০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

‘মনে হয়েছিল পৃথিবীটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে’

ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত মুন্না -

মনে হয়েছিল পৃথিবীটা দুমড়েমুচড়ে এক হয়ে যাচ্ছে। এরপর আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফেরে তখন হাসপাতালের বেডে। ডান পা তিন স্থান দিয়ে ভেয়ে গেছে। আরো চার বন্ধু ছিল মুন্নার সাথে। যাদের মধ্যে রুবেল নামের একজন মারা গেছেন।
ব্রহ্মাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে আহতদের একজন মুন্না মিয়া (২০)। এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তার ডান পা তিন স্থানে ভেঙে গেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের ২৬ নম্বর বেডে আছেন মুন্না। বিভীষিকাময় ওই রাতের কথা জানালেন তিনি। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের কথা মনে আছে তার। গভীর রাত হলেও মুন্নার ঘুম আসছিল না। ট্রেনের বা পাশের দরজায় দাঁড়ানো ছিলেন। হাসপাতালের বেডে বসে মুন্না জানালেন, কিছু বুঝে ওঠার আগেই মনে হলো পৃথিবীটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। হয়তো দুয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এটা ঘটল। আর কিছু মনে নেই। পরে যখন জ্ঞান ফিরল তখন হাসপাতালের বেডে। মুন্না বলেন, আল্লাহর শোকরিয়া, আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।
মুন্না পেশায় গ্রিল মিস্ত্রি। হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ওমর আলীর ছেলে। পেশার কাজে গ্রামের বাড়ি থেকে উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন তিনি। মুন্নার চাচা ফিরোজ জানান, যারা উদ্ধার করেছেন তারা বলেছেন, মুন্না রেল লাইনের পাশে পড়েছিল। তার জ্ঞান ছিল না। তার ওপর ট্রেনের ধ্বংসস্তূপের খণ্ডিত কিছু অংশ পড়েছিল। ওগুলো সরিয়ে মুন্নাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। মঙ্গলবারই তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনার পর রাতে তার পায়ে অপারেশন হয়। এরপর পোস্ট অপারেটিভে রাখা হয় তাকে। গতকাল তাকে বেডে দেয়া হয়। ডাক্তার বলেছেন, মুন্নার শরীরের অন্যান্য স্থানেও আঘাত রয়েছে। তবে সেগুলো ততটা গুরুতর নয়। মুন্নার আরো চার বন্ধু ছিল একই ট্রেনে। তারাও চট্টগ্রাম যাচ্ছিল। মুন্নার চট্টগ্রামে কর্মস্থলে যাওয়ার কথা। বাকিদের যাওয়ার কথা কক্সবাজারে। পাঁচ বন্ধুর মধ্যে একজন রিয়েল গতকাল হাসপাতালে বলেন, পাঁচজনের মধ্যে রুবেল মারা গেছে। মুন্না আহত হয়েছেন। আর তিনজনের কোনো ক্ষতি হয়নি। রিয়েল বলেন, ঘটনা যখন ঘটে তখন চোখে ঘুম। উদয়নের ঝ বগির ৫৫-৫৯ নম্বর পর্যন্ত পাঁচটি টিকিটের যাত্রী তারা। রুবেল ছিল জানালার কাছের সিটে।
মুন্না পায়চারী করার জন্য দরজার কাছে গিয়েছিল। মুহূর্তে বিকট আওয়াজে ঘুম ভেঙে অনেকটা উদভ্রান্তের মতো দরজা দিয়ে লাফিয়ে পড়েন তিনি।
গত ১২ নভেম্বর রাত ৩টায় ব্রহ্মাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মন্দবাগ এলাকায় দুটো ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন একপ্রেস ট্রেনের সাথে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ট্রেন তূর্ণা নিশীথার এই সংঘর্ষ হয়। তূর্ণা নিশীথা সিগন্যাল অমান্য করে চালাতে গিয়ে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৬ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। আহত হয় আরো কমপক্ষে ৯০ জন। তাদের মধ্যে মুন্না মিয়া ও মির্জা সাইফুদ্দিন সৈকত (২৮) নামের দু’জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
সৈকত আছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর বেডে। তার অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। তার মুখমণ্ডল পুরো থেঁতলে গেছে। দেখে চেনার কোনো উপায় নেই। সৈকতের ভাই সাকিব জানান, সিলেটে বস্তা রিপেয়ারিংয়ের কাজ করেন সৈকত। সেখান থেকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের দুর্গাপুরের গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিলেন তিনি। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকর্মীরা তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। তার মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত। এক্সরে করা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ফলাফল হাতে পেলেই তার পুরোপুরি চিকিৎসা শুরু হবে।

 


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik