০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

আবরার হত্যার চার্জশিট

২৫ আসামির সবাই ছাত্রলীগের ; ১১ জন সরাসরি জড়িত ; আছে বুয়েট প্রশাসনের ব্যর্থতা
আবরার হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামিরা : নয়া দিগন্ত -

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যায় ২৫ জনকে আসামি করে চার্জশিট দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। একক কোনো কারণে নয়, বেশ কিছু কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এ হত্যাকাণ্ডে ১১ জনের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং ১৪ জনের সম্পৃক্ততা দেখানো হয়েছে চার্জশিটে। অভিযুক্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি চারজন এখনো পলাতক। আসামিরা সবাই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে। হত্যার দায় স্বীকার করে আট আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। বাকি ১৩ জনের ১৬১ ধারায় জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ চার্জশিট জমা দেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি নিশ্চিত করে সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) হেমায়েত উদ্দিন খান সাংবাদিকদের জানান, হত্যা মামলার আলামত হিসেবে আবরার ফাহাদের রক্তমাখা জামাকাপড়, মেসেঞ্জারে আসামিদের কথোপকথন এবং বুয়েট শেরেবাংলা হলের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ জব্দ দেখানো হয়েছে।
গত ৬ অক্টোবর রাত ৩টার দিকে শেরেবাংলা হল থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই রাতে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। হত্যাকাণ্ডে ১৯ জনকে আসামি করে পরের দিন সন্ধ্যার পর চকবাজার থানায় হত্যা মামলা করা হয়। নিহত আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদি হয়ে মামলাটি করেন। ঘটনার পরপরই হত্যায় জড়িতদের গ্রেফতার করা শুরু হয়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িত বেশির ভাগ আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় তদন্তসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দারা। এরপর আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হয় বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের।
এর আগে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, আবরারকে হত্যায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন ১১ জন। তারাই আবরারকে কয়েক দফায় মারধর করেন। অন্য ১৪ জন বিভিন্নপর্যায়ে বিভিন্নভাবে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তিনি বলেন, মামলার তদন্তে এখন পর্যন্ত ৩১ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। ঘটনার দিন রাত ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত আবরারকে পেটানো হয়।
তিনি বলেন, আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের মোটিভ হিসেবে একক কোনো কারণ খুঁজে পায়নি পুলিশ। অনেকগুলো বিষয়ের সমষ্টিতেই আবরার ফাহাদকে হত্যা করা হয়। পাশাপাশি হত্যায় জড়িতরা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে। তারা সবাই উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরেকটু মনিটরিং করলে এই ঘটনা এড়ানো যেত। তদন্তে তাদের ব্যর্থতাও পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে আমরা চার্জশিট দিচ্ছি। এজাহারভুক্ত ১৯ জনের বাইরে ঘটনার তথ্য প্রমাণে আরো ছয়জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এজাহারভুক্তদের মধ্যে ১৬ জন এবং এজাহারবহির্ভূত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আবরার ফাহাদকে মারধরে সরাসরি ১১ জন জড়িত ছিলেন। অন্যরা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ঘটনার পরিকল্পনা এবং নির্দেশনার সাথে কোনো-না-কোনোভাবে সম্পৃক্ত।
মনিরুল ইসলাম বলেন, আসামিদের ভাষ্যমতে আবরার ফাহাদ দেখা হলে বড়দের সালাম দিত না। বিভিন্ন তির্যক মন্তব্য করত। আগে থেকেই তারা নানা কারণে আবরার ফাহাদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। অনেক বিষয়ের সমষ্টিতেই আবরার ফাহাদকে পেটানো হয়। একজনকে মেরে অন্যজনকে শিক্ষা দিতে কিংবা জুনিয়রদের মধ্যে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে তারা দীর্ঘ দিন ধরে র্যাগিংয়ের নামে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। যার আচরণ অপছন্দ হতো তাদেরকেই ডেকে এনে নানা নির্যাতন করা হতো।
ঘটনার দিন রাত ১০টার পর থেকে আবরার ফাহাদকে মারধর শুরু করা হয় জানিয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, রাত আড়াইটার দিকে বুয়েটের ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হল-বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরেকটু মনিটরিং করলে এ ঘটনা এড়ানো যেত। তদন্তে আমরা তাদের ব্যর্থতা দেখেছি। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের গাফিলতি পেলে ব্যবস্থা নিতে পারে। এটা পুলিশের বিষয় নয়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাত ৩টার দিকে পুলিশকে খবর দেয়া হয়, শিবির সন্দেহে একজনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় পুলিশের টহল টিম হলের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করে; কিন্তু পরে জানানো হয়, সেখানে কিছু হয়নি। ৩টার আগে পুলিশ এ বিষয়ে কিছু জানতে পারেনি।
এ দিকে গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আবরার শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, এই সন্দেহেই তাকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেন বুয়েট ছাত্রলীগের ন