া সার্বিকভাবে সেখানেও দাম বেশি। আর আমরা যেখান থেকে কিনছি, আমাদের বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে।
সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৮.১৩ শতাংশে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। আজ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে।
তৃণমূল জনগণের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার কাজ করছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের উন্নয়ন রাজধানীকেন্দ্রিক না, শহরকেন্দ্রিক না। আমাদের উন্নয়ন তৃণমূলকেন্দ্রিক, গ্রামের মানুষজনের জন্য। তাদের জীবনে যেন উন্নয়নের ছোঁয়া পায় সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা দিয়েছিলাম। আজকে বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ। আমরা প্রায় সাড়ে তিন হাজার ইউনিয়নে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে দিয়েছি। বাকি ইউনিয়নেও খুব দ্রুত এই সেবা পৌঁছে যাবে। পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে তাদের সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে স্থলসীমানা চুক্তি আইন পাস করে দিয়েছেন এবং আমরা সারা বিশ্বে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। আমরা সমুদ্রসীমা অর্জন করেছি। ছিটমহল বিনিময় করেছি। ব্লু ইকোনমি অর্থাৎ সুনীল অর্থনৈতিক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি।
শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন ও আওয়ামী লীগের অবদানের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা দুই কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষা বৃত্তি দিয়ে যাচ্ছি। পৃথিবীর কোনো দেশে উচ্চশিক্ষা এত কম খরচে হয় না, যেটা আমরা বাংলাদেশ দিচ্ছি। আমরা আমাদের সাক্ষরতার হার ৭৩ শতাংশে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি।
স্বাস্থ্য খাতে গত ১০ বছরের উন্নয়নের বর্ণনা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছি। আমরা কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ করেছি। ৩০ প্রকার ওষুধ বিনামূল্যে দিচ্ছি। মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষযটি অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছি। টিকাদান কর্মসূচি করে মানুষকে মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করছি।
বিএনপির সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসে আমাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। আমেরিকায় জয়কে অপহরণ করার জন্য বিএনপি আমেরিকান একজন গোয়েন্দা অফিসারকে ভাড়া করেছিল। তারা ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে টাকা দিয়ে কিনে ফেলে। সেখানে আমি এবং আমার ছেলে, আমার বোন আমাদের কী কী আছে সেগুলো খোঁজা শুরু করে। সেই তদন্ত করতে গিয়ে বের হয়ে এলো খালেদা জিয়া, তার দুই পুত্রের দুর্নীতির কথা। সেগুলো প্রকাশ হলো। একমাত্র বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং তার বোনের কোথাও কোনো রকম কোনো কমিশন খাওয়া, দুর্নীতির কোনো দৃষ্টান্ত তারা পায়নি। কিন্তু যে অফিসারকে তারা ভাড়া করেছিল তার বিরুদ্ধে ওই গোয়েন্দা সংস্থা (এফবিআই) মামলা করে এবং ওই মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে বেরিয়ে পড়ে তাকে যে টাকা দিয়েছিল তার নাম, বিএনপির দুই নেতার নাম।
স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ও সংগঠনটির সিনিয়র সহসভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেনÑ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। সঞ্চালনা করেন সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব ও সংগঠনটির প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেসবাহুর রহমান সাচ্চু।
এর আগে প্রধান অতিথি হিসেবে আওয়ামী লীগ সভাপতি উপস্থিত হওয়ার পর জাতীয় সঙ্গীতের সুরে সুরে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব এবং বিশেষ অতিথিদের সাথে নিয়ে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়।
আমিরাতের পথে প্রধানমন্ত্রী
বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুবাই এয়ার শো ২০১৯ এবং আরো কিছু অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শনিবার চার দিনের সরকারি সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী আরব আমিরাতের শাসক মোহাম্মদ বিন রাশেদ আল মাকতুমের আমন্ত্রণে উপসাগরীয় এ দেশটি সফরে গেছেন।
আমিরাত এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে দুবাইয়ের উদ্দেশে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যায়।
ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় রাত ১০টা ১০ মিনিটে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা। সেখানে আমিরাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাবেন। বিমানবন্দরে অভ্যর্থনার পর মোটর শোভাযাত্রা সহকারে তাকে দুবাইয়ের হোটেল শাংরি-লায় নিয়ে যাওয়া হবে। দুবাই সফরকালে প্রধানমন্ত্রী এই হোটেলেই অবস্থান করবেন।
আজ ১৭ নভেম্বর সকালে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও সফল এয়ার শো এবং মধ্যপ্রাচ্য এশিয়া ও আফ্রিকার বৃহত্তম এয়ারোস্পেস ইভেন্ট দুবাই এয়ার শো ২০১৯-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। পরে সারা বিশ্বের ৮৭ হাজার অংশগ্রহণকারী ও এক হাজার ৩০০ এক্সিবিটর দুবাইয়ের ভবিষ্যৎ বিমানবন্দর দুবাই ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রালে এ উপলক্ষে সমবেত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ১৭ থেকে ২১ নভেম্বর দুবাইয়ের আকাশে দ্বিবার্ষিক এই এয়ার শোটি অনুষ্ঠিত হবে। আশা করা হচ্ছে এটি ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত এয়ার শো সাফল্যকে ছাড়িয়ে যাবে।
চার দিনের সফর শেষে ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরবেন। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরে আলম চৌধুরী, কূটনৈতিক কোরের ডিন, আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত, সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা।


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik