১২ নভেম্বর ২০১৯
জাতীয় শ্রমিক লীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

শিক্ষার্থীদের উসকানি মেনে নেয়া যায় না

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই শ্রমিকদের ভাগ্যোন্নয়ন হয়
শ্রমিক লীগের সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : পিআইডি -

আন্দোলনের নামে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দায়ীদের কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি সতর্ক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, উসকানি দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিপথগামী করে আবার মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা এটা কখনো মেনে নেয়া যায় না। আর তা যদি করতে হয় তাহলে নিজেদের অর্থ নিজেদের জোগান দিতে হবে। নিজেদের বেতন নিজেরা দেবে এবং নিজেদের খরচ নিজেরাই চালাবে, সরকার সব টাকা বন্ধ করে দেবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সরকার কেন টাকা খরচ করবে। সেটাও তাদের চিন্তা করতে হবে, তারা কোনটা করবে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় শ্রমিক লীগের ১৩তম জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। এর আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে শ্রমিক লীগের সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসন আছে এ কথা সত্যি। কিন্তু টাকাটা তো সরকার দিচ্ছে। সরকারের দেয়া টাকা ইউজিসিতে (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) যায়, সেখান থেকে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া হয় এবং সব শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, যা কিছু তারা পাচ্ছেন তা দেয়া হয়। বিশ্বের আর কোথাও বাংলাদেশের মতো এত স্বল্প খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া শিক্ষার্থীর মাসে শিক্ষা ব্যয় দেড় শ’ টাকার বেশি হয় না। যদি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যান তবে, দেখবেন কত লাখ টাকা লাগে প্রতি সেমিস্টারে। প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ হয় এক একজন শিক্ষার্থীর পেছনে। প্রকৌশলী বা কারিগরি শিক্ষায় আরো বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। কাজেই সেখানে শৃঙ্খলা থাকতে হবে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় শিক্ষা ব্যয়ের জোগান সরকারকেই দিতে হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে ডিসিপ্লিন থাকবে, শিক্ষার্থীরা উপযুক্ত শিক্ষা পাবে এবং নিজেদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলবে সেটাই আমরা চাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেনÑ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কী আমরা তা বুঝি না। যারা পড়াশোনা নষ্ট করে সেখানে ধর্মঘট করে দিনের পর দিন কর্মঘণ্টা নষ্ট করবেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ব্যাহত করবেন, তারাই সব বুঝবেন। আর আমরা বুঝব না, এটা তো হয় না। শেখ হাসিনা বলেন, অর্থ সরকার দেবে। সব রকম উন্নয়ন প্রকল্প সরকার বাস্তবায়ন করবে। আর সেখানে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে না, এটাও হতে পারে না। কথায় বলে, স্বাধীনতা ভালো কিন্তু তাহা বালকের জন্য নহে। এটাও মাথায় রাখতে হবে। এ ধরনের বালকসুলভ কথাবার্তা না বলাই ভালো।
দাবি মেনে নেয়ার পরেও ক্ষেত্র বিশেষে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া এবং শিক্ষার সময় যেন নষ্ট না হয়। উপযুক্ত সময়ে তারা ভালো রেজাল্ট করবে এবং তারা জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলবে, সেটাই আমরা চাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের আইনে আছে কেউ যদি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে এবং সেটা যদি প্রমাণিত না হয় অভিযোগকারীর ওই আইনে বিচার হয়, সাজা হয়। কাজেই যারা কথা বলছেন তারা আইনগুলো ভালোভাবে দেখে নেবেন। আমরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম এবং পড়াশোনা করেই এতদূর এসেছি। এটাও ভুলে গেলে চলবে না।
গত এক দশকে সরকারের অভাবনীয় উন্নয়নের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যে বাংলাদেশে পঁচাত্তর এর পরে প্রতি রাতে ক্যু হতো। যেখানে হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি চলত সেই বাংলাদেশ বিগত প্রায় এক দশকে অনেক দূর এগিয়েছে। আজকে যারা বড় বড় কথা বলেন তাদের কোনোদিন ওই সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুনিনি বরং তাদের পদলেহন করতেই দেখেছি, এটা হলো বাস্তবতা।
আমাদের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১৩ ভাগে আমরা উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, মাথাপিছু আয় এক হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত করেছি এবং শতভাগ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শিখছে। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অর্থনীতি শুধু কৃষির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিনি, শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। শ্রমিক সমাজের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে শ্রমিকদের ভাগ্যোন্নয়ন হয়েছে। শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা এবং তাদের পরিবারের উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিতের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার কাজ করছে। আমরা এটাই করতে চাই। এই নীতি নিয়েই আমরা দেশ পরিচালনা করি।
সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, শ্রম এবং কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান এবং আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কান্ট্রি ডিরেক্টর তুয়োমো পটিয়াইনেন, আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন এশিয়া প্যাসিফিকের (আইটিইউসি-এপি) সাধারণ সম্পাদক শোভা ইওশিদা এবং দক্ষিণ এশিয় আঞ্চলিক ট্রেড ইউনিয়ন কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক লক্ষন বাহাদুর বাসনেত প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি শুক্কুর মাহামুদ, শোক প্রস্তাব পাঠ করেন কার্যকরী সভাপতি ফজলুল হক মন্টু এবং স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম।
বাসস জানায়, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর পরিবেশনায় এ সময় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয়। পরে শিল্পী ফকির আলমগীরের নেতৃত্বে একই শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন।
এরপরই পবিত্র কোরআনসহ ধর্মগ্রন্থগুলো থেকে তেলাওয়াত শেষে আলোচনা পর্বের শুরুতে শোক প্রস্তাব পাঠ করা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চারনেতা, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবসহ ১৫ আগস্টের সব শহীদ, মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ, সব আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে সবাই দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।
সম্মেলনে সারাদেশের ৭৮টি জেলা কমিটির প্রায় ৮ হাজার কাউন্সিলর এবং ডেলিগেট সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। একই সাথে বেশ কয়েকটি দেশ থেকে আমন্ত্রিত অতিথি এবং শ্রমিক নেতৃবৃন্দও সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন।
সর্বশেষ ২০১২ সালের ১৯ জুলাই জাতীয় শ্রমিক লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার বলেছেন, সরকার সাইক্লোন ‘বুলবুল’ মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে।
ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক লীগের ১৩তম জাতীয় পরিষদে বক্তৃতা প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘এই সাইক্লোন মোকাবেলা ও জনগণকে রক্ষায় আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, সাইক্লোনের পর পরই ত্রাণকার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সাইক্লোনে যেন বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হয়, সে জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে প্রধানমন্ত্রী জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
মইনউদ্দীন খান বাদলের কফিনে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং জাতীয় সংসদ সদস্য মইনউদ্দীন খান বাদলের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) একাংশের নেতা বাদলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণের পরে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে দলের সিনিয়র নেতা এবং সংসদ সদস্যদের সাথে নিয়ে দলের পক্ষ থেকে বাদলের কফিনে অপর একটি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের পক্ষ থেকে তার সামরিক সচিব বাদলের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি চৌধুরী বাদলের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের পক্ষ থেকে বাদলের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
১৪ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দ, জেএসডি, ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা বাদলের কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এর আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বাদলের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রী, চিপ হুইপ, হুইপ, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং জাতীয় সংসদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোক জানাজায় শরিক হয়েছেন। এ সময় পুলিশের একটি চৌকষদল মরহুমের প্রতি রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানায় এবং বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে।


আরো সংবাদ