০৬ ডিসেম্বর ২০১৯
সংসদে প্রধানমন্ত্রী

অপরাধ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে

সরকারি কর্মচারীসহ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হপিআইডি -

রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তর থেকে অপরাধ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, সব দুর্নীতিবাজকে আইনের আওতায় আনতে দুর্নীতি দমন কমিশন কাজ করছে। দুর্নীতির বিষবৃক্ষ সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলে দেশের প্রকৃত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য একটি সুশাসনভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়াও সরকারি কর্মচারীসহ অন্য যেসব ব্যক্তি জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। গতকাল বুধবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন।
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যাসিনো ও দুর্নীতির সাথে যেই জড়িত থাকুক না কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ যাতে কেউ করতে না পারে সে জন্য আইনশ্ঙ্খৃলাবাহিনী তৎপর রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানের পাশাপাশি কঠোর গোয়েন্দা নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলন-নির্বাচনে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি-জামায়াত জোটসহ একটি বিশেষ মহল রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে একটি বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।
শেখ হাসিনা বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অর্থাৎ দুর্নীতি অনুসন্ধানে তদন্ত এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ বছরে দুর্নীতি দমন কমিশন ১৩ হাজার ২৩৮টি অভিযোগের অনুসন্ধান, তিন হাজার ৬১৭টি মামলা রুজু এবং পাঁচ হাজার ১৭৯টি চার্জশিট দাখিল করেছে।
তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা ঠিক রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টির পেছনে জিয়াউর রহমানের হাত রয়েছে; কিন্তু আমরা সব সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানে বিশ্বাসী। তিনি আরো বলেন, আমাদের পরিষ্কার অবস্থান হচ্ছে, যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে বা একটি জিনিস স্পষ্ট বলতে চাইÑ বাংলাদেশের মাটিতে কোনো দেশের বা প্রতিবেশী কোনো দেশে কেউ কোনো রকমের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালালে তাদের কোনো স্থান বাংলাদেশের মাটিতে হবে না। এ ব্যাপারটা আমরা নিশ্চিত করেছি।
সংসদ নেতা বলেন, বাংলাদেশের মাটিকে কাউকে ব্যবহার করতে দেবো না। বাংলাদেশ সব সময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়, সবার সাথে বন্ধুত্ব কারোর সাথে বৈরিতা নয়Ñ এই নীতিতে আমরা বিশ্বাস করি।
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীন ও ভারতের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শহীদুজ্জামান সরকারের অপর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে এই দু’টি দেশের সাথেই আমরা আলোচনা করেছি, রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানে তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছে, তারাও চেষ্টা করছে। শুধু ভারত বা চীনই নয়, মিয়ানমারের সাথে যেসব দেশের স্থলসীমানা রয়েছে (ভারত-চীন-থাইল্যান্ড-লাওস) সেসব দেশের সাথেও আলোচনা চলছে। রোহিঙ্গা ইস্যুটি দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত, এ ব্যাপারে সবাই একমত।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে এবং একটি চুক্তিও করেছে; কিন্তু একটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গারা দেশটিতে ফেরত যেতে চাচ্ছে না। এটি এখন মিয়ানমার সরকারের ওপরই নির্ভর করছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া তাদের নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) ফেরত যাওয়ার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদে থাকবে সেই বিশ্বাসটি আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে সৃষ্টি করা তাদেরই (মিয়ানমার) দায়িত্ব।
বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দুর্র্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অর্থাৎ দুর্নীতির অনুসন্ধান, তদন্ত এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তা ছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ক্যাসিনোর সাথে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পদের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন দফতরে পত্র প্রেরণ করেছে।
সংসদ নেতা জানান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে এরূপ অভিযান অব্যাহত রাখতে দুর্নীতি দমন কমিশন সর্বদাই বদ্ধপরিকর। তা ছাড়া, বাংলাদেশের কোন কোন ব্যক্তি সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনো খেলেছে, সে সম্পর্কিত তথ্য প্রেরণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন সিঙ্গাপুর সরকারকে অনুরোধ করেছে। সব দুর্নীতিবাজকে আইনের আওতায় আনতে দুর্নীতি দমন কমিশন কাজ করে যাচ্ছে।
সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবির প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দল মত নির্বিশেষে সব ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে দুর্নীতিসহ সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী অভিযান পরিচালনা করছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে দুর্নীতি ও অবৈধ অর্থসম্পদ অর্জনের সাথে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সদস্য আনোয়ারুল আবেদীন খানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে যা যা করার তা করে যাচ্ছি, করে যাবো। গত ১০ থেকে ১১ বছর আগে দেশের কী অবস্থা ছিল একটু বিবেচনা করুন। আগে মানুষ এক বেলা খেতে পর্যন্ত পারত না; কিন্তু গত এক দশকে দেশের চেহারাই পাল্টে গেছে। সরকারের উন্নয়নের সুফল তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষ ভোগ করছে। দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য আমার নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছি। দেশের মানুষের কল্যাণ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রয়োজনে বাবার মতো আমিও জীবনকে উৎসর্গ করব।
কর্ণফুলী পাওয়ারের ১১০ মেগাওয়াট ও বারাকা শিকলবাহা পাওয়ারের ১০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন
আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বারাকা পাওয়ার লিমিটেড ২০০৭ সালে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে ৫১ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেড নামে ৫০ মেগাওয়াট এইচএফও-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধমে কোম্পানিটি উৎপাদনকার্যক্রম প্রসারিত করে। এরই ধারাবাহিকতায়, কর্ণফুলী ১১০ মেগাওয়াট ও বারাকা শিকলবাহা ১০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ও ১৯ আগস্ট তারিখে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে। গত ২০ আগস্ট ২০১৯ ও ২৪ মে ২০১৯ তারিখে প্রকল্প দু’টির বাণিজ্যিক উৎপাদনকার্যক্রম সফলভাবে শুরু করে।
ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র দু’টি বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড ওয়ার্টসিলার সর্বাধুনিক ১২টি ইঞ্জিনের সমন্বয়ে এবং একটি স্টিম টারবাইনের মাধ্যমে গঠিত স্টেট অব দ্য আর্ট প্ল্যান্ট। চট্টগ্রামের পটিয়া থানায় কর্ণফুলী নদীর তীরে সবুজের সমারোহে ১৪ একর জায়গায় নান্দনিক সৌন্দার্য নিয়ে গড়ে ওঠা বিদ্যুৎকেন্দ্র দু’টি নিরবচ্ছিন্নভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছে।
গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎ প্রকল্প দু’টি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন ঘোষণা করেছেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কর্ণফুলী পাওয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম রব্বানী চৌধুরী, বারাকা শিকলবাহা পাওয়ার লিমিটেডের পরিচালক এম কে শাফি চৌধুরী এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

 


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik